”আচ্ছা! আজই তাহলে দিয়ে আসব।”
সত্যচরণ হঠাৎ প্রফুল্ল বোধ করল। গুন গুন সুর বেরোল মুখ দিয়ে। পিছু ফিরে, আঙুরের চলন দেখে এখন তার মনে হল, মেয়েটাকে বালা গড়িয়ে দিতে কতই বা আর খরচ।
আট
”আশ্চর্য”, শোভা উত্তেজিত হয়ে আবার ঘরে ঢুকল। ”আভাকে এত করে বললাম, অথচ কানেই নিল না। সিনেমায় দেখা আর এমনি সামনা-সামনি দেখায় কত তফাত। আচ্ছা, তুমি কখনো কাউকে সামনা-সামনি দেখেছ?”
হিরণ্ময় বই থেকে মুখ তুলে তাকাল।
”না।”
”খুব ছোটোবেলায়, এই টিপুর মতো বয়সে আমি একবার অশোককুমারকে দেখেছিলাম। তখন বাবা বোম্বাইয়ে বদলি হয়েছিলেন।”
খাটের উপর খালি সিগারেটের প্যাকেটগুলো সাজিয়ে টিপু খেলা করছে। নিজের নাম শুনে মায়ের দিকে তাকাল। হিরণ্ময় পা দিয়ে একটা প্যাকেট ফেলে দিল ওকে রাগাবার জন্য। প্রায়ই এমন করে সে।
টিপু একটা কিল মারল হিরণ্ময়ের পায়ে। ”উঃ” বলে হিরণ্ময় পায়ে হাত বুলোতে শুরু করল। কিছুক্ষণ টিপু লক্ষ করবে না ব্যাপারটা। ক্রমাগত উঃ, আঃ করে যেতে হবে। তখন ওর ডাক্তারি শুরু হবে। সেটা দেখার জন্য মা ও মাসির অবশ্যই হাজির থাকা চাই।
”আজ থাক।” শোভা একটু চাপা গলায় হিরণ্ময়কে বলল। ”আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে, কী করে দেখা যায় বলো তো?”
”জানলায় দাঁড়িয়ে থাকো। বেরিয়ে এসে যখন গাড়িতে উঠবে দেখে নেবে।”
”কী যে বলো! জানলায় হাঁ করে দাঁড়াই আর যত রাস্তার বাজে লোক তাকিয়ে তাকিয়ে যাক! তুমি কলেজ থেকে ফিরে খেয়েছ তো?”
”থাকগে। একদম খিদে নেই।”
”আভা দেয়নি? ঠাকুরকেও তো বলে গেছলাম। জানো, ব্লাউজের ছিটটা থেকে কুড়ি সি.এম. কাপড় বাঁচবে, ওটা দিয়ে কী করা যায় বলো তো?”
হিরণ্ময় লক্ষ করল টিপু ঘনঘন তাকাচ্ছে তার পায়ের দিকে। গেঞ্জি বা ব্লাউজ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে, বগলে পেনসিল দিয়ে জ্বর দেখে, কাগজে ঘসঘস করে প্রেসক্রিপসান লিখবে। নিজেই ওষুধ কিনতে যাবে পাশের ঘরে। জলভরা একটা শিশি হাতে ঢুকবে এবং ঢক করে সবটা খেতে হবে। তারপর গলা পর্যন্ত চাদর টেনে দিয়ে ঘুমোতে বলবে। না ঘুমোলেই বিপদ। ঘুমের জন্য বারবিটুরেড ট্যাবলেটগুলো আছে আলমারিতে। শোভার কাছে চাবি। বার করে দেওয়ার জন্য বায়না ধরবে। ঘুমের ট্যাবলেট মাঝে মাঝে হিরণ্ময় খায়। হিমাংশুর ডাক্তারখানা থেকে শিশি ভর্তি এনে রেখে দিয়েছে। টিপুর হাতে কোনোক্রমে এই বিষাক্ত বস্তুটি যাতে না পড়ে, সেজন্য আলমারির মধ্যে তোলা।
হিরণ্ময় বুঝতে পারছে, একবার পায়ে হাত দিয়ে যন্ত্রণায় মুখ বিকৃতি করলেই টিপুর চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবে। মাস ছয়েক আগে পা মচকে যাওয়ায় হিমাংশু এসে যা যা করেছিল সেইগুলিই হুবহু অনুষ্ঠিত হবে।
