”প্রায়ই তা আসে। গাড়িটা বরাবর আমার বাড়ির সামনেই রাখে। একদিন পুতুল দোতলার ঘরে গাইছে, গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়েই শুনে পিসিকে গিয়ে বলে, একটি মেয়ের গলা শুনলুম, ভারি মিষ্টি তো! জিগ্যেস করো তো যদি সিনেমার গান গাইতে রাজি থাকে, তাহলে এখনি কনট্রাক্ট করব। পুতুলের মা’র কাছ থেকে শুনে আমি বললুম, দরকার নেই বাপু। আগে বিয়ে হোক, তারপর শ্বশুরবাড়ি যদি চায় তখন নয় সিনেমা-জলসায় গাইবে। আমি আবার একটু সেকেলে ধরনের মানুষ। অনেকে তো তাই বলে, অনন্ত সিংগী মরে গেলেও বনেদিপনা ছাড়বে না কিছুতেই।”
খাবারের প্লেট হাতে ঝি ঢুকতেই অনন্ত কথা বন্ধ করে প্লেটগুলি ওদের সামনে সাজিয়ে রাখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তখন যুবক চতুষ্টয় নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে-
”গলির মধ্যে তাই হেরাল্ডটা এনেছে। নয়তো ছ’টা হেডলাইট-ওয়ালা সেই ফোর্ডটাতেই চড়ে।”
”জিতু বলছিল, ওটার কারবুরেটারটা গোলমাল করছিল বলে ওদের গ্যারেজে একবার পাঠিয়েছিল।”
”জিতুর কথা তো! চেপে যা বাবা। কোনোদিন হয়তো শুনবি বোম্বাই থেকে রাজকাপুর গাড়ি এনেছিল অ্যাক্সেল বদলাতে।”
যে যুবকটি কথা বলেনি অর্থাৎ পুতুলের হবু স্বামীকে অনন্ত বলল, ”নাও বাবাজি, আগে একটু মিষ্টিমুখ হয়ে যাক।”
এই সময় সদরে কড়া নাড়ার শব্দ হল। অনন্ত বৈঠকখানা থেকেই হাঁক দিল,”কে?”
”আমি অসীম।”
শুনেই উদ্বিগ্ন হয়ে অনন্ত বেরিয়ে এল।
”কী ব্যাপার?”
আংটিটা বার করে অসীম বলল, ”পাঁচশো টাকা দিতে পারেন এক্ষুনি।”
”এখন তো পারব না, সিন্দুক আজকের মতো বন্ধ করে ফেলেছি। কাল সকালে বরং এসো।”
এরপর অনন্ত আংটিটা হাতে নিয়ে আলতোভাবে দুবার লুফে বলল, ”তিনশো টাকার বেশি তো হয় না।”
”আমার এখুনি পাঁচশো টাকা দরকার।”
”কাল সকালের আগে দিতে পারব না। এখন আমি খুবই ব্যস্ত রয়েছি, কাল বরং এসো চারশো পর্যন্ত দিতে পারব।”
অনন্তের পা দুটো জড়িয়ে ধরবে কিনা অসীম ভাবল। লোকটা হয়তো এতক্ষণে আবার চিৎকার শুরু করেছে। ঘরের কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে প্রভাত মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসবার চেষ্টা করছে। এবাড়ি-ওবাড়ি উঁকিঝুকি দিচ্ছে।
অসীম হাত বাড়িয়ে নিচু হতে যাচ্ছে, অনন্ত এক পা পিছিয়ে গেল।
”একি, এসব কেন! বলছি তো কাল এসো। আজ কিছুতেই পারব না। লোক বসে রয়েছে, তুমি এখন এসো, আমি খুব ব্যস্ত।”
বলতে বলতে অনন্ত পিছিয়ে যেতে লাগল। এই সময় ছাদের ঠাকুরঘরে ঝনঝন শব্দ উঠল বাসন পড়ার। দোতলার বারান্দায় উবু হয়ে যারা বৈঠকখানার জানলা দিয়ে পুতুলের হবু-বরকে দেখার চেষ্টা করছিল, তাদের কেউ ছুটে গেল তিনতলায়।
অসীম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল অনন্ত বৈঠকখানায় ঢুকে গেল। রাগে অন্ধকার হয়ে এল তার দৃষ্টি। বাবা, মা, ভাইবোন, ঠাকুমা প্রত্যেককে অকথ্য গালাগাল দিতে দিতে নিজের ডান হাঁটুকে কিল মারতে শুরু করল। ”এইটে, এইটেই যত নষ্টের গোড়া।”
”এই এক ঝামেলা” বৈঠকখানায় ঢুকেই অনন্ত চারজনের প্লেটের উপর চোখ বোলাল, ”একি হাত যে চলছে না। অ্যাঁ, ইয়ংম্যান সব, এখনও এতগুলো পড়ে রইল যে।”
”এত দিয়েছেন, দশজনেও যে শেষ করতে পারবে না।”
”তার উপর আসার আগে রেস্টুরেন্টে একটা করে কাটলেট সাঁটিয়ে এসেছি।”
”অবিশ্যি আমাদের পল্টুকে আনলে কোনো ভাবনা ছিল না। মনে আছে রে, গত বছর দমদমের সেই পিকনিকে?”
