অসীমের বাবা প্রভাত রায় ত্রিশ বছর আগে রোভারস কাপেও খেলেছে। আটাশ বছর আগে আই.এফ.এ শিল্ডের ফার্স্ট রাউন্ডের খেলায় গোড়ালিতে চোট পেয়ে জখম হয়। ফোর্থ রাউন্ডে ক্লাব-কর্তারা জোর করে নামায়, ইঞ্জেকসন দিয়ে ব্যথা অসাড় করে। সে খেলায় ওরা হেরে যায় এবং সমর্থকদের ধারণা প্রভাতের জন্যই। খেলা শেষে বাড়ি ফেরার সময় ময়দানের অন্ধকারে টেনে নিয়ে কারা ওকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে যায়। সেদিন থেকে প্রভাত রায় আর ফুটবলে পা দেয়নি। সেদিন অজ্ঞান হবার আগে ওর কানে শুধু এই কথা কটি ঢুকেছিল-”ঘুষ নিয়ে বড়োলোক হবি শালা? হওয়াচ্ছি। ক্লাব কি টাকা দেয় না তোকে? তবুও অত লকলকে নোলা কেনরে বেইমান, নেমকহারাম। ঘুষ নিয়ে আমাদের ইজ্জত ডোবানো বার করছি।”
”ইজ্জত”! অসীম বুনো মোষের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ”টাকা নেবার সময় মনে ছিল না ইজ্জতের কথা। এই পা নিয়ে আমি হাঁটতে পর্যন্ত পারছি না, আর খেলে এসে তোমার ইজ্জত বাঁচাব? কে বলেছিল হাত পেতে টাকা নিতে? কে, কে, কে, বলেছিল? আমার পা কি পা নয়? আমার জীবনটা কি আমার নয়? সব দান করে যেতে হবে তোমাদের খাওয়াবার জন্য?”
চিৎকার করতে করতে অসীম পায়চারি করে। মা, বাবা, ভাই, বোন আর ঠাকুমা মাথা নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে। ভাত খাওয়া এঁটো থালাগুলো বাইরে দালানে পড়ে, চেটেপুটে খেয়েছে ভাইগুলো।
”যেখান থেকে পারো, জোগাড় করে দিয়ে দাও। কাল এলেই দিয়ে দেবে। ইজ্জত আমারও আছে।”
”কোথায় পাব ত্রিশ টাকা, কালকের মধ্যেই।” প্রভাত করুণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকায়।
”কোথায় পাবে তার আমি কি জানি? এ সংসার কি আমি তৈরি করেছি?”
”তুই বড়োছেলে, তোরও তো খানিকটা দায়িত্ব নেওয়া উচিত। বড়োতো হয়েছিস।” ঠাকুমা ভয়ে ভয়ে বলল।
”তুমি চুপ করো তো। আমি কি টাকা দিই না? আমার নিজের জন্য কি কিছুই খরচ করব না? এই পা দুটো আমার ভবিষ্যৎ, আমার জীবন। এর একটা শেষ হয়ে গেলে আমি কোথায় দাঁড়াব? কে তখন আমায় দেখবে? পয়সার জন্য চোটটা সারাতে পারছি না। চোট আছে জানলে কেউ আর পয়সা দিয়ে ডাকবে না। তাই জানাতেও পারি না।”
বলতে বলতে অসীম থেমে গেল! গলা আটকে গেছে অবরুদ্ধ বাষ্পে। প্রভাতের দিকে ঘরের সবাই তাকাল। পুরু কাচের চশমাটা খুলে প্রভাত গেঞ্জি তুলে মুছতে লাগল ঘাড় হেঁট করে।
”দেখি, অফিসে কারুর কাছে ধার পাই কি না। এই বাজারে একসঙ্গে তিরিশ টাকা পাওয়া-” প্রভাতের গলা ক্ষীণ হয়ে থেমে গেল।
