”খোঁজ নেবে না?” রাধারানি ব্যাকুল স্বরে বলেছিল।
”কোথায়!” দিশাহারা বাসুদেব জানতে চেয়েছিল।
”সুমির স্কুলের বন্ধুরা হয়তো বলতে পারে।”
”খোঁজ নেব কেন, ফিরিয়ে আনবার জন্য?”
”তাহলে অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেওয়া যায়। এখন লোকের কাছে বলব কী?”
”কী আবার বলবে, মেয়ে যা বলে গেছে তাই বলবে-মরে গেছে গঙ্গায়। চান করতে গিয়ে ডুবে মরেছে, ওলাওঠায় মরেছে। করো কি সারাদিন শুধু রান্নাঘরে বসে ঘুটুর ঘুটুর করা ছাড়া? নজর রাখতে পারোনি, মেয়ে বিগড়োচ্ছে বুঝতে পারোনি?”
বাসুদেব চাপা গলায় চিৎকার করেছিল। রাধারানির চোখ দিয়ে টপটপ জল পড়ছে। পাশের ঘরে ছেলেমেয়েরা না শোনার ভান করে কাঠ হয়ে বসে।
”বংশের মান গেল, কলঙ্ক লেপে দিয়ে গেল সকলের মুখে। ছি ছি, শেষে কিনা বেরিয়ে গেল! দুদিন পরে তো মেয়েটাকে ফেলে পালাবে। তারপর গিয়ে উঠতে হবে সোনাগাছিতে। যাক, ওই ওর কপালে আছে। ফল ওকে ভুগতেই হবে। শুধু এতবড়ো বনেদি বংশের মাথাটা হেঁট করে দিয়ে গেল। মুখ দেখাব কী করে পাড়ায়, আত্মীয়দের কাছে।”
”যদি ও ফিরে আসে-”
”তাহলে পিঠের চামড়া তুলে নেব। তুমি, তুমি, তোমার জন্যই ছেলেমেয়ে একটাও মানুষ হল না।” বাসুদেব দুহাতে মাথা চেপে ধরে ঘরে দ্রুত পায়চারি করে। ”শুধু দু’বেলা ভাত রাঁধা আর ছেলেপুলের জন্মো দেওয়া ছাড়া আর কী পারো তুমি? একা রাস্তায় বেরোতে পারো না, লোকের সঙ্গে দুটো কথা বলতে পারো না, পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে জানো না, একটা বই কোনোদিন পড়তে দেখলুম না। এমন মায়ের মেয়ে বেরোবে না তো কী? সব কটা বেরিয়ে যাবে, আমি লিখে দিচ্ছি, একটাও মানুষ হবে না।”
চোখের জল ফেলতে ফেলতে রাধারানি ঘর থেকে বেরিয়ে ঢোকে রান্নাঘরে। অফিস ফেরত স্বামীকে এখনও খাবার দেওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ পায়চারি করে বাসুদেব পাশের ঘরে এসে ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলে-”সবই জেনেছ তোমরা। তোমাদের বোন যে কলঙ্ক দিয়ে গেল তা যেন বাইরে না বেরোয়। তোমাদের মেজোপিসিমা থাকে এলাহাবাদে, কেউ সুমির কথা জিগ্যেস করলে বলবে এলাহাবাদ গেছে, মেজোপিসির খুব অসুখ। দেখাশোনার জন্য নিয়ে গেছে, কবে ফিরবে ঠিক নেই। মনে থাকবে তো?”
সবাই হাঁপ ছেড়ে ঘাড় নেড়েছিল।
এই কদিনে বাসুদেব যতটা ফিজিক্যাল ফিটনেস অর্জন করেছিল, সুমি তা ধসিয়ে দিয়ে গেছে। রাত্রে ঘুমোতে পারে না, দাড়ি কামাতে ভুলে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, পরিচিতদের এড়িয়ে যাচ্ছে অফিসে এবং পাড়ায়, পিঠ নুয়ে পড়েছে, চোখে বিষাদ ফুটে উঠেছে। সুমির থেকেও তার ভাবনা, বংশের মান-মর্যাদা নিয়ে। জানাজানি হয়ে গেলে কী হবে? ছেলেমেয়েরা অবশ্য যথাযথভাবেই রটিয়ে দিয়েছে শেখানো কথাটা।
শেফালি একদিন এসে জেরা করে গেছে রাধারানিকে। ”কই, আগে তো কখনো মেজোপিসির বাড়ি থেকে খোঁজখবর করেছে বলে শুনিনি। যাক, তবু এলাহাবাদটা দেখা হয়ে যাবে এই তলে। ফিরবে কবে গা?”
