”না আমি যাই। এভাবে দুজনের থাকাটা ঠিক নয়, পরে কথা হবে।”
”হোক। আমি তাতে ভয় পাই না।” মোমবাতির শিখা এবং ভোম্বলের কণ্ঠস্বর, দুটোই কেঁপে উঠল।
”এসব বীরত্ব দেখিয়ে কী লাভ দ্বারিকদা।” মানু স্পষ্টভাবে তাকিয়ে রইল ভোম্বলের চোখের দিকে। তাইতে ভোম্বলের বুকের মধ্যেকার দাপাদাপিটা বন্ধ হয়ে গেল। সে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল মোমবাতিটা।
”এ কি করলেন!” মানু দ্রুত দরজার দিকে এগোল। ভোম্বল ওর হাত চেপে ধরল।
”একটা কথা বলব?”
”মোমবাতিটা নিভিয়ে দিলেন কেন?”
”আলোয় বলতে পারব না, তাই। অন্ধকারে তো অনেক সময় ভরসাও পাওয়া যায় তাই। বলব?”
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইল অন্ধকার ঘর। রাস্তায় কিছু একটা ঘটছে। চিৎকার আসছে ঘরে। কার ট্রানজিস্টর রেডিয়োতে সেতার বাজছে। অন্ধকারে ভয়-পাওয়া শিশুরা মাঝে মাঝে ডুকরে উঠছে। ভোম্বল নিশ্বাস রোধ করে অপেক্ষা করছে।
”বলুন।”
ভোম্বলের মনে হল এইবার সে প্রচণ্ডরূপে যুবক হতে চলেছে। এইবার সে দারুণ একটা কথা বলে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। সে মৃদুস্বরে বলল, ”মনীষা।” তারপর বলল, ”আমিও বিয়ে করব না তাহলে।” এই বলে ভোম্বল বুকের মধ্যে একরাশ গোলাপের গন্ধ পেল।
.
অনন্ত আর বাসুর ঝগড়া দেখতে চারুশীলা ছাদের পাঁচিলে ঝুঁকে রয়েছে। সত্যচরণ সেই ফাঁকে দোতলার ঘরে এসে আলমারির চাবি খুলে পাঁচটি টাকা বার করেছে মাত্র, তখনই আলোগুলো নিভে যায়। হকচকিয়ে গেছল প্রথমে। তারপর ব্যাপারটা বুঝে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় বেরোয়। ওর মনে হল, ঝগড়াটা শেষ পর্যন্ত যেন কিছু একটা গুরুতর ব্যাপারে গড়িয়েছে। কিন্তু ওখানে খোঁজ নিতে যাওয়া মানে মূল্যবান এই অন্ধকারের খানিকটা নষ্ট করা। মরুক ব্যাটারা ঝগড়া-মারামারি করে।
অন্ধকারে মোটরটা একটা কচ্ছপের মতো পড়ে রয়েছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় সত্যচরণ থমকে দাঁড়াল। বেড়াল-বাচ্চচাটা তলায় মিউমিউ করে যাচ্ছে। ওটাকে বের করে দেবে কিনা ভাবল। অবশেষে সাব্যস্ত করল, মরুক ব্যাটা চাপা পড়ে।
তারক কবিরাজ স্ট্রিটের বস্তির পরিচিত সরু গলিটা অন্ধকারে চেনা যায়। সত্যচরণ খুশি হল, কেউ তাকে ঢুকতে দেখবে না। আঙুর চটপট ব্যাপারটা চুকিয়ে দিলে অন্ধকার থাকতে থাকতেই বেরিয়ে আসা যাবে। কেউ জানবে না। শুধু চারুশীলা পাঁচটা টাকা চুরি যাওয়ার জন্য কাল বড়োছেলে কী মেজোমেয়েটাকে ঠ্যাঙাবে।
সত্যচরণ গলিতে ঢুকতে গিয়েই একজনের সঙ্গে জোর ধাক্কা খেল। মাথায় একটা মোটরের চাকা নিয়ে সেও ঢুকছে বস্তির গলিতে। সত্য ঘাড়ে ব্যথা পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলল, ”চোখের কী মাথা খেয়েছ গা।”