ঘুম থেকে উঠেই অসীম আজ বেরিয়ে পড়ে। পাওয়া সম্ভব এমন লোকেদের কাছে চেষ্টা করে টাকা ধার পেল না। তারপর বেলা বারোটা পর্যন্ত ঠাকুরের চায়ের দোকানে কাটিয়ে বাড়ি ফেরে।
গুণোদার পাঠানো সেই লোকটা এসেছিল। ছোটোবোন নিলি অসীমকে আড়ালে ডেকে বলল, ”বাবাকে যাচ্ছেতাই করে বলে গেল লোকটা। বলল, কালকেই ম্যাচ খেলা আর এখন বলছে যেতে পারবে না, পায়ে চোট! সব বাজে কথা।”
”বাবা বলেছিল পায়ে চোট থাকার কথা!” অসীম অবিশ্বাস ভরে তাকিয়ে রইল।
”বারে, লোকটা যে বলল, প্যাঁচ কষে টাকা বাড়াবার জন্য মিথ্যে করে এখন বলা হচ্ছে চাকরির ইন্টারভিউ আছে। বাবা তো প্রথমে তাই বলেছিল। লোকটা চিঠি দেখতে চায়। বাবা বলে অসীমের কাছে আছে। তখন ওইসব বলতে শুরু করে-বাবা শেষকালে বলল, পায়ে লেগেছে, বিশ্বাস না হয় রাতে এসে দেখে যাবেন। হাঁটতে পর্যন্ত কষ্ট হয়। তাইতে লোকটা বলে সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে, ইঞ্জেকশানের খরচ আমরাই দোব। তাইতে বাবা কী ভীষণ রেগে উঠল। বেরিয়ে যান এখুনি, আপনার ট্রফির থেকেও আমার ছেলের জীবন দামি। লক্ষ টাকা দিলেও ও খেলতে যাবে না। ভারি তো আপনার তিরিশটা টাকা, নিয়ে যাবেন রাতে এসে, এইসব বলে খুব চেঁচাতে থাকে।”
”লোকটা কী বলল?”
”টাকা নিতে আসবে আজ রাতে। অন্য প্লেয়ার জোগাড় করতে টাকাটা আজই দরকার। না পেলে কেলেঙ্কারি করবে বলে শাসিয়ে গেল।”
”হ্যাঁ, কেলেঙ্কারি করবে! শালাকে তাহলে আর জান নিয়ে ফিরতে হবে না।”
অসীম গা-ঝাড়া দিয়ে প্রসঙ্গটা বন্ধ করে দিল। কিন্তু ওর ভালো লেগেছে প্রভাতের কথাগুলো। ছেলেকে কোনোদিন খেলায় উৎসাহ দেয়নি বা বারণও করেনি। ফুটবলের কথা উঠলে কখনো মুখ খোলেনি। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করত অসীমের, বাবা কোনোদিন তার খেলা দেখেছে কিনা! জানতে পারেনি। প্রভাত তার সময়ে নাম-করা উঠতি প্লেয়ারদের একজন ছিল বলে, বুড়োরা যখন অসীমকে গল্প শোনায় তখন গর্ব হয় তার। প্রভাত রায়ের ছেলে বলে অনেক জায়গায় সে খাতিরও পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হল। একটা ভালো চাকরিও জোগাড় করতে পারেনি প্রভাত। পা খুইয়ে বিদায় নিল মাঠ থেকে। ক্লাবও আর খবর নিল না। এইরকমই হয়।
অসীম দুপুরে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্ন দেখল। পর্তুগালের বেনফিকা ক্লাব থেকে লোক এসেছে জয়রাম মিত্র লেনে। প্রভাতের সঙ্গে কথা বলছে লোকটা, হাতে চেক বই।
”আপনি টাকার ফিগারটা বসিয়ে নিন।”
প্রভাত দিশাহারা হয়ে আমতা-আমতা শুরু করেছে দেখে লোকটা ব্যস্ত হয়ে বলল, ”ইওসেবিওকে যত টাকা দিয়ে আমরা এনেছিলাম, তার থেকে বেশি দিতেও আমরা রাজি।”
”কিন্তু আমার ছেলেকে আপনারা নেবেন কেন?”
”তার মানে?”
