হঠাৎ পাগলের মতো ছুটে গিয়ে বাসুদেব হাত ধরল অনন্তের।
”বলব? সেই কথাটা বলব? কেন তুই কুমার চৌধুরীকে দেখলে ভয় পাস, কেন তুই কুমারের কথায় ওঠ-বোস করিস-এবার বলে দিই পাড়ার লোককে? ভেবেছিস ভুলে গেছি, অ্যাঁ, পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা বলে, ভেবেছিল ভুলে গেছি, অ্যাঁ-আমার মেয়ে পালিয়েছে, অ্যাঁ।”
অনন্ত দেখল সারা জয়রাম মিত্র লেন আবার কৌতূহলে তাকিয়ে। এমনকি চার যুবকও। হঠাৎ তার চোখে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। মাথার মধ্যে শুধু সোঁ সোঁ শব্দ। তার মনে হল বন্যা ছুটে আসছে-এবার সে ভেসে যাবে। আশ্রয়ের জন্য সে এধার-ওধার তাকাতেই দেখল টিউবওয়েলের পাশে একটা আধলা ইঁট পড়ে।
”এবার বলি ব্যাটা রাঙ্গামুলো? বলি, ভুবন চৌধুরী তোকে ওই কুমারের সামনেই দোকানের মধ্যে-”
এই সময়ই অনন্তের ছোঁড়া ইটটা ওর মুখে এসে পড়ল। আর তখনি দপ করে সারা জয়রাম মিত্র লেনের বাড়ির আলোগুলো নিভে গেল।
”আবার!” একজন বলল।
”দ্যাখো, আজ কতক্ষণ অন্ধকার থাকে।” আর একজন বলল।
”চল চল, দরজা খোলা রয়েছে, চুরি-টুরি না হয়।”
ভিড়টা খসে পড়তে লাগল অন্ধকারে।
.
”অ বউ, কোথায় চললি। খোকা ফিরল? অ বউ সাড়া না দিয়ে যাচ্ছিস কোথা?
”যমের বাড়ি।” দাঁতে দাঁত চেপে পারুল বলল।
”অ বউ, কাল খোকাকে বাজার যাবার সময় মনে করিয়ে দিস।”
পারুল ততক্ষণে বেড়ালের মতো হালকা পায়ে নিঃশব্দে উপরে উঠে গেছে। শোবার ঘরের দরজা খোলা, অশোক চোখ বুজে চিত হয়ে শোওয়া, বাচ্চচাটা অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
পারুল সামান্য ইতস্তত করে, ঘরে ঢুকে মৃদুস্বরে বলল, ”মাথাধরার ওষুধটা আছে।”
অশোক চমকে উঠল। এতক্ষণ ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে সুকুমার আর ঝুমিকে নিয়ে কতকগুলো দৃশ্য তার মনের মধ্যে আসা-যাওয়া করছিল। এইমাত্র তার দেখতে ইচ্ছে করছে ঝুমিকে। মেডিকেল কলেজে না গিয়ে বাড়ি ফিরে আসাটাকে সে অন্যায় বলে মনে করতে শুরু করেছে। এখনই ঝুমির দরকার একজন পুরুষ মানুষের। অথচ কেন যে সে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে এল, পথে চিনেবাদামও কিনেছিল, তার কারণ বুঝে উঠতে পারছে না অশোক। হয়তো ঝুমিকে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখবে এবং সে দৃশ্য না দেখার ইচ্ছাতেই ফিরে এসেছে। কিংবা সুকুমারকে দেখলেই বরাবর যে এক ধরনের আড়ষ্টতা বোধ করত এবং তুলনায় নিজেকে নগণ্য বোধ করার সেই ভয়টা থেকেই হয়তো মেডিকেল কলেজে যায়নি। সুকুমারকে মাতাল অবস্থায় পেয়েছিল বলেই না ওর সঙ্গে তামাশা করতে পেরেছিল। নয়তো বিদ্যা-বুদ্ধি-রূপে-ব্যক্তিত্বে মদ-না-খাওয়া সুকুমার অন্য ব্যাপার।