রাধারানি নেহাতই ভালো মানুষ। বেশিক্ষণ মিথ্যা কথা বলে যেতে পারে না। তবু প্রাণপণে বুদ্ধি খরচ করে বলল, ”ফেরার কি কিছু ঠিক আছে। অসুখ না সারা পর্যন্ত থাকবে, আর কবে যে সারবে কে জানে।”
”তদ্দিন স্কুল কামাই হবে তো?”
”তা হবে।”
”ভালোই হয়েছে। স্কুল যাবার পথে বখাটে একটা ছেলে বড্ড ওর পিছু লাগত। চিঠিফিটিও দিত। আর দেখছই তো আজকাল ছেলেমেয়েরা কিনা কাণ্ড করছে। এইভাবেই রাস্তাঘাটে ভাব-সাব হয়, তারপর একদিন বাড়ি থেকে পালায়। আর বাপ-মা তার ঠ্যালা সামলাতে নাকানি-চোবানি খায়। তবে একটা উপকার বাপু করে দেয়, বিয়ে দিতে যে খরচটা হত সেটা বেঁচে যায়। বলো, ঠিক কিনা?”
রাধারানি কোনোমতে ঘাড় নাড়ে আর শুধুই তার মনে হয়, শেফালির কথাগুলো যেন কেমন বাঁকা ধরনের। রাত্রে চুপি-চুপি বাসুদেবকে বলা মাত্র, বাসু উঠে বসে বিছানায়।
”সর্বনাশ হবে, আমি জানি হবেই। ধুলোয় লুটোবে ধর-বাড়ির মান-মর্যাদা। তোমার জন্য, সব তোমার জন্য।” বলতে বলতে বাসুদেব কাটা তালগাছের মতো লুটিয়ে পড়ে।
রাধারানি স্তব্ধ হয়ে বসে ভাবে, তার কী দোষ। কেন সবকিছুর জন্য সেই দায়ী। গভীর রাতে তার মনে হয় সুমি চুপিসারে ফিরছে। রাস্তার ইলেকট্রিক আলোয় তাকে দেখা যাবে, এই ভয়ে সে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ময়রা গলিতে। রাধারানির ইচ্ছে হয়, বেরিয়ে গিয়ে সব রাস্তার আলো নিভিয়ে পাড়াটা অন্ধকার করে দেয়।
এক এক রাত্রে সে সদর দরজার খিল খুলে একটা পাল্লা সামান্য ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকে। সুমি আসছে দেখলেই ছুটে গিয়ে আঁচল দিয়ে ওকে ঢেকে ঘরে নিয়ে আসবে। মেয়েটা লজ্জায় আসতে পারছে না, নইলে সুমি তেমন মেয়ে নয় যে বাপ-মাকে কষ্ট দিয়ে বেশিদিন দূরে থাকতে পারবে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস সুমি ফিরে আসবেই, শুধু এত আলোর মধ্যে দিয়ে আসতে হবে বলে লজ্জায় পারছে না।
এক রাতে বাসুদেব নিঃশব্দে উঠে এসে, সদরে দাঁড়ানো রাধারানির কাঁধে হাত রাখল। চমকে উঠে সিঁটিয়ে গেল সে। বোধহয় যাচ্ছেতাই করে এইবার কিছু বলবে।
”ওকি আর ফিরবে।” বাসুদেব ক্লান্ত স্বরে বলল। রাধারানি কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না।
”এমন কাজ করার কী যে দরকার ছিল ওর।” বিষণ্ণ সুর ছড়িয়ে পড়ল অন্ধকারে। ”কতই বা বয়স, জীবনের কী-ই-বা দেখল, জানলো। ও কি ভেবেছিল, বাবা বিয়ে দিতে পারবে না? গরিব হয়ে গেছি বটে, কিন্তু কোনোদিন কারুর কাছে তো হাত পাতিনি। যেভাবেই হোক, বাইশ বছর ধরে সংসার তো চালিয়ে আসছি। এত কষ্ট করি সকলের জন্য, কিন্তু আমার মুখ চাইল না।”
