”হ্যাঁগা, কী হবে!”
”গুপীনাথ কি পড়েই আছেন?”
”হ্যাঁ, মেঝেয় একেবারে মুখ থুবড়ে।”
”থাকুন ওইভাবে, কেউ যেন ওঁকে টাচ না করে। আমি থানায় ডায়রি করে আসছি। মন যেন কেমন কু-গাইছে। দেখি, বলটা দাওতো।”
বলটা ফুটো। টিপতেই হাওয়া বেরিয়ে চুপসে গেল। হঠাৎ অনন্তর মনে হল, এটা যেন চেনা। আজই সকালে তার বাড়ির সামনে বাসুদেবের ছেলেটা একটা সবুজ বল টিপে টিপে চোপসাচ্ছিল।
”হারামজাদা।” দাঁতে দাঁত ঘষে অনন্ত তিরবেগে সদর দরজার দিকে ছুটে গেল। লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ল। ভারী শরীরটা টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে সামনের বাড়ির দেয়ালে ধাক্কা খেল। ঘুরে সোজা হয়েই দেখল বাসুদেব তাঁতিগলির মুখে দাঁড়িয়ে ছোটোছেলেকে বলছে-”যা দিদিকে ডেকে নিয়ে আয়, আর বাড়ির বাইরে থাকতে হবে না। বল বাবা ডাকছে, এখুনি না এলে জুতিয়ে পিঠের চামড়া তুলে নেবে।”
”শালা তোরই চামড়া তুলব।” চিৎকার করে অনন্ত এগিয়ে গেল বাসুদেবের দিকে।
বাসুদেবের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল অনন্তের কথাগুলো কার উদ্দেশ্যে, বুঝতে। বোঝার পর আর সময় পেল না।
”এটা কীরকম ছোটোলোকমি হল অ্যাঁঃ? আমি থানা-পুলিশ করব।” অনন্ত রবাবের বলটা তুলে ধরল। সেটা দেখে বাসু মিইয়ে গেল।
”কেন, থানা-পুলিশ কীজন্য?”
”ন্যাকা, জানো না? এ বল আমার ঠাকুরঘরে ছুঁড়ে গুপীনাথকে ইনজিওরড করা হয়েছে, আর এ বল তোরই ছেলের।”
”কে বলেছে ওটা আমার ছেলের বল?” বাসু তেরিয়া হবার চেষ্টা করল।
”বলটা তবে কার?”
”কার তা আমি কী করে বলব! উইদাউট এনি প্রুফ বললেই হল? ওরকম বল হাজার হাজার, থাউজেন্ড অ্যান্ড থাউজেন্ড ছেলের কাছে পাওয়া যাবে।”
”তোর ছেলের হাতে আজ সকালেই আমি দেখেছি। এই দ্যাখ, এইভাবে”-বলটা বাসুর মুখের সামনে ধরে অনন্ত টিপল। ”তোর ছেলে, এইতো এই ছেলেটাই, টিপছিল।”
বাসুর ছেলে তখন তার দিদি প্রমীলাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোচ্ছে তাঁতিগলি থেকে। ভ্যাবাচাকা খেয়ে কেঁদে উঠল ভয়ে।
”হোয়াট ইজ দিস!” বলের হাওয়া মুখে লাগতেই বাসু আঁতকে পিছিয়ে গেছল। ”অ্যাঁ নোংরা বলের হাওয়া মুখের উপর? আমার ছেলেকে থ্রেট করে কাঁদানো? আই উইল কল পুলিশ। আমিও থানায় যাব। তেল বার করে ছাড়ব।”
বাসুদেব চিৎকার শুরু করল লোক জড়ো করার জন্য। বারান্দা এবং জানলা ভরে গেল। বাড়ি থেকে অনেকে বেরিয়ে এল। পথচলতিরা কৌতূহলে দাঁড়াল।
”কী হয়েছে বাসুবাবু?” একজন জিজ্ঞাসা করল।
”এই দ্যাখো না ভাই”, বাসু খুশি হল প্রশ্নটা হওয়ায়। ”অনন্তর ঠাকুরঘরে কে ওই বলটা ছুঁড়েছে, আর এসে গালাগাল দিয়ে বলছে, বলটা আমার ছেলের অর্থাৎ ওই ছুঁড়েছে।” ”আমি জানতে চাই” বাসু বাঁ তালুতে ডান হাতের চাপড় মারল। ”আই ডিমান্ড, আমার ছেলেকে কেন, কীসের ভিত্তিতে দায়ী করা হল? প্রুফ নেই, উইটনেস নেই। আর তম্বি করা হচ্ছে থানা-পুলিশ করবে! করুক না, দেখি কত তেল হয়েছে।”
