ইলা লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেল। শোভা মনে মনে অপ্রতিভ হল। স্ত্রীলোকটি নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে, তার বুকের উপর উপুড় হয়ে বাচ্চচাটি স্তন চুষছে। মেয়েটি ছাতুর একটা গোল্লা পাকিয়ে ডাকল-”আয়, বাবু আয়।” বাচ্চচাটি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বুক থেকে নেমে হামা দিয়ে মেয়েটির কাছে গেল। ওকে কোলে বসিয়ে মেয়েটি একটু একটু করে খাওয়াতে লাগল।
শেফালি এগিয়ে গিয়ে স্ত্রীলোকটির হাঁটু থেকে কাপড়টা গোড়ালি পর্যন্ত নামিয়ে দিল। ঝুঁকে কপালে হাত রাখল। শোভার মনে হল, তারও কিছু একটা করা দরকার। করার মতো কিছুই সে দেখতে পেল না। ইলা তাকে বলল, ”ঘরটায় একদম হাওয়া নেই, কী ভ্যাপসা!”
শেফালি বলল, ”বোধহয় ডাক্তার ডাকতে হবে। তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না। জানলাটা খুলে দাও তো ইলা।”
মেয়েটি কী বলতে যাচ্ছিল, শেফালি হাত নেড়ে চাপা দাবড়ানি দিল, ”যা বলার আমিই বলব তোমার বাবাকে। যা করছ তাই করো। দাঁড়িয়ে কেন? খুলে দাও, হাওয়া আসুক।”
বিছানা ঘেঁষে ইলা দাঁড়াল। ছিটকিনিটা আঁট হয়ে রয়েছে। টানাটানি করতে ওর মনে হল কার ঠান্ডা হাত যেন তার পায়ে ঠেকল। শোভা তাকিয়েছিল জানলার দিকে। ওর মনে হল, আধবোজা নিথর চোখে কে যেন তার দিকে তাকিয়ে। দুজনেই হঠাৎ শিউরে উঠল। আর জানলাটা যে মুহূর্তে খুলল, তখনই দপ করে ঘরের আলোটা নিভে গেল। ইলা জড়িয়ে ধরল শোভাকে। বাচ্চচাটা ভয়ে ঢুকরে উঠল। শেফালি স্থির গলায় বলল, ”আঁচলে পয়সা বাঁধা আছে। খুলে দাও তো ইলা, মোমবাতি আনুক।”
দশ
তখন ভোম্বল আর একটু কাছে সরে এল মানুর।
এতক্ষণে অন্ধকার সয়ে এসেছে চোখে। এখন মানুর অবয়ব জমাট বেঁধে গেছে। ভোম্বলের চোখ সেটি খোদাই করে অন্ধকার থেকে একটা মূর্তি বার করে নিয়েছে। দীর্ঘ, ছিপছিপে, মাথায় প্রচুর চুল, নাকের ডগাটি তীক্ষ্ন। ভোম্বল তার হাতের গোলাপটি মানুর গালে বুলিয়ে দিল।
”আমি কিন্তু সত্যি বলেছি।” মানু খুব সহজভাবে বলার চেষ্টা করল।
”তুমি তাকে দিলে না কেন?” ভোম্বল লঘু হতে গিয়েও পারল না।
”দিয়েছি নাকি! পড়ে গেল আর আপনি তুলে নিলেন।” মানু সহজভাবে বলার চেষ্টা করল।
”তাহলে দরকার নেই আমার, এই নাও।” ভোম্বল আর লঘু হবার চেষ্টা করল না। গোলাপটি এগিয়ে ধরে রইল। অন্ধকারে মানু দেখতে পায়নি। বুঝতে পারল হালকা মিষ্টি গন্ধটা নাকে যেতেই, আর তাইতে কেঁপে উঠল ওর অন্তর। ফোঁটা ফোঁটা শিশিরের মতো ঝরল চোখের জল। অন্ধকারে ভোম্বল দেখতে পায়নি। বুঝতে পারল হাতের উপর পড়তেই।
”মানু, কাঁদছ!” ভোম্বল ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ”এই মানু কী হয়েছে, কাঁদবার কী হল?”
