”এখনও রাজি!” শেফালি এবার থতমত হল। অবিশ্বাসের সুরে বলল, ”আমি স্বেচ্ছায় আসিনি, তুমিই তাড়িয়ে ছিলে। মদ খেয়ে এসে আমায় লাথি মেরে কী বলেছিলে আজও আমার তা মনে আছে। আমি মেয়েমানুষ নই, আমাকে নিয়ে তোমার সুখ হয় না-”
কান্নায় গলা বুজে গেল শেফালির। দুচোখ দিয়ে টপটপ জল পড়ল। পঞ্চানন কাউন্টারের তলার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল। দোকানের দরজার পাল্লা আধ-ভেজিয়ে, ফিরে এসে বলল, ”দাঁড়িয়ে কেন, এই টুলটায় বোসো।”
শেফালি বসল।
”এই তো দোকান দেখছ। মাসে কতই বা রোজগার, বড়োজোর হাজার দুই। এর থেকে তিন-চারশো টাকা খোরপোশ দিতে হলে আমার সংসার অচল হয়ে যাবে। তাছাড়া তোমায় যদি বলি, এখন আমার কাছে এসে থাকো, পারবে?”
”ছেলেমেয়ে ক’টি?” ইতস্তত করে শেফালি বলল।
”বড়োটি মেয়ে, তেরোয় পড়ল। এখনও স্কুলে পড়ছে। তবে আর পারব না। পরের চারটি ছেলে। এই আয়ে এতগুলোকে নিয়ে আর চালাতে পারছি না। ভিখিরিরও অধম হয়ে থাকি। চাকরি খুঁজছি। এই বয়সে পাবই বা কোথায়!”
পঞ্চানন করুণ চোখে তাকাল। শেফালি চোখ সরিয়ে অস্পষ্টভাবে বলল, ”ওরা কি আমার কথা জানে?”
”জানে।”
”কিছু বলে।”
”তোমায় নিয়ে কোনো কথাই হয় না।”
”আর কেউ কিছু বলে না।”
”গীতা তোমায় শুধু একবার দেখতে চেয়েছিল।” পঞ্চানন ইতস্তত করে, কিছু ভেবে নিয়ে যোগ করল, ”আমি বলেছিলাম কিনা তুমি ওর থেকেও সুন্দরী।”
শোনামাত্র উঠে দাঁড়াল শেফালি।
”রোগে ভুগে ভুগে গীতার আর কিছু নেই। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। হয়তো আর বাঁচবেই না। তুমি একদিন এসে দেখে যেতে পারো, সত্যি বলছি কিনা।”
শেফালি দরজার দিকে এগোল।
”আমার এই সামান্য আয়ে আর ভাগ বসিয়ো না। ছাপোষা মানুষ আমি। জোড় হাতে মিনতি করছি শেফালি। মনে করো তুমি বিধবা হয়ে গেছ।”
কথা না বলে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে শেফালি।
দোতলা থেকে শেফালি নেমে আসতেই ইলা ব্যস্ত হয়ে বলল, ”দেরি হয়ে গেল বোধহয় ঠাকুরঝি। আপনার সঙ্গে চেনা আছে তো ওবাড়ির লোকেদের?”
”আমি এ পাড়ার মেয়ে, জম্মো থেকেই রয়েছি। চার নম্বর বাড়ির ভাড়াটেদের সঙ্গে নাইবা চেনা থাকল, জানলা দিয়ে একবার দেখব, তা কি আর দেখতে দেবে না? ওঘরে আগে থাকত লক্ষ্মীরা। তখন কত যাতায়াত ছিল।”
ওরা দুজন রাস্তায় নামল। অনন্ত সিংহ হাতে সন্দেশের বাক্স নিয়ে ফিরছে। শেফালি বলল, ”পুতুলকে সাজাচ্ছে কে গো, কাকিমা?”
