”অনেক কিছুই তো নেই আমাদের।” আভা কথাগুলোকে টেনে টেনে বলল। ”সবই কি আমরা চাইলেই পেতে পারি?”
”যা পাওয়া সম্ভব, তা কেন চাইব না?”
”আপনি দিদিকে খুন করতে পারেন?”
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল হিরণ্ময়। আভা লক্ষ করে হাসল। হিরণ্ময় ক্ষিপ্ত, মরিয়া স্বরে বলল, ”পারব। আভা, তোমার জন্য আমি পারব। তুমি যদি-”
আভার চিৎকারে চমকে উঠে চুপ করে গেল হিরণ্ময়। ”চুপ করুন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না, আপনার এইসব কথা। জেনে রাখুন, আমি আর আপনাকে ভালোবাসি না। হ্যাঁ, তাই। আপনাকে কেউ ভালোবাসতে পারে না, পারে না, পারে না। আমি ভুল করেছি, ভীষণ ভুল করেছি। আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে।”
বলতে বলতে আভা ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে যখন, তখনই দপ করে নিভে গেল সব আলো। রান্নাঘর থেকে ঠাকুর চেঁচিয়ে উঠল, ”আবার আজও!”
হিরণ্ময় একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে, অন্ধকার আবার তাকে ঘিরে ধরবে। আবার তার ইচ্ছা হবে রাস্তায় পুলিশ গুলি চালাচ্ছে খবর পেলে বেরিয়ে পড়তে। আবার সহজ অঙ্কটা কষে কষে যেতে হবে। আবার মরে যাওয়া!
মনে মনে বলল, আমি ব্যর্থ, ব্যর্থ, ব্যর্থ।
.
”ওই ঘরটা।” শেফালি বলল।
শোভা আর ইলা তাকাল। ঝুপসি অন্ধকার, ভাঙাচোরা দেয়াল, ভ্যাপসা গন্ধ, আর ছেঁড়া কাগজে ভরে আছে একতলাটা। তিনটির মধ্যে দুটি ঘর ভাড়া দেওয়া রাস্তায়-কুড়োনো ছেঁড়া নোংরা কাগজের এক কারবারিকে। শুধু সিঁড়ির পাশের ঘরটিতে বাস করে এক ফেরিওলা পরিবার। ওরা দেখতে পেল ঘরের মধ্যে একটি বছর তিনেকের শিশু মেঝেয় উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। একটি বছর পনেরো-ষোলোর মেয়ে কলাইয়ের থালায় কিছু একটা মাখছে আর তার সামনে দুটি ছেলে, আট থেকে বারোর মধ্যে বয়স, একদৃষ্টে থালার দিকে তাকিয়ে। ঘরের আলো অনুজ্জ্বল, পাণ্ডুর। কোনো আসবাব ওদের চোখে পড়ল না। দেয়ালের তাকে কয়েকটা মাটির হাঁড়ি আর পুরনো কৌটো।
শোভা ফিসফিস করে বলল, ”ওদের মা নেই?”
