”দেখবেন।” অসীম ঠোঁট কামড়ে ভাবতে শুরু করল কীভাবে দেখাবার ব্যবস্থা করা যায়।
”চার নম্বর বাড়ির একতলায় যারা ভাড়া থাকে, তাদের ঘরের জানলা আর ওই মাস্টারনির জানলাটা একদম মুখোমুখি, যদি চার নম্বরে যান, তাহলে-”
”ওরা কিছু মনে করবে না তো? আমি অবশ্য বেশিক্ষণ থাকব না।”
”মনে আবার করবে কী, আমি নিয়ে যাচ্ছি না!” অসীম তার ক্ষমতার বহর গলার স্বর দিয়ে শোভাকে বোঝাবার চেষ্টা করল।
শেফালি আর ইলা সেই সময় তাঁতি গলিতে ঢুকছে। তাই দেখে অসীম শোভাকে বলল, ”দুজন ঢুকছে, বোধহয় ওইজন্যই। দাঁড়ান, জিগ্যেস করে দেখি, তাহলে ওদের সঙ্গেই ভিড়ে যেতে পারবেন।”
অসীম দ্রুত গেল এবং এল। ”হ্যাঁ, আপনি আসুন, ওরা নিয়ে যাবে।”
শোনামাত্র শোভা চটি গলিয়ে সদরের দিকে ছুটে গেল প্রায়। খিলে হাত দিয়ে আবার ছুটে এল শোবার ঘরে। ট্যাবলেট খাবার সময় হয়েছে তার। ওর দৃঢ় ধারণা প্রতিদিন ঘড়ি ধরে না খেলে কোনো ওষুধেই ফল ফলে না। চাবি দিয়ে আলমারি খুলে মোড়ক থেকে একটি ট্যাবলেট বার করে মুখে ছুঁড়ে দিয়ে ”খোলা রইল, চাবি বন্ধ করে দিস”, আভাকে এই বলেই সে ছুটে বেরিয়ে গেল।
হিরণ্ময় শুনতে পেল রাস্তায় অসীম হতাশস্বরে বলছে, ”আপনি একাই যাবেন?”
উঠে দাঁড়াল সে। টিপু ঘুমিয়ে পড়েছে কি? আভাকে বলতে হবে, হেস্তনেস্ত করে জীবনটাকে বেশ একটা নাড়া দেওয়া দরকার। সেইজন্যই তো ব্যাপারটা ঘটালাম, জেনেশুনে, ইচ্ছে করেই।
ইলা ভাবল সিল্কের শাড়িটা পরবে কিনা। মনস্থির করতে করতে, চিরুনি টানল চুলে। একটু ক্রিমও লাগাল গালে। অবশেষে অশোকের মতামত নেওয়াই উচিত মনে করল।
”হ্যাঁগা, এই শাড়িটা পরেই যাব?”
অশোক বিরক্ত হয়ে মুখ তুলল বালিশ থেকে, ”তবে কী পরে যাবে? যাচ্ছ তো পাশের বাড়ি!”
ইলারও মনে হল কথাটা ঠিকই বলেছে। তাছাড়া সিল্কের শাড়িটা সবে আড়াই টাকা দিয়ে কাচিয়ে আনা হয়েছে। এইরকম ব্যাপারে বার করলে একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যায়।
নিচে এসে দেখল পারুলের দরজা ভেজানো। খুলে দেখল, পারুল শুয়ে, কপালে হাত, চোখ বন্ধ।
”কীরে, মাথা-ধরা কমলো?”