”এই অন্ধকারে কি চোখ থাকে কারুর?” অসীম পালটা খেঁকিয়ে উঠল। স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডের চাকার ভারে সে বিব্রত নয়, কিন্তু সত্যচরণকে গলার স্বরে চিনে সে তাই হয়ে পড়ল। একটু আগে ভয় পেয়েছিল বিড়াল-বাচ্চচাটার মিউমিউ শুনে। ভাঙা কেরিয়ারের ডালা তুলে চাকাটা বার করার সময় যখন তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ চেঁচিয়ে উঠল চোর-চোর বলে, তখনই বেড়াল বাচ্চচাটা ডেকে ওঠে। অসীম ভয়ে কিছুক্ষণ জমাট বেঁধেছিল।
”এই অন্ধকারে বস্তিতে ঢুকছেন যে?” অসীম গলাটাকে ষড়যন্ত্রকারীদের মতো নামিয়ে বলল।
”এটা কার গাড়ির চাকা রে ফ্যালা?” সত্যচরণ শিশুর মতো কৌতূহল প্রকাশ করল।
দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝবার চেষ্টা করল অন্ধকারে। এরপর দুজনেই আর কথা বাড়াল না। একসঙ্গে ঢুকল বস্তিতে।
.হাউ হাউ করে বাসুদেব কেঁদে উঠল।
”তোমার জন্য, সব তোমার জন্য। এ সংসার ফেলে রেখে চলে যাব। যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যাব। কেউ আমার মুখ চায় না। কেউ না, কেউ না!”
বাড়ির উঠোনে বাসুদেব উবু হয়ে বসে। ছেলেমেয়েরা একটু তফাতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। রকের উপর লম্ফ জ্বলছে। রাধারানি ন্যাকড়া বেঁধে দিচ্ছে মাথায়।
”বুঝবে তখন, কী করে আমি চালাচ্ছি। কত অপমান সয়ে আমায় চলতে হয়।” বলতে বলতে বাসুদেব উঠে দাঁড়াল। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, কুঁজো হয়ে অন্ধকার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। লম্ফটা দপদপ করছিল, এই সময় সামান্য এক দমকা হাওয়াতেই নিভে গেল। উঠোনটা আবার অন্ধকার হয়ে পড়ল। আর তখন রাধারানির মনের মধ্যে হঠাৎ অন্ধ একটা আশা ছলাৎ করে উঠল।
কেউ দেখতে পাবে না। কেউ দেখতে পাবে না ওকে আসতে। সদর দরজা খুলে রাধারানি দাঁড়াল। গাঢ় অন্ধকার জয়রাম মিত্র লেনকে একাকার করে দিয়েছে। দরজায় হেলান দিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাধারানি খুব ক্লান্ত বোধ করল। বিড়-বিড় করে সে বলল, ”আর একবার। মারব, ভীষণ মারব, এমন মারব যে জীবনও ভুলতে পারবি না।”
.”অ বউ, খোকা এসেছে? কাল কচুরমুখী আনতে বলবি তো? বড়ি দিয়ে কাল করে দিস। কতকাল যে খাইনি।”
অন্ধকারে বিড়ালের মতো পারুল নেমে এল। মাথাধরা সেরে গেছে তার। ঘরের মধ্যে এসে আলমারির আয়নার সামনে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। কিছুই দেখা যায় না। আলতোভাবে সে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। অস্ফুটে একটা ক্লান্ত শব্দ বেরোল মুখ থেকে।
”কথা কস না কেন, অ-বউ। দ্যাখো আঁটাকুড়ির গেরায্যিই নেই। আবার আমি খোকার বিয়ে দোব। দেমাক ভাঙব তোর।”
”দে না তোর খোকার বিয়ে।” পারুল গলা না চড়িয়ে পাশের লোককে বলার মতো করে বলল। বলে খিলখিল করে হাসতে হাসতে নিজের তলপেটে হাত রাখল আর আলতো ভাবে সুখ নেমে এল ওর সর্বাঙ্গে।
