”আমাকে তাহলে তুমি খুবই অভদ্র মনে করো।”
”করিই তো।” বলেই মনীষা ভাবল, ভোম্বলদা কি আবার গম্ভীর হয়ে যাবে এই শুনে! বড্ড হাসি পায় এইভাবে ওকে দেখলে।
”বেশ তাহলে আর কোনো কথা বলব না।”
ভোম্বল খুব খুশি হয়ে মুখখানাকে থমথমে করে তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত হল। চপল লঘু সুরে কথা বললেই মানুকে মানায়।
”না বললে আমার বয়েই গেল। আমি এখন কোনো বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাহলে গল্প করব।”
”মেয়ে না পুরুষ বন্ধু?” ভোম্বল কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বলল।
”পুরুষ বন্ধু।” মনীষা মুখটিপে হাসল, ভোম্বলের মনে হল, খুনসুটি না করলে মানু এমন করে হাসবে না।
”তোমার তো অনেক পুরুষ বন্ধু।”
”আছেই তো।”
”আমার কোনো মেয়ে বন্ধু নেই।”
”হবে কী করে, আপনি নামেও ভোম্বল, কাজেও ভোম্বল।”
”মোটেই না। অনেকেই এসেছিল বন্ধুত্ব করতে, কাউকেই পাত্তা দিইনি। সব বাজে চিপ-টাইপের।” কথাগুলোকে যুক্তিবান করার জন্য ভোম্বল আর একটু যোগ করল, ”ব্যাঙ্কিং-এর সেকেন্ড পার্টটা পাশ করলে অফিসার গ্রেডে যাবার চান্স আরও সহজে পাব, জানে তো, তাই এসে জুটছে।”
শুনতে শুনতে কালো হয়ে উঠল মনীষার মুখ। অন্যমনস্কের মতো আলতো আঙুলে খোঁপার গোলাপটি স্পর্শ করার জন্য হাত তুলতেই কাঁধ থেকে সিল্কের শাড়ির আঁচলটি পড়ে গেল।
”তুমি আবার কবে থেকে হাত কাটা ব্লাউজ পরা শুরু করলে?”
আঁচলটা বাহুর উপর টেনে সিধে হয়ে বসল মনীষা। বিব্রত স্বরে বলল, ”অনেকেই পরছে, ভাবলুম, দেখি একবার পরে।”
ভোম্বল গম্ভীর হয়ে সিগারেট ধরাল। দরজার পর্দাটা মনে হল যেন একটু সরে রয়েছে। বড়দা দেখে ফেলতে পারে ভেবে, টেনে-টুনে ঠিক করে দিল।
”এইরকম ব্লাউজ চিপ মেয়েরা পরে। আর ওইভাবে কোমরের অত নিচে শাড়ি পরা।”
”আমি তো চিপই।”
ভোম্বল আহত চোখে তাকাল। মানু কী রাগ করল তার কথায়? হয়তো চলে যেতে চাইবে এখুনি।
”তবে অনেককে পরলে ভালো দেখায়। বিশেষত যাদের গায়ে চর্বি নেই, ছিপছিপে লম্বা। তোমাকে বেশ মানিয়েছে।” বলে ভোম্বল হাঁফ ছাড়ল। মনীষা তবু মেঝের দিকে তাকিয়ে। মুখটা থমথমে হয়ে আছে।
”তোমাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে আজ।”
মনীষা মুখ তুলে একবার তাকাল। একটু হাসি ঠোঁটে লাগিয়ে বলল, ”আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।”
”মোটেই না, যা সত্যি তাই বলছি।” সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ভোম্বল জানলায় গেল।
”চিপ মেয়েরা আবার সুন্দর হয় নাকি।”
ভোম্বলের আর ছাই ঝাড়া হল না। পাংশু মুখে ফিরে তাকাল সে।
”তুমি রাগ করেছ?”
