”প্রেম ছিল?”
”হ্যাঁ।”
”বিয়ে হল না কেন?”
”আমি ভীতু, তাই সাহস নেই। নিজের উপর ভরসা নেই, তাই তোমাকে-”
হাত বাড়িয়ে অশোক বুকের উপর পারুলকে টেনে এনে চেপে ধরল। প্রচণ্ডভাবে চুমু খেল এবং ছেড়ে দিল। স্থির দৃষ্টিতে পারুল তাকিয়ে রয়েছে।
”দেখলে তো। ঘরে আলো জ্বলছে, দরজাও খোলা, সাহস আছে কি না দেখলে?” অশোক হাঁফাচ্ছে। চোখের জ্বালা বাড়ছে। ধীরে ধীরে দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে বউটির মুখ। সেখানে ঝুমির মুখ সে বসাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু বসছে না।
”আপনি মদ খেয়ে আসুন।”
”কেন।” অশোকের মনে হল তার গালে এই অশিক্ষিত বউটি ঠাস করে চড় মারল।
”আপনি সত্যিই ভীতু।”
শোনামাত্র অশোকের চোখ থেকে মুছে গেল ঘরের আলো এবং পারুল। ঠিক এই গলাতেই ঝুমি বলেছিল। আট-ন বছর আগে। একই কথা। সেদিন লজ্জা পেয়েছিল, আজ রাগে দিশেহারা হয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে সে পারুলের গলাটা দু মুঠোর মধ্যে ধরল।
”আহ।” অস্ফুটে পারুল চাপা চিৎকার করল। আর তখনই দপ করে নিভে গেল ঘরের আলোটা।
”কী হল।” পারুল ছিটকে সরে গেল দরজার দিকে।
”হয়তো আবার সেদিনের মতো নিভল।”
পারুল জানালায় গিয়ে উঁকি দিল। সারা পাড়া অন্ধকার। রাস্তায় কোথায় চিৎকার করে কে চেঁচাচ্ছে। নিচে থেকে বুড়ির গলা ভেসে এল, ”অ বউ, কোথায় আছিস, খোকা ফিরল?”
তখন অশোক টেনে আনল পারুলকে খাটের উপর।
.টিপু ঘুমিয়ে পড়েছে। আভা ওর পাশে কাত হয়ে শুয়ে। টিপুর গায়ে ডান হাতটা আলতো করে রাখা। হিরণ্ময় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গলায় শব্দ করল। আভা ব্যস্ত হয়ে গায়ের কাপড় ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়াল।
”কী ভাবছ?” দরজার কাছ থেকেই হিরণ্ময় প্রশ্ন করল।
”কিচ্ছু না।” মুখ নামিয়ে আভা উত্তর দিল।
”হ্যাঁ ভাবছিলে। বলব? তোমার দিদির কথা। জানাজানি হলে আমার মানমর্যাদা ধুলোয় লুটোবে, সেই কথা। আর নিজের কথাও ভাবছিলে।”
”আমার কথা?” আভা মুখ তুলল। ”ওসব আমি ভাবিনি।”
”মিথ্যে কথা, মানুষ মাত্রেই নিজের কথা ভাবে। আমিও ভাবি। ভাবাটা অন্যায় নয়, স্বার্থপরতাও নয়। আমি চাই তুমি নিজের কথা ভাব।”
”কী ভাবব?”
”তোমার ইচ্ছা, যা তোমার নিজস্ব, সেগুলো যাতে পূর্ণ হতে পারে। মায়া-মমতার মতো বাজে জিনিসগুলো যাতে তোমায় চেপে কুঁকড়ে ছোটো করে না দেয় সেজন্য পথ খুঁজে বার করার উপায় ভাববে। সে পথ ট্রেনে কাটা পড়া বা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া নয়।”
”কিন্তু আর কী পথ আছে?” আভা অসহায় স্বরে বলল। ”আপনি যদি অবিবাহিত হতেন, যদি আমার ভগ্নিপতি না হতেন তাহলে-”
”তাহলে কী?” হিরণ্ময়ের চোখও তীক্ষ্ন হল, কথার মতো।
”তাহলে কোনো সমস্যাই উঠত না।”
”তার মানে বিয়ে?”