ওরা সবাই মুচকি হাসল।
”কাউন্সিলার কুমার চৌধুরী আবার লোক পাঠিয়েছিল। এই এক ঝামেলা।” অনন্ত গুছিয়ে বসল, ”আমিই ওকে দাঁড় করিয়েছি। ছোটো থেকেই বলতে গেলে আমাদের বাড়িতেই মানুষ। বাবা তো একটা সাইকেল মিস্তিরি ছিল, সাইকেল ভাড়া দিত। আমরা শিখেছি ভুবনের সাইকেল ভাড়া নিয়ে। সেই ভুবনের ছেলে কুমার। কিছুতেই রাজি ছিল না ইলেকশানে নামতে। জেতার কোনো চান্স অবিশ্যি ওর ছিল না। পাড়ার লোকেরা ধরল এসে, অনন্তদা তুমি বেরোও একবার, কুমারও এসে ধরল। একদিন বেরোলুম ওর জন্য। আমার যত মামলা-মোকদ্দমা সব তো ওই করে, এক পয়সাও ফি নেয় না। ওকি, সন্দেশটা পড়ে রইল কেন! না, না, কিচ্ছু ফেলা চলবে না। এইমাত্র কুমার একটা ছেলেকে পাঠিয়েছিল, যদি আমার কাছ থেকে চিঠি আনতে পারে, তবেই ওকে কর্পোরেশনে চাকরিতে ঢুকিয়ে দেবে। আমি না বললে হবে না। ছেলেটা তো পা জড়িয়ে ধরল। এ যে কী জ্বালা কী বলব। দিনরাত কড়া নড়েই চলেছে। কী? না, কুমারবাবু পাঠিয়ে দিল। এমন শত্রুতা করবে জানলে কী আর ওটাকে জেতাতুম।”
অনায়াসে কথাগুলো বলার সুখে ঝকমক করতে লাগল অনন্তের চোখ। লক্ষ করল, যুবক চতুষ্টয়ের বসার ভঙ্গিতে সমীহের ছাপ লেগেছে। ঝি ব্যস্ত হয়ে এসে বলল, ‘বাবু একবার ভেতরে আসুন, কাণ্ড হয়েছে এক।”
অনন্ত বেরিয়ে দেখে ওর স্ত্রী দাঁড়িয়ে, হাতে একটা সবুজ রবারের বল।
”এই দ্যাখো, কে ছুঁড়ে মেরেছে ঠাকুরঘরে সোজা গুপীনাথের গায়ে। গুপীনাথ উলটে পড়ে গেছেন। কী যে অমঙ্গল ঘটবে। আমার কেমন বুক কাঁপছে ভয়ে। কে এমন শত্রুতা করল গো।” ডুকরে কেঁদে উঠল অনন্ত গৃহিণী।
ভয়ে অনন্তের মুখ শুকিয়ে গেল। হঠাৎ এই সময় কে বল ছুঁড়ল? তাও সোজা গোপীনাথের গায়ে। নিশ্চয় কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে। ক্ষতি করতে চায়, নয়তো অত ভারী বিগ্রহ পড়ে যাবেই বা কেন! কাছে থেকেই ছুঁড়েছে। ঠাকুরঘরের দরজার সামনেই তো বাসুদেবের ছাদটা।
