অসীম রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই ভাবল, আংটিটা বাঁধা দেব কি দেব না। চোখে পড়ল সত্যচরণ বালতি হাতে বেরিয়ে টিউবওয়েলের দিকে যেতে যেতে মোটরটার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর উবু হয়ে গাড়ির নিচে তাকিয়ে হুশ হুশ শব্দ করছে হাত নেড়ে। কিছু একটা তাড়াচ্ছে।
অসীম এগিয়ে এসে বিরক্তস্বরে বলল, ”কী করছেন?”
”দ্যাখ তো ফ্যালা, একটা বেড়াল-বাচ্চচা কোত্থেকে এসে জুটল। আরে ঢুকবি তো একেবারে মোটরের নিচেই। গাড়িটা চললেই তো চটকে যাবে। রক্তে মাংসে রাস্তাটার কি না হবে! কাক এসে ঠুকরে নিয়ে এবাড়ি-ওবাড়িতে বসবে, ছড়াবে, ছয়লাপ হবে। ডেঞ্জারাস। এভাবে তলায় বসে থাকতে দেওয়া উচিত নয়।”
অসীম নিচু হয়ে দেখল। সত্যিই পিছনের চাকার সামনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে একটা বেড়াল-বাচ্চচা। মিউ মিউ করে যাচ্ছে অনবরত।
”আছে থাক। স্টার্টের আওয়াজ পেলেই সটকান দেবে।”
”বলছিস পালাবে?” বলেই সত্যচরণ অনমনস্ক হয়ে গেল। কালীর মা অর্থাৎ আঙুরবালা টিউবওয়েলে জল নিতে এসেছে। আগে বাসন মাজতো সত্যচরণের সংসারে। চারুশীলা বছর তিনেক আগে ওকে বরখাস্ত করে দিয়েছে। আঙুর তারক কবিরাজ স্ট্রিটের বস্তিতে থাকে। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ।
এই সময় অনন্তের সদরে ওর ভাই দুলাল এসে দাঁড়াল। অসীমকে লক্ষ করে বলল, ”গাড়িটা কার রে ফ্যালা?”
প্রশ্নের সুরটা অসীমের পছন্দ হল না। তাচ্ছিল্য ভরে বলল, ”কে জানে।”
দুলালের মুখে দিশি মদের গন্ধ। অনন্তের সঙ্গে ওর মুখ দেখাদেখি নেই যদিও একই বাড়ির পিছনের অংশে থাকে। অনন্তের সঙ্গে দেখা করতে হলে, ডেকে দেবার জন্য কাকে বলা যায়। কাউকে দেখার আশায় অসীম উঁকি দিল রাস্তা থেকেই। চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করতে তার বাধল।
”কাকে খুঁজছিস?” দুলাল বলল।
”অনন্ত জ্যাঠাকে।”
”ও ব্যাটাকে আবার কী কম্মে দরকার। আমায় বল।” দুলাল বিড়ি বার করল পকেট থেকে।
”পারসোনাল টক আছে।”
”ওরে বাব্বা, অনন্ত সিংগীর সঙ্গেও লোকে পারসোনাল টক করে। কতই দেখব বাওয়া, দিনে দিনে। দ্যাখ, দ্যাখ, সত্যটা কেমন করে মাগিটার দিকে তাকাচ্ছে।”
অসীম দেখল ঘাড় ফিরিয়ে। প্রশ্রয় পেলে দুলাল অশ্রাব্য ভাষায় কেচ্ছা শুরু করে দেবে। তাছাড়া ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলে অনন্ত একটা পয়সাও বার করবে না, দোরগোড়া থেকেই ভাগিয়ে দেবে। আংটিটা বাঁধা দিয়ে তিরিশ টাকা পাওয়া যাবে কি না অসীমের সন্দেহ আছে! এক আনা সোনাও বোধহয় নেই। দুলালের সঙ্গ এড়াবার জন্য সে এগিয়ে গেল সত্যচরণের দিকে। সত্য কী বলছিল কালীর মাকে, চুপ করে গেল।
”অনন্ত জ্যাঠাকে কী করে ডাকি বলুন তো?”
