”বুক-কেসের পিছনে এই বইটা পড়ে গেছল। কেসটা সরাতে পারলাম না একা। একটুও না। আভাকে ডাকলাম, ও এসে সরিয়ে বার করে দিল।”
”এইতেই বুঝলে!” শোভা স্পষ্টভাবে হেসে উঠল এবং উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, ”আমি একটু মোটা হয়ে গেছি না?”
হিরণ্ময় তাকাল এবং মনে মনে বলল, একটা সরল অঙ্ক ছাড়া আর কী? কিন্তু আমি জটিল অঙ্কে হাত দিলাম কেন? পুলিশ গুলি চালাচ্ছে খবর পেয়ে রাস্তায় বেরিয়েই বা গেছলাম কেন? আর আভা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়বে বলায় যৎসামান্যও আশ্বস্তবোধ করলাম কেন?
”দিদি দ্যাখো, টিপু পড়তে চাইছে না, ঘুম পাচ্ছে বলছে।”
আভা পর্দা সরিয়ে ঘরের দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকল। হিরণ্ময়ের দিকে একদমই তাকাচ্ছে না।
”ওই ওর বজ্জাতি। তিনটে শ্লেট ভাঙল, চারটে প্রথম ভাগ ছিঁড়ল, এখনও ক, খ-র বেশি এগোল না। ঘুম পাবে না তো কী? সারা দুপুর চোখের পাতা এক করে!”
”খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। মন যখন নেই, তখন আর পড়া হবে না। মিছিমিছি যন্ত্রণা দিয়ে লাভ কী?”
হিরণ্ময় শোভাকে উদ্দেশ্য করে বলল। অবশ্য সরাসরি আভাকেই বলতে পারত, কেননা টিপুকে খাওয়ানো ও ঘুম পাড়ানোর কাজটা তার। আভা তাকাল তার দিদির মুখে নির্দেশের জন্য। অবশ্য হিরণ্ময়ের কথা শুনেই সে টিপুকে খাইয়ে দেবার জন্য চলে যেতে পারত, কেননা এর উপর আর কারুর কথা খাটবে না।
”তাই দে।”
আভা চলে যেতেই আয়নার দিকে আবার তাকিয়ে শোভা বলল, ”হাসিদি বলছিল, আমি আগের থেকে বেশ মোটা হয়ে গেছি। ট্যাবলেট খেতে বারণ করে দিল। যারা খাচ্ছে সবাই নাকি মোটা হয়ে পড়ছে।” কিছুক্ষণ ঘাড় হেলিয়ে চুপ থেকে অনিশ্চিত স্বরে বলল, ”ভাবছি মাস দুই-তিন খাওয়া বন্ধ রাখব, কী বল?”
”তোমার খুশি।”
”আহা একা যেন আমারই খুশি।” আদুরি গলায় শোভা বলল এবং লাজুক চোখে তাকাল। পাউডার পাফটা দিয়ে আলতো করে গালে সুড়সুড়ি দিতে দিতে হঠাৎ শিউরে উঠে বলল, ”না বাবা, একটাই থাকা ভালো। একজনকে সামলাতেই হিমসিম খাচ্ছি, আর হয়ে দরকার নেই। তোমায় কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছি আর তিনটে ট্যাবলেট মাত্র রয়েছে।”
”তুমি নিজেই কিনতে পারো।”
”না বাপু, কেমন লজ্জা করে।”
শোভা ব্যস্ত হয়ে টেবিলে রাখা টাইমপিসটায় সময় দেখল। প্রতিদিন রাত আটটায় সে ট্যাবলেট খায়। কিছুতেই এর নড়চড় হয় না।
আসলে যা করার করে যেতে হয়, এই কথাটা ভাবতে ভাবতে হিরণ্ময় বাইরের ঘরে এল। ওর পিছনে শোভাও।
”কেউ বুঝতে পারবে না অথচ দেখাও হয়ে যায়, কীভাবে সেটা করা যায় বলো তো?”
হিরণ্ময় সোফায় গা এলিয়ে শোভার দিকে তাকিয়ে ভাবল : একটা উত্তর বার করতেই হবে আভাকে নিয়ে এখন কী করা যায়!
