বাসুদেব অবাক হয়ে বলে, ”শচীনদা, আপনি ফিজিক্যালি আনফিট! তাহলে আমরা কী হব?”
শচীন মাথা নামিয়ে যোগ-বিয়োগের হিসেবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাসুও মনে মনে হিসেব কষে নেয়, তার রিটায়ার করতে আর ক’ বছর বাকি। এখনও এগারো বছর। ছোটোছেলেটার বয়স হবে তখন চোদ্দো, ছোটোমেয়ের এগারো। তারপর ওদের লেখাপড়া বা বিয়ে দেওয়ার কী হবে? প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্র্যাচুইটির টাকা ফুঁকে দিলে বুড়ো বয়সে স্বামী-স্ত্রী খাব কী?
মোট চার মেয়ে ও দুই ছেলের হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত তার রেহাই নেই। তাছাড়া সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। প্রদীপ নামে অ্যাকাউন্টসের ছোকরাটা কদিন আগে ক্যান্টিনে চেঁচিয়ে বলছিল, ভ্যাসেকটমি করিয়ে এসেছে, যে ভয় করেছিল তা হয়নি, বউ খুব হ্যাপি। কিছু অসুবিধে হচ্ছে না। ওর দুটিমাত্র ছেলে।
বাসুদেব এরপর ফিজিক্যাল ফিটনেস ও ভ্যাসেকটমি, এই দুই জাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে শুরু করে। কখনো সে রেগে ওঠে নিজের উপর এই ভেবে যে, সাতটি সন্তানের পিতা কেন হতে গেল। কেন রাধারানি নামে একটা অশিক্ষিত মাংসের বস্তা তার বউ হল। আবার ভয়ে সিঁটিয়ে যায় জেনারেল ম্যানেজারকে দেখলে। এই বুঝি ফিজিক্যালি আনফিটরূপে তার নামের পাশে ঢ্যাঁড়া দিয়ে রাখল। এগারো বছর পর সেই ঢ্যাঁড়া দেখে নিশ্চয় মাথা নেড়ে বলবে-সরি, নো এক্সটেনশন।
বাসুদেব রাতে ঘুমোতে পারে না। রাধারানি গায়ে হাত রাখলে, দাঁত কিড়মিড় করে খাট থেকে নেমে মেঝেয় মাদুর পেতে শোয়। ফিজিক্যাল ফিটনেসের প্রমাণ দিতে হাঁটার চলন বদলে ফেলল। একজোড়া ট্রাউজারস কিনেছে তিনশো টাকায়, জুতো দু’শো টাকায়। কলপ লাগাচ্ছে কানের উপরের চুলে। দাড়িও কামাচ্ছে রোজ।
ওকে দেখে অফিসের অনেকেই ঠাট্টা করল। অল্পবয়সিরা বলল, ”দাদার কি দ্বিতীয় পক্ষ নেবার ইচ্ছে হয়েছে?” তবে সমবয়সি দু-একজন ঈর্ষাতুর গলায় যখন বলল, ”ইয়ং-ইয়ং লাগছে হে বাসু, ব্যাপার কী?” খুশিতে খান খান হয়ে গেছল বাসুদেবের ভিতরটা। কিন্তু এরা বললেই তো আর নিরাপদ বোধ করা যায় না। আসল লোকটির বলা চাই।
অফিসের একতলাটা রাস্তা থেকে বেশ উঁচু। আটধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। জেনারেল ম্যানেজার আসে ঠিক দশটায়। মোটর থেকে নেমে সিঁড়ি ভেঙে উঠেই লিফটে ঢুকে পড়ে। কোনোদিকে তাকায় না। বাসুদেব পৌনে দশটা থেকে উলটো ফুটপাতে অপেক্ষা করে। জি.এম. মোটর থেকে নামছে দেখলেই রাস্তা পার হয়। তারপর ওর সামনে দুই লাফে আটধাপ সিঁড়ি টপকে উঠে যায়। পরপর তিনদিন করেছে। চতুর্থ দিন নতুন জুতোর জন্য পিছলে মুখ থুবড়ে পড়ল। জি.এম.-ই ওকে টেনে তুলে বেশ সহানুভূতির সঙ্গেই বলল, ”সাবধানে উঠুন, এই বয়সে হাত-পা ভাঙলে আর সারবে না।”
ভয়ে কুঁকড়ে গেল বাসুদেব। ‘এই বয়সে’ বলতে কী বোঝায়? শারীরিক অক্ষমতা? ফিজিক্যালি আনফিট? পরদিনই আঁশবটি দিয়ে জুতোর তলা ঘষে খরখরে করে নেয় এবং জি.এম. যাতে ব্যাপারটা ভুলে যেতে পারে সেজন্য ওর চলাফেরার পথের ত্রিসামানাও বাসু আর মাড়ায় না।
এর কিছুদিন পরই অফিসের স্পোর্টসের তারিখ নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয়। দড়ি টানাটানি, ক্রিকেট বল ছোঁড়া, ফুটবলে লাথি মারা-এইসব বিষয়গুলোর উপর চোখ বোলাতে-বোলাতে বাসুদেব পাশের লোককে জিজ্ঞাসা করেছিল, ”প্রাইজ দেবে কে?” উত্তর পেয়েই মাথায় বুদ্ধি খেলতে শুরু করে। একটা থার্ড প্রাইজও জি.এম.-এর হাত থেকে যদি নেওয়া যায়, তাহলে সেটা এগারো বছর পরও কি কাজে লাগবে না!