অনন্ত থিতিয়ে যাচ্ছিল। বাসুর শেষ কথাটায় ভেসে উঠল। ”হয়েছেই তো। একশো বার তেল হয়েছে। তুই তোর নিজের চরকায় তেল দে না। জানেন মশাই, ব্যাটা কী বলেছে মুদিকে! আমার ঠাকুর্দা নাকি নোট জাল করত, ডাক্তারবাবুকে বলেছে, আমার বাবার নাকি খারাপ রোগ ছিল।”
”কোন শালা আমার বাপ-ঠাকুর্দা তুলে কথা বলেছে।”
হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল দুলাল। নাকে কাপড় দিয়ে কাছের লোকেরা একটু সরে গেল।
”আমি বলেছি”, বাসু সমান তেজে চিৎকার করল, ”গরম, পয়সার গরম দেখাবে অনন্ত সিংগী? গাড়িতে পা তুলে একদিন আমার বাপ-ঠাকুদা ও দাঁড়াত রে, তখন তোর বাপ-ঠাকুর্দা এসে আমাদের বৈঠকখানায় জুতো খুলে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকত, বসতে বললে তবেই বসতে পারত। পয়সা আজ আছে কাল নেই, কিন্তু বংশের শিক্ষা-দীক্ষা চিরকাল রক্তে থেকে যায় রে থেকেই যায়।”
”ব্যাটার মাসের মধ্যে দশ দিন তো উনুন ধরে না।” অনন্ত ভাইকে পেয়ে প্রচণ্ড বলশালী বোধ করছে। নিশ্চিন্তে এবার সে বলটা বাসুর নাকের কাছে আবার টিপল।
”আমার উনুন ধরে কি না ধরে তোর বাপের কী?”
”চপরাও শালা, বাপ তুলবি না।” দুলাল টলে পড়ে যাচ্ছিল, অনন্তই ধরে ফেলল। রক্তারক্তি করে দোব। অনন্ত সিংগীকে যা খুশি বল শালা, বাপ-ঠাকুর্দা নিয়ে টানাটানি করলে রক্তগঙ্গা বইয়ে দোব।”
”ব্যাটা, ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারিস না। বড়োমেয়েটা তো সেজন্যই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।” অনন্ত বলটা কচলাতে লাগল মুঠোয়।
”থাক গে অনন্তবাবু, ওসব পারিবারিক কেলেঙ্কারি আর রাস্তার মাঝে বলার দরকার কী।” একজন শ্রোতা অনুরোধ জানাল অনন্তকে উসকে দেবার জন্য।
”বাসুদা বাড়ি যাও, বাড়ি যাও। আর চেঁচাতে হবে না। তোমার আবার ব্লাডপ্রেশার আছে।” এক শুভানুধ্যায়ী বাসুর হাত ধরে টানল।
বিমূঢ় বাসুদেব ফ্যালফ্যাল করে সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। অনন্ত গোলাকার ভিড় থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির সদরের দিকে এগোল। গোলমাল শুনে তার বাড়ির সবাই এসে সদরে দাঁড়িয়েছে। ঝি এসে ফিসফিস করে অসমাপ্ত পারিবারিক কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। পাত্রী দেখতে আসা চার-যুবকও সদরে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে। অনন্তর মনে হল, তার প্রতাপের সম্যক পরিচয় পেয়ে নিশ্চয় ওরা পুতুলকে পছন্দ করার সময় খানিকটা কন্সিডার করবে।