”কী জানি।” শেফালি বোধহয় এই প্রথম পাড়ার একটি পরিবার সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করল।
”জানলাটা কোথায়?” শোভা আবার বলল।
”ডানদিকে। ঘরে ওই একটাই জানলা।”
বোধহয় ওদের কথার শব্দ পেয়েই, ঘরের তিনজন তাকাল। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। শীর্ণ দেহে ফ্রকটি ঢোলা দেখাচ্ছে। মেয়েটির চোখ দু’টি বড়ো, গায়ের রঙ ফ্যাকাশে।
ওরা তিনজন ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। এইবার পুরো ঘরটা দেখতে পাচ্ছে। ডানদিকে জানলাটা বন্ধ। তার নিচেই ছেঁড়া চিটচিটে তোশকের উপর একটি স্ত্রীলোক শুয়ে, চোখ আধবোজা, মণি দুটি কোণে সরে গিয়ে সাদা অংশটিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, হাত দুটি পাশে এলানো। স্ত্রীলোকটির মুখ খোলা। হলদে দাঁত দেখা যাচ্ছে। দেহের কাঠামো দেখলে মনে হয় বহুকালের বিসর্জিত প্রতিমা জল থেকে তুলে এনে শুইয়ে রাখা হয়েছে। বসন বিস্রস্ত। হাঁটু পর্যন্ত কাপড় উঠে-থাকা পা দুটি যেন প্লাস্টিকের দু-গাছা লাঠি পেতে রাখা। ব্লাউজের বোতাম উন্মুক্ত। জিরজিরে বুকের উপর দুটি চর্মসার স্তন। পায়ের আঙুলে হাজা। স্ত্রীলোকটির নিশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা গেল না।
শেফালির মনে হল, মরে গেছে। শোভারও তাই মনে হল, ইলারও। ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ঘরের ডানদিকের কোণে একটি সাত-আট মাসের বাচ্চচা মেঝে থেকে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে একমনে। তিনজনকে দেখে সে ভয় পেল। হামা দিয়ে স্ত্রীলোকটির কাছে সরে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে থাকল।
”কী চাই আপনাদের?” বড়োমেয়েটি জানতে চাইল। ওর কণ্ঠ কর্কশ। বলার ভঙ্গি শীতল নিস্পৃহ।
”কী হয়েছে তোমার মায়ের?” শেফালি আন্দাজেই ধরে নিল স্ত্রীলোকটি এদের মা।
”অসুখ।”
”কী অসুখ, কতদিন ধরে?” শেফালিই বলে গেল।
”অনেকদিন হাসপাতালে ছিল, ছেড়ে দিয়েছে।”
”সেরে গেছে?”
”না। বাঁচবে না বলে ছেড়ে দিয়েছে।”
ওরা তিনজন আবার তাকাল স্ত্রীলোকটির দিকে। একসঙ্গে তিনজনের মনে হল মরে গেছে। একসঙ্গে তিনজন ভাবল, তাহলে জানলাটা খুলতে বলা উচিত হবে কি! বিছানাটা না সরালে জানলা দিয়ে দেখা যাবে না।
”জানলাটা বন্ধ কেন, খুলে দাও না।” শোভা বলল। কেন খুলতে হবে, তার কারণটা বলতে আটকাল তার।
”না। বাবা বারণ করেছে। এরা চিৎকার গোলমাল করে, পাশের বাড়ির লোকেরা খুব বিরক্ত হয়।”
”বাচ্চচা ছেলেপুলে থাকলে গোলমাল তো হবেই। তাই বলে অসুস্থ মানুষটার কথাও তো ভাবতে হবে। এই বন্ধ ঘরে থাকলে অসুখ তো বেড়ে যাবে। খুলে দাও, বলুক ওরা যা বলার।” শেফালির স্বর কোমল এবং অন্তরঙ্গ।
”না, বাবা বকবে।” মেয়েটি গোঁয়ার গলায় বলল।
”তাহলে?” ইলা ফিসফিস করে শেফালির কাছে জানতে চাইল। শেফালি তা গ্রাহ্য না করে মেয়েটিকে বলল, ”বাবা কখন আসবে?”
”এগারোটা-বারোটা হয়ে যায়।”
”তুমি করছিলে কী?”
”ছাতু মাখছিলুম।”
”ভাত কিংবা রুটি করোনি?”
”না। মাঝে মাঝে ভাত হয়।”
ওরা কথা বলছে সেই ফাঁকে ছেলে দুটি থালা থেকে খামচা দিয়ে মাখা ছাতু তুলে নিল। মেয়েটি দেখতে পেয়ে ধমকে উঠল।
”তুমি স্কুলে পড়ো না?” শোভা প্রশ্ন করল।
মেয়েটি উত্তর না দিয়ে, ছাতু মাখায় ব্যস্ত হল। ইলা আবার বলল, ”তাহলে?”
”তাহলে আবার কী!” শেফালি ঝাঁঝিয়ে উঠল বিরক্ত হয়ে। ”দেখছ একটা মানুষ মরছে, এতগুলো বাচ্চচা ভাই-বোন নিয়ে একা ওইটুকু মেয়ে হিমসিম খাচ্ছে, আর এখনও তোমার শখ গেল না।”