”আমার কী মনে হয় জানো”, শোভা বসল হিরণ্ময়ের গা ঘেঁষে। ”তোমার তো ব্লেড ফুরিয়ে গেছে, টুথপেস্টও কিনতে হবে। যদি এখন কিনতে বেরোই, যদি আস্তে আস্তে যাই আর ফিরি তার মধ্যে কি দেখে নেওয়া যাবে না?”
”কিন্তু তার মধ্যে যদি না বেরোয়!” হিরণ্ময় ভাবনার মধ্যেই কথাটা বলে দিয়ে আবার শুরু করল: গুলি খাওয়ার ইচ্ছাটাই কি ছদ্মবেশ ধরে ভালোবাসা হয়ে এল? একজনের মধ্যে এ দুটো জিনিস এল কী করে! মরা আর ভালোবাসা কি একই ব্যাপার!
”ওই সিংগী বাড়িতে গেলে অবশ্য দেখা যায়, কিন্তু আমার সঙ্গে তো চেনা নেই।”
”চেনা করে নাও।”
”নাঃ। ও বাড়িতে একটা মাতাল থাকে।” শোভার নাক কুঁচকে উঠল।
অতঃপর হিরণ্ময় শুরু করল : দুটোর একটা বেছে নেওয়া দরকার। হয় হিমাংশুর কাছে গিয়ে আভার ব্যবস্থা করা, নয়তো যেমন আছে তাই থাক। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা প্রকাশ হোক। শোভা জানুক, ওর বাবা-মা জানুক। ছ্যা ছ্যা করুক, আলাদা হয়ে যাক। তারপর পরিচিতরা জানুক, হাসাহাসি করুক, দুশ্চরিত্র লম্পট বলে নাক সিঁটকোক। আর তার মাঝে বেপরোয়ার মতো চলাফেরা, খাওয়া শোওয়া, কলেজ-পাবলিশার নিয়ে এক ধরনের বেঁচে থাকা। যা করার তাই করে যাওয়া ছাড়া পথ নেই। জিনিসটা আভাকে বলা দরকার, এখনি।
”তুমি বরং ওই ছেলেটার সাহায্য নিতে পারো। ওই যে কদিন আলাপ জমাতে এসেছিল। ফুটবল খেলে বেড়ায়।”
”অসীম!”
”মোটরের কাছাকাছি যে-কোনো একটা বাড়িতে জানলা কী বারান্দায় ও তোমাকে হাজির করে দিতে পারবে।”
শোভা নির্নিমেষে তাকিয়ে থেকে কিছু ভাবল। তারপর জানলায় গিয়ে পর্দা সরিয়ে খুঁজতে লাগল অসীমকে।
অতঃপর হিরণ্ময় শুরু করল : আভাকে বলতে হবে, আমার মানমর্যাদা, তোমার দিদির সংসার এসব নিয়ে চিন্তা না করে নিজের কথা ভাব। যতক্ষণ না নির্দিষ্ট একটা উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, অঙ্কটা কষেই যেতে হবে। তোমাকে টেনে তুলতে পারিনি, যেহেতু তুমি গায়ের জোরে আমার বিরুদ্ধতা করেছ, অথচ আমি বললেই তুমি ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই ধরনের উলটোপালটা ব্যাপারগুলোর মধ্যে একটা সমতা আনা দরকার। বিবেক দংশনের যন্ত্রণায় এভাবে কাতর হয়ে পড়ার কোনো দরকারই নেই। বিবেক চেহারা বদলায় তোমার-আমার অস্তিত্বের টানাপোড়েনের উপর।
আভার গলা শোনা যাচ্ছে শোবার ঘর থেকে। গল্প না শোনালে টিপু ঘুমোতে চায় না। ওকে ঘুম পাড়ানো-র কাজও আভার। হিরণ্ময় কান পাতল আভার গলা শোনার জন্য।
”ওই তো অসীম!” শোভা হাতছানি দিয়ে ডাকল।
অসীম কাছে আসতেই শোভা ফিসফিস করে বলল, ”একটু দেখিয়ে দিতে পার?”
