সাহেবটা খুব অবাক হয়ে গেল। তারপর মুচকি হেসে বলল, ”আপনার ছেলের খবর আমরা পেয়েছি, আমাদের ক্লাবের কোচ মারফত। তিনি জাপান যাচ্ছিলেন। কলকাতায় প্লেন বিগড়ে যাওয়ায় একদিন থাকতে বাধ্য হন। সেদিন মোহনবাগান মাঠে একটা খেলা দেখেন। সেই রাতেই ট্রাঙ্ককল করেন লিসবনে। বলেন, ইওসেবিওর থেকেও দারুণ একটা ছেলের খোঁজ পেয়েছি, এখনি ধরতে হবে। পরের প্লেনেই আমি কলকাতায় পৌঁছে পর পর অসীমের তিনটে খেলা দেখে তারপর আপনার কাছে এসেছি। আমরা ইওসেবিওকে রিপ্লেস করতে চাই। ক্লাব প্রেসিডেন্ট রওনা হওয়ার আগে বলে দিয়েছেন, যদি বোঝ কোচের কথা সত্যি, তাহলে সই করা সাদা চেক এগিয়ে দেবে।”
প্রভাতের হাতে চেকবই আর কলম দিয়ে পর্তুগিজ সাহেব হাসল। অন্যমনস্ক হয়ে প্রভাত একটা তিন আর শূন্য বসাল চেকের উপর। তারপর কী ভেবে বলল, ”লক্ষ টাকা দিলেও ওকে আমি খেলতে দেব না। ওর জীবনের দাম অনেক অনেক বেশি। পায়ে যদি চোট পায় তাহলে ও শেষ হয়ে যাবে।”
চেক বইটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রভাত উঠে দাঁড়াল, সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে।
”নো, নো, গেট আউট। আমি দেব না, লক্ষ লক্ষ টাকাতেও দেব না। গেট আউট, গেট আউট।”
ঘুম ভেঙে গেল অসীমের। এক্ষুনি উঠতে ইচ্ছে করল না তার। কাত হয়ে শুয়ে রইল। স্বপ্নটা দেখার জন্য তার লজ্জা করছে। অথচ চাপা এক ধরনের মমতায় ফেঁপে উঠছে তার বুকটা। চোখ বুজে সে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করল-”ওর জীবনের দাম অনেক অনেক বেশি।”
সারা শরীরের উপর কে যেন আদর বুলিয়ে যাচ্ছে। অসীম প্রবল সুখে আচ্ছন্ন হল। একবার সে হাসল আপনমনে। তিরিশের পাশে আরও চারটে শূন্য বাবা অনায়াসেই বসিয়ে দিতে পারত। তিন লক্ষ! গোটা জয়রাম মিত্র লেন কুড়িয়ে তিন লক্ষ টাকা বেরোবে না। শুনলে পাড়ার লোকগুলোর মুখ কেমন হয়ে উঠবে কিছুক্ষণ ধরে অসীম তাই ভাবল। ভাবতে ভাবতে আভার মুখটা ভেসে উঠল। তারপর পা থেকে মাথা পর্যন্ত! আর অসীমের দেহ থেকে আচ্ছন্ন সুখটা উবে যেতে শুরু করল।
আভার মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটবে না। হাসবে ভদ্রতা করে। হয়তো বলবে, ”তিন লাখ টাকা ফুটবল খেলে পাওয়া যায়, জানতাম না তো! ভালোই হল।” খুবই নিরাসক্ত গলায় বলবে। বি.এ. এম.এ. পাশ করার থেকে ফুটবল খেলা সোজা নয়-এটা ওদের কেউ বুঝবে না। কত খাটুনি কষ্ট সয়ে যে খেলা শিখতে হয় তা জানে না। শুধু বোঝে আর জানে চেয়ারে বসে খুচ খুচ করে লেখা, নাকের কাছে বই ধরে বিছানায় চিত হয়ে পড়ে থাকা, আর চিবিয়ে চিবিয়ে বড়ো বড়ো বাত ঝাড়া। একটা বাইশ-চব্বিশ বছরের মেয়ে অমন গম্ভীর, উদাসীন হয়ে থাকে কী করে? ওর কী কোনো প্রেমিক আছে?