”হ্যাঁ। আর আজকালকার যা সাজগোছের বহর, নিজেরাই সেজে নিতে পারে।”
অনন্ত এড়িয়ে গেল শেফালিকে। সত্যচরণ পাম্প করে যাচ্ছে টিউবওয়েল। শেফালি বলল, ”কীগো সত্যদা, জল নেওয়া যে আর শেষই হয় না। তখন থেকে তো হ্যান্ডেল চালাচ্ছ।”
‘দ্যাখ না, কালীর মা কিনা কীসের একটা বালতি এনে জল নিয়ে এল। সব ধুয়ে টুয়ে-”
”অ, কালীর মা জল নিচ্ছিল এতক্ষণ!” শেফালি মুখ টিপে ইলার দিকে তাকিয়ে হাসল। লক্ষ করে সত্যচরণের বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। কাল দুপুরে নির্ঘাৎ হারামজাদিটা গল্প করতে আসবে চারুশীলার কাছে। আঙুরকে পাঁচটা টাকা দিয়ে আসতে হবে। টাকা থাকে চারুর কাছে। চেয়ে নিতে হবে। কিন্তু আঙুরের সঙ্গে এই দেখা হওয়ার কথা কানে গেলেই, পাঁচ টাকার সঙ্গে সেটি গেঁথে তুমুল কাণ্ড বাধিয়ে ফেলবে। দাঁত কিড়মিড় করে সত্যচরণ তাঁতি গলির দিকে তাকাল। সেখানে অসীমের সঙ্গে কথা বলছে শেফালি।
শোভা আসতেই শেফালি বলল, ”আপনি এতদিন রয়েছেন পাড়ায়, অথচ ভাবসাব হয়নি। যাক আজ হয়ে গেল।”
”আমার কেমন আড়ষ্টতা লাগে। একদমই মিশুক নই, তবে ইচ্ছে করে খুবই।” শোভা নম্রস্বরে বলল।
”বউদিকে সেজন্য পাড়ায় বলে ডাঁটিয়াল।” অসীম হাসল শোভার দিকে তাকিয়ে।
”ওসব পাড়ার লোকের কথায় কান দিতে হবে না আপনাকে। সবাইকে আমার চেনা আছে। চলুন।” শেফালি তাঁতিগলির মধ্যে ঢুকল।
ইলা এতক্ষণ শোভার আপাদমস্তক দেখছিল খুঁটিয়ে। তাঁতিগলিতে ঢুকে শোভার পিছনে যেতে যেতে বলল, ”আপনার বোন এল না?”
”ও পড়ছে। ফাইনালের তো আর বেশি দেরি নেই।”
”আমি আর যাব না।” অসীম চার নম্বর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
”কেন রে, তুইও আয় না।”
”আপনারা দেখুন; আমি অনেক দেখেছি, কথাও বলেছি।”
অসীম গলি থেকে বেরিয়ে অনন্ত সিংহের বাড়ির সদরে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করল। তারপর কড়া নাড়ল।
নয়
”আপনি সিগারেট খান!”
ভোম্বল অর্থাৎ দ্বারিক সিগারেটের বাক্সটা সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে রাখল টেবিলে।
”কেন, আমি কি খেতে পারি না?”
”কোনোদিন তো দেখিনি।” মানু অর্থাৎ মনীষা খাটের উপর বালিশে কনুই ভর দিয়ে হেলে পড়ল।
”দেখবে কী করে, কোনোদিন কী তাকিয়ে দেখেছ?”
”আহা, এতবার এসেছি এ বাড়িতে আপনাকেই তো দেখতে পাই না।”
”মিথ্যে কথা বলো না। বাসস্টপে একদিনও তো ফিরে তাকাওনি। বড্ড ডাঁট তোমার।”
”আহা-হা, ডাঁট আবার কোথায় দেখলেন। আমি রোজই দেখতে পাই, আপনিই তো গম্ভীর হয়ে থাকেন। কথা বললে উত্তর দেবেন কী দেবেন না-” মনীষা মুখ টিপে হাসল।
দ্বারিক জোরে সিগারেটের টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং তৈরি করতে করতে ভাবল, এই নিয়ে দুবার ‘গম্ভীর’ শব্দটি ব্যবহার করল। গম্ভীর লোক তাহলে একদমই পছন্দ করে না ও। কিন্তু মুখ টিপে হাসলে মানুকে দারুণ দেখায়, আর কী বলা যায়, যাতে মানু এইভাবে হাসে।