স্পোর্টস সেক্রেটারির কাছে নাম দিতে হবে। বাসুদেব সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝল, দড়ি টানাটানিতে ডিপার্টমেন্টের টিম তৈরি হয়ে গেছে। টিমের কারুর ওজনই দু মণের কম নয়। বল ছোঁড়ায় বা লাথি মারায় ছোকরাদের সঙ্গে সে পারবে না। শুধু আধমাইল হাঁটার রেসে বয়স বেঁধে দেওয়া আছে-৪৫ ঊর্ধ্বে। বাসুদেব ঠিক করে, হাঁটায় নামবে।
তারপর থেকে সে রোজ ভোরে উঠে পার্কে চক্কর দেয়, ঘড়ি ধরে আধঘণ্টা। শরীরের প্রত্যেকটি গাঁট জং-ধরা কবজার মতো ক্যাঁচক্যাঁচ করে। প্রথম প্রথম হাঁপিয়ে পড়ত বাসুদেব জোরে পনেরো মিনিট হাঁটলেই। তারপর সয়ে গেছে। ওয়াকিং রেসে যারা নাম দিয়েছে, গোপনে তাদের লক্ষ করে দেখেছে। একমাত্র রামরাজ সাইকেল পিয়োন ছাড়া আর কারুর সম্পর্কে তার দুশ্চিন্তা নেই। ডেসপ্যাচের শৈলেন রায় এখনও ক্রিকেট খেলে বলে শোনা গেছে। কিন্তু ওর একটা পা ছোটো, খুঁড়িয়ে হাঁটে। বাসুদেব তাইতে উদ্বিগ্ন হচ্ছে না। বেয়ারা ভক্তিপদ-র বয়সটা স্টাফ সেকশান থেকে জেনে এসেছে-চুয়াল্লিশ বছর আটমাস এগারো দিন। ওকে ডিসকোয়ালিফাই করার প্রমাণ বাসুদেব সংগ্রহ করে রেখেছে।
দিন দিন মেজাজটা খোশ হয়ে আসছিল বাসুদেবের। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে শুনল, বড়োমেয়ে সুমি অর্থাৎ শর্মিলা বাড়ি থেকে পালিয়েছে। বয়স হয়েছিল আঠারো। দেখতে ছোটোখাটো, গত বছর পর্যন্ত ফ্রক পরে কাটিয়েছে, ক্লাস নাইনে পড়ে। বাসু শুনেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। স্কুল যাবার পথে ছেলেটার সঙ্গে নাকি ভাব হয়। মেজোমেয়ে প্রমীলা তাকে একবার মাত্র দেখেছে পাড়া দিয়ে হেঁটে যেতে। আর কেউ তাকে দেখেনি বা জানে না কোথায় থাকে। ব্যাপারটা এমনই কারুর কাছে খোঁজ নিতে যাওয়া মানেই কেলেঙ্কারিটা ছড়িয়ে দেওয়া। সুমি দু’লাইনের চিঠি রেখে গেছে-”আর ফিরব না, সুতরাং খোঁজ কোরো না। মনে কোরো আমি মরে গেছি।”