”ও মা, সে তো এই খানিক আগে বেরোল। মিষ্টির দোকানে গেছে, এখুনি ফিরবে। ওর মেয়েকে আজ যে পাত্র নিজে দেখতে আসছে। আইরিটোলার শীলেদের বাড়ির ছেলে।”
অসীম আর দাঁড়ানোর দরকার বোধ করল না। মোড়টা ঘোরার সময় মনে হল তিরিশের-একের বসবার ঘরের জানলার খয়েরি পর্দা সরিয়ে কেউ মাথা হেলিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। আভা কি না দেখার জন্য সে কৌতূহলী হয়ে উঠল। কাছাকাছি হতেই খুব অবাক হয়ে দেখল শোভা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
অসীম একটু দূরে সরে যেতেই সত্যচরণ থেমে যাওয়া কথাটার খেই ধরল।
”আমি কি আর তোমায় ছাড়িয়েছি গো। তোমার বউদিকে তো চেনই কেমন মানুষ।”
”আপনিও কেমন মানুষ তা আমার জানা আছে। একজোড়া বালা মেয়েকে গড়িয়ে দেবেন বলে তো আজ পাঁচ বচ্ছর ধরে ঘোরাচ্ছেন।”
”ওমা, এইতো গত বছর সবে বললুম, আর বলছ পাঁচ বছর।”
কথা না বলে কালীর মা পাম্প করতে থাকল। সত্যচরণ প্রবল আগ্রহে প্রতিটি ঝাঁকির সঙ্গে ওর সারা শরীরের দুলুনি লক্ষ করায় তৎপর হল। তার মনে হল, আঙুরবালা আর অতটা আঁটো-সাটো নেই। একজোড়া বালা, চোদ্দো ক্যারট হলেও কম করে গোটা হাজার টাকা খসবে। অত টাকা এখন আঙুরের উপর ইনভেস্ট করা উচিত হবে না বলেই তার মনে হচ্ছে। চারুশীলা যদি ওকে তাড়াবার উদ্দেশ্যে চুক্তি ভঙ্গ করে, বাসনের সঙ্গে দুটোর জায়গায় তিনটে পোড়া বার করে না দিত, তাহলে বালা গড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিটা হঠাৎ মুখ ফস্কে কি বেরিয়ে যেত? তবুও আঙুর কাজ ছেড়ে দিল। দেখে দেখে চিমড়েপোড়া এক বুড়িকে চারুশীলা কাজে লাগিয়েছে। এর আগে তিনজনকে তাড়িয়েছে, একই ছুতোয়। ঝিগুলো আসে হতকুচ্ছিত রোগাপটকা চেহারা নিয়ে, তারপর চারুশীলার নজরে, কেমন যেন পরিপাটি হয়ে যায়, ঢলানি-ঢলানি ভাব ধরা পড়ে, আর সত্যচরণও যেন উঠোনের জানলার ধারে বসে বড়ো বেশিক্ষণ সময় নেয় দাড়ি কামাতে। এই নিয়ে রাতে বহুবার তুলকালাম হয়ে গেছে ওদের। আঙুরের চতুর্থ মেয়েটির পাশে সত্যচরণের দুই মেয়ে ভুতি আর টুনুকে দাঁড় করিয়ে দিলে কার সাধ্য বলে ওরা তিন বোন নয়-এই কথাটি কে যেন একবার পাড়ায় চাউর করেছিল। সত্যচরণের দৃঢ় ধারণা কাজটা শেফালিরই। কেননা, একদিন শেফালিই বাড়ি বয়ে জানিয়ে গেছল, ”সত্যদার মতো লোকের চরিত্র নিয়ে কথা বলার সাহস পায়, বউদি, কী হয়েছে যে পাড়ার কী বলব।”
জলের বালতি হাতে ঝুলিয়ে কালীর মা মিষ্টি করে হেসে নিচু গলায় বলল, ”বড্ড ঠ্যাকায় পড়ে গেছি, পাঁচটা টাকা দিতে পারেন।”
”পাঁচ! এখুনি?” সত্যচরণ গামছার কসি আঁট করতে করতে হাসল। বাঁ হাতে ঘোমটাটা আর একটু টেনে দিতে দিতে কালীর মা ঘাড় নাড়ল।