”না ভাই, আরও যেন মাথাটা ছিঁড়ে পড়ছে। তুই বরং যা।” বলে পারুল মুখচোখে যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলল। তাই দেখে ইলা আর কথা বাড়াল না।
শেফালি ভাতের হাঁড়িটা নামিয়ে তর্জনী ঠোঁটে ঠেকিয়ে ইলাকে চুপ থাকতে ইশারা করল।
”বাড়ির কেউ জানে না। তাহলে বউয়েরা হাতে কাজ ধরিয়ে বেরোনো বন্ধ করে দেবে।” ফ্যান গালতে গালতে ফিসফিস করে শেফালি বলল। ”বউগুলোকে জানোই তো। বিনি-পয়সায় দুমুঠো খাওয়া আর থাকার বদলে এই দাসীবৃত্তি আজীবন আমার ভাগ্যে লেখা আছে।”
সমবেদনায় ইলার অন্তর ভরে উঠল। শেফালি হাঁড়িটা মেঝেয় উপুড় করে বলল, ‘আসছি ভাই।”
রেডিয়োয় নাটক হচ্ছে। দুই ঘরে দুটি রেডিয়ো। বাড়ির সবাই দুই ঘরে ভিড় করে শুনছে। শেফালির হঠাৎ ইচ্ছে হয়েছে সিঁথেয় একটু চওড়া করে সিঁদুর দেয়। ঘরে এতলোক দেখে সে ফিরে গিয়ে অন্ধকার বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়াল। কী যেন তার হচ্ছে বুকের মধ্যে। হঠাৎই এখন পঞ্চাননকে মনে পড়ছে বারবার। মাস দুয়েক আগে দেখা করেছিল ওর সঙ্গে। বাগবাজারের দোকানটা আগেই সে চিনে রেখেছিল। অনেকদিন সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে, পঞ্চাননকে এক ঝলক দেখে নেবার আশায়। একদিন সে বেপরোয়ার মতো ঢুকেও পড়েছিল।
পনেরো বছর পর দেখে চিনতে পারেনি পঞ্চানন। খদ্দের ভেবে এগিয়ে এসে কাউন্টারে ঝুঁকে বলল, ”কী চাই বলুন।”
নিজের নাম বলতে শেফালির সঙ্কোচ হল। শুধু কোনোক্রমে বলে, ”কিছু কিনতে আসিনি।”
চশমার কাচের পিছনে পঞ্চাননের চোখ দুটিতে বিস্ময় ফুটতে ফুটতে হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে তীক্ষ্ন হয়ে গেল।
”তাহলে কী চাই?”
স্বরের গাম্ভীর্য পরিমাপ করে শেফালি বুঝল, চিনতে পেরেছে।
”কথা ছিল।”
পঞ্চানন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ডান গালের আঁচিলটার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটেনি। গোঁফটা আগের থেকে ছোটো হয়েছে, জামার কলার ময়লা, নখগুলো বড়ো, চামড়া খসখসে, অন্তত দু’দিন দাড়ি কামায়নি, অনেকগুলো চুল পেকেছে।
”আমার সম্বন্ধে কী ঠিক করেছ?” শেফালি স্পষ্ট স্বরে জানতে চাইল। তেজ দেখাবার বয়স আর নেই। লজ্জা করলেও চলবে না। বিয়ে করা বউ তো বটে, এই ভেবে সে সরাসরি পঞ্চানন্দের চোখের দিকে চেয়ে রইল।
”আমার তো ঠিক করার কথা নয়।”
”স্ত্রীর সম্পর্কে স্বামী ঠিক করবে না তো কে করবে? সেটাই তো নিয়ম।”
”তুমি যে আমার স্ত্রী, কে বলল?”
”আইন বলবে।”
”ওঃ, আইন দেখাতে এসেছ।”
পঞ্চাননের শরীর শিকার দেখা হিংস্র প্রাণীর মতো কুঁজো হয়ে গেল।
”দরকার হলে তাই দেখাব।”
থতমত হল পঞ্চানন। ঝাড়ন দিয়ে কাউন্টারের ধুলো মুছতে শুরু করল। এই সময় এক খদ্দের এল পাঁউরুটি কিনতে। শেফালি একধারে সরে দাঁড়াল। যাবার সময় লোকটি অভিযোগ করল, ”কালকের রুটি কিন্তু বাসি ছিল।”
”কী করব বলুন, কোম্পানি যেমন দেয়।”
”কোম্পানিকে জানান।”
লোকটি চলে যেতেই শেফালি বলে, ”তাহলে? ভায়েদের সংসারে এইভাবেই পড়ে থাকব? শাড়ি গয়নার তো আমার দরকার নেই, খাই-খরচ পেলেই চলবে।”
”যদি না দিই।”
”তাহলে মামলা করে আদায় করব।” শেফালি কাউন্টারে চাপড় মারল।
”যদি বলি স্বেচ্ছায় চলে গেছ, আমি বরাবরই তোমায় আমার কাছে রাখতে রাজি ছিলুম, এখনও রাজি?”