অশোক নিজেকে অল্পবিস্তর কাপুরুষও মনে করল। একটা মাতালকে যে-কেউই পরিহাস করতে পারে। তার বোধশূন্যতার সুযোগ ভাঙিয়ে ব্যঙ্গ করার মধ্যে সাহস নেই। দুঃসংবাদ পাওয়া ঝুমির, যে একদিন একটা চুমু দেবে বলেও দেয়নি, সামনে যেতে পারেনি এই সাহসের অভাবের জন্যই। জীবনে কোনো উন্নতিই করতে পারেনি সে সাহসহীনতার জন্য।
ভাবতে ভাবতে অশোক তেতে উঠতে শুরু করে, সাহসী একটা কিছু করার জন্য। এমন একটা কিছু যাতে তার মনে হয়, ঝুমিকে সে অনায়াসেই পেতে পারত, নেহাতই সুকুমারের প্রতি অনুগ্রহবশত-
”ছিঁড়ে পড়ছে মাথাটা।”
পারুল দু’হাতে কপাল চেপে যন্ত্রণাসূচক একটা শব্দ করল অস্ফুটে। অশোক উঠে বসল।
”ওষুধ তো ফুরিয়ে গেছে।”
অশোকের মনে হল, একথা শুনে ঝুমির শরীরওলা বউটি মোটেই হতাশ হল না।
”তাহলে কী করি?”
”আসুন, বরং মাথাটা টিপে দি।”
”থাক থাক। বউ নেই কিনা তাই খুব সাহস দেখাচ্ছেন।”
‘সাহস’ কথাটা শুনেই অশোকের চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল, আপনা থেকেই দুই চোয়াল শক্ত হয়ে পড়ল। এই অশিক্ষিত বউটির ঠাট্টা তার ভালো লাগেনি। কেমন যেন চ্যালেঞ্জ রয়েছে ওর গলার স্বরে।
”বউয়ের সামনে অনেক সাহস না দেখানোই তো সাহসের কাজ।”
”খুব বীরপুরুষ আপনি।” পারুল মাথা হেলিয়ে চোখ দুটো আধবোজা করে হাসল। ”শনিবার যা ধাক্কা দিয়েছিলেন মাথায়।”
”আমি! মাথায় ধাক্কা!” অশোক খুব অবাক হবার চেষ্টা করল।
”শুধু ধাক্কা!” পারুল পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়াল। ”ঘাড়ে এই দাঁতের দাগ কীসের?”
”কই দেখি”। অশোক এগিয়ে গেল। পারুলের পিঠ-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর মাথার নারকোল তেলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে আলতো করে কাঁধে আঙুল ছোঁয়াল। ”এইখানে?”
”শুধু ওখানে?” পারুল হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, ”ব্লাউজের একটা বোতামও তো আস্ত রাখেননি। ইলা যদি তখন এসে পড়ত!”
”এখন তো আর ইলা নেই।”
”এখন তো আপনি মদও খেয়ে নেই। সাহস হবে কী করে।”
অশোকের আঙুলগুলো কুঁকড়ে চেপে বসল পারুলের কাঁধে। হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে সে পারুলকে গায়ের উপর এনে ফেলল।
”মদ না খেয়ে সাহস হয় কিনা দেখবে?”
পারুল ঘাড় ফিরিয়ে অশোকের চোখে চোখ রাখল। ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোল মুচড়ে হাসল এবং দেহটিকে আলতো করে চেপে ধরল অশোকের সঙ্গে।
”ঝুমি হলে নিশ্চয় আপনার সাহস হত।”
শোনামাত্র অশোকের শরীরের ভিতরে এবং বাইরে শক্ত হয়ে উঠল। একটু পিছিয়ে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, ”ঝুমিকে জানলে কী করে।”
”জেনেছি।” পারুল ঘাড়ে হাত বুলোতে বুলোতে তেরছা চোখে তাকাল। ”ভয় নেই, ইলা জানে না।”
”জানুক, আমি কেয়ার করি না।”
”ঝুমিটা কে?” পারুল বলল।
”একটা মেয়ে। এখন দুটো ছেলের মা। কয়েক ঘণ্টা আগে বিধবা হয়েছে।”