”না না, রাগ করব কেন, আপনি তো ঠিকই বলেছেন। সবাই তো আমায় তাই ভাবে।” মনীষা শান্ত গলায় বলল বটে, কিন্তু অভিমান চাপতে পারল না।
”সবাই কী ভাবে, তা দিয়ে কিছু এসে যায় না।” ভোম্বল খাটের উপর বসল। ”আসলে পাত্তা না দিলেই হল। সত্যিই তোমাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। ইচ্ছে করছে ফুলটা চেয়ে নিই।”
”সুন্দর বলে তো ঠাট্টা করলেন। তার উপর ফুল চেয়ে আর নুনের ছিটে দিতে হবে না।”
”সত্যি সত্যিই চাইছি।” ভোম্বল সিগারেট ধরা হাতই বাড়াল।
”নিয়ে কী করবেন?”
চট করে উত্তর দিতে পারল না ভোম্বল। দারুণ একটা কিছু বলার জন্য সে ঘরের চারপাশে চোখ বোলাল। এমন একটা কিছু বলতে হবে যাতে এইসব ধানাই-পানাই শেষ হয়ে আসল ব্যাপারে আসা যায়। অর্থাৎ, ভোম্বল ভাবল, মানু যেন ঠাট্টা না করে এবার সিরিয়াস কথা বলতে শুরু করে।
গোলাপটা খোঁপা থেকে হাতে নিয়ে মনীষা গন্ধ শুঁকছে। মুখে চাপা হাসি। ঠোঁটে হালকা বেগুনি রঙ, আঁচলটি পিঠের দিকে সরে যাওয়ায় ডান বাহুটি অনাবৃত, বাঁ পায়ের উপর ডান পা-টি রেখে ধীরে ধীরে নাচাচ্ছে।
”আজ একজন ঠিক আপনার মতোই চাইল ফুলটা।”
ভোম্বলের মনে হল ভূমিকম্প ঘটছে, দাঙ্গা হচ্ছে, আগুন লেগেছে, বন্যা হচ্ছে। নিশ্বাস ত্যাগের প্রথম ফুরসত পেয়েই সে বলল, ”কে?”
”নাম বললে আপনি চিনবেন না।”
”কেন চাইল?”
”তা কী করে বলব!”
”কে হয় তোমার? কোনো বন্ধু?”
”কে আবার, কেউ না।”
”তাহলে চাইল কেন?”
”আপনিই বা চাইছেন কেন, আপনি কি কেউ হন? তাছাড়া কেউ না হলে বুঝি চাইতে পারে না!”
”নিশ্চয় পারে যদি চাইবার মতো ঘনিষ্ঠতা থাকে।”
মনীষা এবার থেমে উত্তর খোঁজার জন্য খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তাই গোলাপটি হাত থেকে পড়ে গেল খাটের উপর। আর সঙ্গে সঙ্গে ভোম্বল সেটি তুলে নিল। মনীষা চমকে বলল, ”একি!”
ঘরের আলো নিভে গেছে।
”বোধহয় মেন ফিউজ হয়ে গেছে।” ভোম্বল উঠে দরজার দিকে যেতে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর এবং আবেগপূর্ণ স্বরে বলল, ”মনীষা, অন্ধকারে ভয় পেয়ো না।”
”না।”
ভোম্বলের বুক চিতিয়ে উঠল তাই শুনে। একটা চাপা কলরব শুনতে পেল সে। সারা পাড়া যেন হঠাৎ একবার হইহই করে উঠল। জানলায় এসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, ”সেরেছে। আজও আবার হল। শুধু আমাদের বাড়িতেই নয়, গোটা পাড়াটাই। দেখবে এসে, কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে রাস্তাটা, বাড়িগুলো এই অন্ধকারে।”
মনীষা উঠে এসে ভোম্বলের পাশে দাঁড়াল। সেন্টের গন্ধ পেল ভোম্বল। মিষ্টি একটা আবেশ তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। ফিসফিস করে বলল, ‘আমি এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, সত্যিই খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়।”
বৈঠকখানার তক্তপোশে চারটি ভব্যযুক্ত হয়ে বসে। অনন্ত ঝিয়ের হাত থেকে চায়ের ট্রে তুলে নিয়ে ওদের সামনে রাখল।