”টিপু আজ নিয়ে পর পর তিনদিন তুমি পড়তে বসোনি। যাও মাসির ঘরে।”
”বাবার পায়ে যে ব্যথা হয়েছে।” টিপু মাসির ঘরে না যাওয়ার অজুহাত খাড়া করল।
”হোক ব্যথা, চলো।”
শোভা ওকে টানতে টানতে আভার ঘরের দিকে নিয়ে গেল। হিরণ্ময় হাতটা কপালের উপর রাখল। প্রায় প্রত্যেকদিনই এই ব্যাপার ঘটে। শুধু মজা লাগে টিপুর অজুহাতগুলো শুনতে। ওকে কিছুক্ষণ কাছে নিয়ে রাখার ইচ্ছা হল হিরণ্ময়ের। উঠে বসল সে।
ড্রেসিং টেবিলের উপর দুজনের ছবি মুখোমুখি। শোভা আর হিরণ্ময়। বিয়ের একমাস পর, দার্জিলিংয়ে তোলা। ফ্রেমের কিনারে হলুদ দাগ ধরেছে। সিগারেট ধরাতে ধরাতে হিরণ্ময় তাকাল। নিজেকে লক্ষ করল আয়নায়। বয়সের লক্ষণগুলো বেশ প্রকট মনে হচ্ছে। একমাস আগে চুল কাটার সময় নাপিত বলেছিল, ঘাড়ের উপরে দু-তিনটে চুল পেকেছে। শোভার চোখে আজও পড়েনি, নয়তো ও নিজেই কলপ কিনে আনত দু-তিনটে পাকা চুলকে ঘায়েল করতে। কোমরের বেড়ও বেড়েছে। চোখের চাউনিতে কীসের ছাপ ফুটেছে দেখার জন্য সে আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।
”একদম পড়তে চায় না আজকাল, আর আভারও যে কী হয়েছে”-বলতে বলতে শোভা থেমে পড়ল ঘরে ঢুকেই। ”কী দেখছ অমন করে?”
”বয়স।”
”তার মানে।”
”কতটা বেড়েছে দেখছি।”
শোভা ভেবে পেল না এরপর কী বলবে। বালিশটা চাপড়ে সমান করতে করতে একবার শুধু তাকাল হিরণ্ময়ের দিকে।
”তোমার কী মনে হয়, খুব বুড়ো দেখাচ্ছে?” হিরণ্ময় ঘুরে দাঁড়াল।
”খুব আর কোথায়। তবে আগের মতো আর হাসিখুশি থাকো না, সবসময়ই মুখ গম্ভীর, একটুতেই খিটখিট শুরু করো।”
”কেন বলো তো?” হিরণ্ময় যেন ক্লাশে একচেটিয়া-তত্ত্ব বোঝাতে হঠাৎ একটা প্রশ্ন এমনিই করে ফেলল।
”আমি কী করে বলব।” শোভার স্বর একটু গম্ভীর।
ধীরে পায়চারি শুরু করল হিরণ্ময় ঘরের অবশিষ্ট ফাঁকা মেঝের উপর।
”আমার গায়ে আর জোর নেই। কোনোকালেই খুব বেশি অবশ্য ছিল না। কিন্তু এখন একদমই নেই। সেটা আজ বুঝেছি। কিন্তু আমি-”
হিরণ্ময় থমকে পড়ল। সিগারেটের ছাই ঝাড়ল মেঝের উপর, যা দেখেও শোভার ভ্রূ কুঞ্চিত হল না।
”আজই কীভাবে বুঝলে?”
দ্বিধায় পড়ল হিরণ্ময়। একটা মেয়েকে দুহাতে টেনে তুলতে পারিনি এবং মেয়েটি আভা, একথা বলার সময় হয়েছে কিনা বুঝতে পারছে না সে। যদিও এক সময় মনে হয়েছিল শোভাকে বলব-কেন আমি আভার সর্বনাশ করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বলার কোনো অর্থ হয় না, যুক্তিও নেই। স্বীকারোক্তি দিয়ে কোনো লাভ হয় না। আসলে যা করার করে যেতে হয়।
