”এখনও ছেলেমানুষ। বুঝবে ঠিকই, ফিরেও আসবে।” রাধারানি আলতো করে হাত রাখল বাসুদেবের বুকে।
”চলো, দাঁড়িয়ে লাভ নেই।”
”ও এলে তুমি কিছু বলো না। যা বলার আমি বলব। ওকে আমি মারব, ভীষণ মারব, এমন মারব যে জীবনেও ভুলতে পারবে না।” বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল রাধারানি। বাসুদেব ওকে টেনে নিয়ে গেল ঘরে।
অফিস স্পোর্টসে বাসুদেব চারজনের পর হাঁটা শেষ করল। প্রথম তিনজন প্রাইজ নিল জেনারেল ম্যানেজারের হাত থেকে। প্রাইজ দেবার সময় জি.এম. হেসে দু-চারটে রসিকতা করে। কেষ্ট দত্ত একটা ইলেকট্রিক ইস্ত্রি হাতে ডগমগ হয়ে বলল, ”কী বলল শোন, আমি নাকি তিরিশ বছর বয়স ভাঁড়িয়ে রেসে নেমেছি। কালই সার্ভিস রেকর্ড খুলে বয়স চেক করবে।”
টেবল ল্যাম্পটা ছেলের হাতে দিয়ে প্রমোদ বোস বলল, ”আর আমায় কী বলল জানিস, নিশ্চয় মিসেস বোস এখানে আছেন, নয়তো এমন ইনসপায়ারড ফিনিশিং সম্ভব হত না।” ফুলদানিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে রামরাজ বলল, ”এটা নিয়ে হামি কী কোরব। কৌন কামে লাগবে হামার।”
অদ্ভুত একটা শূন্যতা বোধ নিয়ে ফিরছিল বাসুদেব। পাড়ায় ঢুকেই দূর থেকে দেখল অনন্ত সিংহের বাড়ির দরজায় একটা নীল মোটর দাঁড়িয়ে। ওর মেয়েকে আজ দেখতে আসবে, বোধহয় গাড়িটা তাদেরই। পুতুলের থেকে সুমি দু-তিন বছরের বড়ো। সুমির বিয়ে দেবার কথা এক-আধবার মনে এসেছিল, কিন্তু অন্যান্য চিন্তায় তলিয়ে যায়। এখন আর মনে করার দরকার হবে না।
অনন্ত মোটরের বাম্পারে পা তুলে দিল। বাসুদেব বুঝল, সেটা তাকে দেখেই। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার কায়দাটা যে অহঙ্কার বোঝাবার জন্য সেটাও বুঝল সে। মাথার মধ্যেটা গরম হয়ে উঠল বাসুদেবের। আজকাল বাড়িতে পা দিয়েই সে জিজ্ঞাসা করে,-”প্রমি কোথায়?” ষোলোয় পড়েছে। এখন থেকে আর চোখের আড়াল করা নয়।
”কোথায় গেছে?” বাসুদেব চিৎকার করে উঠল।
”আমায় বলেই গেছে?” রাধারানি রান্নাঘর থেকে ছুটে এল। ”কে এক সিনেমার হিরো এসেছে বুঝি তিনের-বি বাড়িতে, দেখতে গেছে।”
”কার সঙ্গে গেছে?”
”একাই গেছে।”
‘শিগগিরি ডেকে পাঠাও, সিনেমার হিরো দেখে আর কাজ নেই।’
এই বলে বাসুদেব দ্রুত ঘরে ঢুকল; অফিস থেকে ফিরেই আর একবার পায়খানা যাওয়া তার অভ্যাস। অভ্যাসটি পালন করতে গিয়ে টের পেল প্যানের মধ্যে কিছু একটা পড়ে রয়েছে, যার ফলে গর্তটা বোজা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এসে চিৎকার করল, ”জেনেশুনেও কি তোমরা চুপ করে মজা দেখছিলে? যখন ঢুকলুম তখন বলতে পারতে তো, বল পড়েছে। বাঁ হাত দিয়ে তুলে নিতুম। এখন তুলি কী করে?”
এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুত্রদ্বয়কে বেধড়ক কয়েক ঘা দিল বাসুদেব। ”পড়াশুনো নেই, দিনরাত শুধু খেলা আর খেলা। এখন এই বল তুলবে কে?”