”আমি সত্যি বলছি, দ্বারিকদা। যে চেয়েছিল এই গোলাপটা, সে আমায় চাকরি করে দেবে তার অফিসে।”
”কে সে?” ভোম্বলের হৃদস্পন্দন দ্রুত হল, নিশ্বাস ফেলতে পারল না।
”চিনবেন না। আমার এক বন্ধুর বাবা। বড়ো অফিসার একটা এনজিনিয়ারিং ফার্মের। আজ যেতে বলেছিল অফিসে, গেছলাম। লোকটা ভালো নয়।”
”বন্ধুকে সে-কথা বলে দাও।”
”না। আমার চাকরি দরকার।”
”কীজন্য?”
”বাবা আর পারছে না। আমরা সাত মাসের ভাড়া দিতে পারিনি বলে বাড়িওলা রোজ এসে চিৎকার অপমান করে যাচ্ছে, উঠে যেতে বলছে, মামলা করবে শাসাচ্ছে। একটা কিছু আয়ের ব্যবস্থা আমাদের দরকার। বাবা যথাসাধ্য করছে, আমাকেও কিছু করতে হবে।”
”তাই বুঝি সেজেগুজে গেছলে। তাই বুঝি হাতকাটা ব্লাউজ, কোমরের নিচে শাড়ি!”
মানু চুপ করে রইল। ভোম্বল গোলাপটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ফুল পড়ার শব্দটুকু মানু শুনতে পেল।
”এই বাজারে চাকরি পাওয়া শক্ত। আমার তো কোনো যোগ্যতা নেই।” মানুর ধীর স্বর অন্ধকারে সাদা হয়ে ফুটে উঠল। পিছিয়ে এসে ভোম্বল খাটের উপর বসল।
”তুমি আর যেয়ো না লোকটার কাছে।” ভাঙা ভাঙা স্বরে ভোম্বল বলল।
”কেন যাব না?”
গলা পরিষ্কার করার জন্য ভোম্বল ঢোঁক গিলল পরপর। প্রশ্নটার জবাবে সে বলতে চাইল-আমি চাইনা, কেউ তোমার দেহ স্পর্শ করুক। কিন্তু কথা বলতে বুঝল গলার মধ্যে কিছু একটা জমে আছে। তখন ও বলতে চাইল-এ খবরটা আমায় না বলে চেপে যেতে পারতে তো।
”আমার কোনো যোগ্যতাই নেই। না বিদ্যে-বুদ্ধি, না রূপ।”
”কে বলল তোমায়?”
”আমি জানি। এসব কাউকে বলে দিতে হয় না। তবে থাকলেই বা কী হত!” মানুর হতাশ স্বর ভোম্বলের কানে করুণ হয়ে বাজল।
”বিদ্যে-বুদ্ধি, রূপ-গুণ এ সবই তো একটিমাত্র পুরুষকে সুখী করার জন্য। সে যদি সুখী হবে মনে করে তাহলে তোমার আর কীসের পরোয়া।”
”পরোয়া করি আমার এই মনটাকে। যদি ছেলে হতুম, তাহলে এই নিয়ে চিন্তাই করতুম না। যে আমায় ভালোবাসে তাকে বিয়ে করে ফেলতুম। কিন্তু মেয়েদের বাপের বাড়ি ছাড়তে হয়। গরিব বাপ-মা, ভাই-বোনেদের সে আর সাহায্য করতে পারে না।”
”তুমি কি বিয়ে করবে না?” ভোম্বল অবাক হয়ে অন্ধকারের ভিতর একটা মূর্তিকে ভেঙে পড়তে দেখল।
তখন দরজার বাইরে বড়দার গলা শুনল সে। মোমবাতি হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, ”তোর কি চাই একটা?”
ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে ভোম্বল মোমবাতিটা নিয়ে এল। ঘরে ম্লান ছায়া পড়ল দুজনের। মানু সামলে নিয়েছে নিজেকে। দরজার দিকে সে এগোল।
”চললে? রাস্তায় অন্ধকার, দাঁড়াও আলো জ্বলুক। অন্ধকার বেশিক্ষণ থাকবে না,আগেরবার আধঘণ্টা মতো ছিল।”