অসীম বিরক্ত মনে উঠে পড়ে। ত্রিশ টাকা জোগাড় করে প্রভাত ফেরে কিনা দেখার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। প্রভাত অফিস থেকে ফিরে সকলের দিকে তাকিয়ে যখন মাথা নামিয়ে জামার বোতাম খুলতে শুরু করল অসীম তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারক কবিরাজ স্ট্রিটের মোড়ে এসে দাঁড়ায়। তারপর আসে ঝকঝকে আকাশি-নীল স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডটা।
ঠাকুরের চায়ের দোকানে রাজনীতির তর্ক চলেছে। ওরা কেউ তিরিশ টাকা এক্ষুনি দিতে পারবে না। অসীম একধারে চুপ করে বসে। লোকটা চলে গেলেই ছোটোভাই এসে খবর দেবে। আধঘণ্টা কেটে গেল এখনও আসছে না। তাহলে কি কিছু ঘটছে বাড়িতে?
লোকটা কী চিৎকার করে লোক জমিয়েছে? নাকি গুম হয়ে বাইরের রকে বসে আছে অসীমের অপেক্ষায়। সত্যিই দেখে যাবে পায়ে চোট হয়েছে কিনা। কিন্তু হাড়ভাঙা নয়, কাটাকুটি নয় যে প্লাস্টার কী ব্যান্ডেজ করা থাকবে। অসীম ডান হাঁটুতে হাত বোলাল। উপর থেকে দেখে কিছুই বোঝা যাবে না। মাথাধরা পেট কামড়ানো কী দেখে বোঝা যায়? ব্যথা রয়েছে, ডান পায়ে ভর পড়লেই যন্ত্রণা হচ্ছে এটা কী করে বোঝাবে।
লোকটা কি অপমান করছে বাবাকে? সকালে জোর গলায় প্রভাত বলেছে, ভারি তো তিরিশ টাকা! লোকটা হয়তো এখন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কথা দিয়ে কাটছে আর নুন ছিটোচ্ছে প্রভাতের গায়ে। পাড়ার খচ্চচর লোকগুলো মুচকি হাসছে। এই দৃশ্য বারবার ভেসে উঠতে লাগল অসীমের চোখে। ছটফট করে সে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। ব্যাটাকে পুঁতে ফেলব যদি বাবাকে অপমান করে। যদি একটু বেইজ্জতি কথা বলে থাকে তাহলে জান নিয়ে ফিরতে দেব না।
অসীম দ্রুত বাড়ির দিকে চলল। পায়ের ব্যথাটা এখন লাগছে না। তারক কবিরাজ স্ট্রিট থেকে পাড়ার মধ্যে ঢুকতেই দেখল ছোটোভাইটা ছুটে আসছে। ওর আসা দেখে ঠান্ডা হয়ে গেল অসীমের সর্বাঙ্গ।
”লোকটা বসে আছে দাদা।”
”চেঁচায়নি?”
”না। একবার ভেউভেউ করে কাঁদল। বলছে, এখনও প্লেয়ার জোগাড় হল না, শিল্ডটা বোধহয় হাতছাড়া হয়ে গেল। একজনের কাছে গেছল, সে পঞ্চাশ টাকা চেয়েছে। বাবার পায়ে ধরে বলল, হয় অসীমকে দিন নয়তো টাকাটা এক্ষুনি দিন।”
”বাবা কী বলল?”
”চুপ করে বসে আছে। দিদি চুপিচুপি এইটে দিল তোমায় দেবার জন্য।”
পকেট থেকে একটা আংটি বার করে অসীমের দিকে এগিয়ে ধরল।
”অনন্ত সিংগীর কাছে এটা বাঁধা দিয়ে তিরিশটা টাকা নিয়ে আসতে বলল দিদি।”
আংটিটা হাতে নিয়ে অসীম ইতস্তত করে বলল, ”আচ্ছা যা।”
কোনোদিন নিলির আঙুলে এটা সে দেখেনি। অসীম অবাক হয়ে গেল। দেখতে ঝকঝকে, তার মানে ব্যবহার হয়নি, তোলা ছিল। ওর কাছে এটা এল কী করে? বাবা-মা দেয়নি, দেওয়ার ক্ষমতাই নেই। নিলির হাতে দু’গাছা ফিনফিনে সোনার চুড়ি ছিল, গত বছরই অনন্তের সিন্দুকে উঠেছে। তাহলে এটা পেল কার কাছ থেকে? প্রেম ট্রেম করছে নাকি!