আভা মাথা নামিয়ে চুপ করে রইল। হিরণ্ময় বিরক্ত স্বরে বলল, ”এ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারো না? বিয়ে করলেই কি মোক্ষলাভ হবে, বিয়ে করলেই কি ভালোবাসা প্রেম সার্থক হয়ে উঠবে?”
”হ্যাঁ।” হঠাৎ উদ্ধত ভঙ্গিতে অধৈর্য স্বরে আভা বলে উঠল। এতক্ষণ ধরে হিরণ্ময়ের ক্রমান্বয় প্রশ্নে সে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়তে পড়তে ক্ষেপে উঠছিল। কথাগুলোর মধ্যে নিছকই কথা ছাড়া, আসল এবং আসন্ন বিপদ থেকে রেহাই পাবার কোনো উপায় সে খুঁজে পাচ্ছিল না।
”তাহলে আমায় ভালোবাসলে কেন?” হিরণ্ময়ের স্বরে এতক্ষণে রাগ ফুটে উঠল। ”তাহলে আমায় বাধা দিলে না কেন? তোমার এই অবস্থা করার সুযোগ দিলে কেন? তুমি কি জানতে না, বিয়ে করার উপায় আমার নেই? বলো, জবাব দাও আমার কথার?”
আভা কথা না বলে হিরণ্ময়ের পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরোবার জন্য এগোতেই, হাত তুলে দরজা আটকে দাঁড়াল হিরণ্ময়। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, আভার গায়ের জোর তার থেকেও বেশি। ইচ্ছে করলে তাকে ঠেলে সরিয়ে, বেরিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু আভা তা করল না। তাতে হিরণ্ময় মনে করল, এটা ওর বিনয়। উত্তেজিত স্বরে আবার প্রশ্ন করল, ”জানতে না, তুমি অন্যায় কাজ করছ। জানতে না, তুমি পাপ করছ?”
”না। আমি জানতাম না, সত্যি বলছি বুঝতে পারিনি তখন আমি কী করছি। কিন্তু আমি ভালোবাসি আপনাকে, এখনও ভালোবাসি। আপনি আমায় ছেড়ে দিন। আমি পারব না আপনার মতো নিষ্ঠুর হতে। আপনি যা চাইছেন তা হয় না।”
আভা কান্নার দমকে কাঁপতে শুরু করল। হিরণ্ময় দরজা থেকে হাতটা নামাল। আভা দুহাতে চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে বলে উঠল।
”সারাক্ষণ আমি ভেবেছি আর বারবার মনে হয়েছে, কী অপরাধ আমি করেছি! কার কাছে আমি অপরাধী?”
”তোমার দিদির কাছে।”
”হ্যাঁ, তাই। জানেন, একদিন স্বপ্ন দেখেছি দিদি মারা গেছে ট্রেনে কাটা পড়ে। আমার কতদূর যে অধঃপতন হয়েছে। আমি ওর মৃত্যু নিশ্চয় চুপিচুপি কখনো কামনা করেছিলাম। ভাবতে পারেন, আমি খুনি হতে চেয়েছিলাম!”
”আমিও চেয়েছি। স্বপ্নে নয়, জেগেই আমি চাই। তোমায় বিয়ে করতে পারব বলে নয়, শুধুই রেহাই চাই। কীসের রেহাই, কেন রেহাই, অত বোঝাতে পারব না এখন। তবে, হাত-পা ছড়িয়ে আমি একা ঘুমোতে চাই ওই বিছানাটায়। আর কিছু নয়, আর কিছু নয়।”
মুখ থেকে হাত নামিয়ে ফেলেছে আভা। ক্লান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। শুকনো স্বরে বলল, ”আপনি চাইতে পারেন কিন্তু আমি পারব না। আমি জানি, আমি পাপ করেছি, তার জন্য শাস্তিই আমার প্রাপ্য।”
”শাস্তি তাহলে আমারও প্রাপ্য। কিন্তু নিজেকে তিল তিল খুন করে অপরকে সুখী করতে হবে, এমন কোনো শর্ত পূরণ করার কথা আমাদের আছে কি?” হিরণ্ময়ের স্বর তীব্র। চোখ দুটি জ্বলজ্বলে। সে উত্তেজনায় কাঁপছে।