”একটা ধাঙড় ডেকে আনলেই তো হয়।” রাধারানি বুদ্ধি করে বলল। অবশ্যই ভয়ে ভয়ে।
”সন্ধের পর ধাঙড় বসে আছে বল তোলার জন্য।” বাসুদেব রাগে গজগজ করে কয়েক বালতি জল ঢেলে বাঁ হাতে বলটা তুলল।
বল আর বেড়ালে কোনো তফাত নেই। যেখানেই ছেড়ে এসো না ঠিক ফিরে আসবে। দূরে গিয়ে ফেলে আসতে হবে নয়তো ছেলে দুটো এই বল নিয়ে আবার খেলা শুরু করে দেবে। তারক কবিরাজ স্ট্রিটে যে ডাস্টবিনটা আছে তার মধ্যে ফেলার উদ্দেশ্যে বেরোতে গিয়ে বাসুদেব সদরেই থমকে গেল। নীল ঝকঝকে মোটরে পা তুলে দাঁড়ানো অনন্তের ধোঁয়া ছাড়ার অহঙ্কারি ভঙ্গিটি মনে পড়ল তার। আবার তাকে দেখলে আবার পা তুলবে, আবার ধোঁয়া ছেড়ে মিটমিট করে তাকিয়ে হাসবে।
হাসাচ্ছি তোকে! বাসুদেব তরতরিয়ে ছাদে উঠে এল। যেদিকে দু চোখ যায় ছুঁড়ে দেবে! এধার-ওধার তাকিয়ে কোনদিকে ছুঁড়বে ঠিক করে উঠতে পারল না সে। বলটা ছাদের মেঝেয় রাখল। নর্দমার ঢালু দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে পা দিয়ে আটকাল। পা তুলতেই বলটা আবার গড়িয়ে যাচ্ছে। পায়ের চেটো দিয়ে বাসুদেব বলটাকে টানল। বলটা পিছিয়ে পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে আবার গড়িয়ে এল।
বাসুদেবের মন্দ লাগল না ব্যাপারটা। আস্তে সট করল বলটায়। পাঁচিলে লেগে আবার তার কাছেই ফিরে এল। অন্ধকার ছাদে ভালো করে নজর করা যাচ্ছে না, তবু বাসুদেব আন্দাজে ব্যাপারটা চালিয়ে যাওয়ার একটা মজা পেয়ে গেল। এখন তার মনে হচ্ছে চল্লিশ বছর আগের বয়সে যেন ফিরে যাচ্ছে সে।
সাত
অসীম কাল রাতে বাড়ি ফিরেই শোনে, গুণোদা একজনকে পাঠিয়েছিল। বসিরহাটে সেমিফাইনাল খেলতে হবে। গুণোদার পেশা বিভিন্ন ক্লাবে খেলোয়াড় কম পড়লে জোগাড় করে দেওয়া। এজন্য কমিশন পায়। মফসসল ক্লাব-কর্মকর্তাদের ভিড় লেগেই আছে ওর বাড়িতে। ট্রফি পাইয়ে দেবার কনট্রাক্টও গুণোদা নেয়। ওর তালিকায় জনা তিরিশ খেলোয়াড়ের নাম আছে, যাদের অর্ধেকই কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশনে খেলে। তাদের অনেকে ভারতের জার্সিও পরেছে। নাম অনুযায়ী গুণোদা ওদের দাম দেয়। গুণোদার অনুগ্রহে কেউ কেউ বছরে পাঁচ হাজার টাকাও সংগ্রহ করে। ওর তালিকায় অসীমও আছে। দূর গ্রামাঞ্চলে, অখ্যাত টুর্নামেন্টে খেলতে ‘নামীরা’ যেতে চায় না। তখন অসীমের ডাক পড়ে।
কাল গুণোদার লোকটি অসীমের জন্য বাড়িতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে। বারকয়েক রাস্তায় বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে প্রভাতের হাতে অগ্রিম বাবদ তিরিশ টাকা দিয়ে, পরদিন সন্ধ্যায় আসবে জানিয়ে চলে গেছে। টাকা পাওয়া মাত্র তাই থেকে কুড়ি টাকা তখনি খরচ হয়ে যায়। বহুদিন পর রাত্রে ওদের উনুনে রুটি সেঁকার বদলে ভাতের হাঁড়ি চড়ে।
