দূরে কী যেন হয়েছে। মানুষ ছুটে ছুটে জড়ো হচ্ছে রাস্তার মধ্যে। একটা ডবল-ডেকার বাস দাঁড়িয়ে। অশোক সময় কাটাবার রগরগে একটা উপলক্ষ্য পেয়ে আশ্বস্ত হল এবং জোরে হেঁটে ভিড়ের কাছে পৌঁছল। যা প্রথমে ভেবেছিল, তাই-ই ঘটেছে। একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, ”কী করে চাপা পড়ল?”
”যা করে পড়ে। চলন্ত বাসে উঠতে গিয়ে!”
”একদম শেষ হয়ে গেছে কি?”
”সঙ্গে সঙ্গে।”
অশোকের ইচ্ছা হল চটকানো মাংস আর রক্ত একটুখানি দেখে। ভিড় ঠেলে গোড়ালিতে ভর দিয়ে উঁকি দিল।
একি! থরথর করে কেঁপে উঠল সে। কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাগটা পুলিশের জিম্মায় দেখেই চিনতে পারল। ভয় তাকে কোণঠাসা করে ফুটপাতের কিনারে হাজির করল। কাঁপুনি থামেনি। এখন কী করবে? ছুটে কোথাও পালাতে ইচ্ছে করল তার। যে চাপা পড়েছে আমি তার বন্ধুস্থানীয় বা পরিচিত বললে অনেক দায়িত্ব ঘাড়ে এসে যাবে। হাসপাতাল-পুলিশ-মর্গ-শ্মশান এত ঝঞ্ঝাটে জড়াতে হবে। অশোক বিরক্ত বোধ করল সুকুমারের উপর। এভাবে তার উপর পাষাণ ভার চাপিয়ে দেবে, আট বছর পর, অযথা অকারণে, বুঝলে সে গঙ্গার ধারে গিয়ে সূর্যাস্তই দেখত। রক্ত মাখা নাড়িভুঁড়ি দেখতে আসত না। তবু কিছু একটা করা দরকার।
একটি লোককে দেখে অশোকের মনে হল অনেকগুলি সন্তানের পিতা, স্বল্প আয় কিন্তু টাকা জমায়। ওর কাছেই বুদ্ধি নেওয়া যাক এই ভেবে সে জিজ্ঞাসা করল, ”সঙ্গে কেউ নেই লোকটার?”
”থাকলে তো দেখতেই পাওয়া যাবে।”
”তা বটে, তবে থেকেই বা কী করত, করার মতো কিছু তো আর নেই এখন।”
”তবু বাড়িতে খবরটা তাড়াতাড়ি পৌঁছত।”
”ঠিকানা কী?”
”কী জানি, পকেটে নিশ্চয় মানিব্যাগ-ট্যাগের মধ্যে আছে।” এই বলে লোকটা বুক পকেটের উপর হাত রেখে, সন্দেহের চোখে চারধারে তাকিয়ে ভিড়ের থেকে দূরে সরে গেল।
বাড়িতে খবর দেওয়া! ভারতী অর্থাৎ ঝুমিকে জানানো! তাড়াতাড়ি কার্ডটা বার করে অশোক পড়ল। পুলিশ নিশ্চয় খবর দেবে। সুকুমারের পার্সে অনেকগুলো এই কার্ড আছে। তার আগেই পৌঁছে খবরটা দিতে হবে। সময় কাটাবার একটা চমৎকার কাজ পাওয়া গেছে, অশোক উত্তেজিত হয়ে ধাবমান একটি ট্যাক্সির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল। থামল না। আর একটি খালি ট্যাক্সি দেখে হাত তুলে ছুটে গেল। কিন্তু সেটিও ওকে গ্রাহ্য করল। এরপর উন্মত্তের মতো অশোক ছোটাছুটি শুরু করে দিল।
ওর পৌঁছবার আগেই ঝুমি পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে গেছল। সুকুমারের কার্ডে ফোন নম্বর লেখা ছিল অশোক সেটা লক্ষ করেনি। বাড়িওয়ালারা বলল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল গেছে। তাই শুনে অশোক হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়েছে। মাথা মোটেই ধরেনি। আসলে ইলার ভ্যাজভ্যাজানি বন্ধ রাখতে চায়। এখন চোখ বন্ধ করে বালিশটা বুকে আঁকড়ে ঝুমিকে ভাবতে ইচ্ছে করছে। আট-দশ বছর আগের ঝুমিকে। ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে পারুলের গলার শব্দ পেয়ে তাকাল সে।
পিঠ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত চড়াই-উৎরাইগুলো হুবহু ঝুমির মতো। গলার স্বরও। প্রথমদিন পারুলকে দেখে সে চমকে উঠেছিল। গত শনিবার নেশার ঘোরে কী করেছে অশোক কিছুতেই মনে করতে পারেনি সকালে। শুধু মনে হয়েছিল পারুল যেন বলছিল, ”বড্ড নেশা হয়েছে। না না এসব এখন থাক। শুয়ে পড়ুনগে।” ঝুমিও বলেছিল, ”বিয়ের কথাবার্তা এখন থাক। তুমি বরং বাড়ি চলে যাও।” আর সুকুমার বলল, ”ঈশ্বরের আশীর্বাদ।”
অশোকের সঙ্গে এই সময়ই চোখাচোখি হল পারুলের। মনে পড়ল ঠিক ঝুমির মতো গলায় এই দুর্দান্ত স্বাস্থ্যের বউটি বলেছিল, ”না না, এসব এখন থাক।” কী থাক? পারুলের শরীর বেয়ে অশোক চোখ নামিয়ে আনল। ঝুমিরই শরীর। ওই শরীরটাকে দখল করার প্রবল ইচ্ছা ন-দশ বছর আগে ভর করেছিল তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। তখন দুজনেই ফিফথ ইয়ারে। ঝুমি প্রশ্রয় দিত। ওদের বাড়িতে যাতায়াতের সুযোগ করে দিয়েছিল। ইচ্ছে করলেই অশোক একতলার বৈঠকখানায় না বসে দোতলায় উঠে যেতে পারত। ওদের বাড়িতে তখন অনেকেই উপরে আসত।
সেদিন বারান্দায় ঝুমি দাঁড়িয়েছিল। অশোক ভেবেছিল তারই জন্য অপেক্ষা করছে। লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি টপকে উপরে উঠল।
ঝুমি পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে। ওর ঘাড়ে চুমু খাবার প্রবল বাসনা নিয়ে অশোক এগোচ্ছে আর তখুনি সুকুমারের কণ্ঠস্বর শোনা গেছল এক তলায়-”খবর দাও আমি এসেছি।” তখুনি নিচে নেমে গেল ঝুমি। শুধু যাবার আগে মাথা হেলিয়ে বলে, ”আর একদিন, কেমন?”
সেই আর একদিন আর আসেনি। অশোকের মাথার মধ্যে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। ঠিক এইভাবে, এখন যেভাবে পারুল নেমে গেল, এইভাবেই ঝুমি তাকে ফেলে রেখে, নেমে গেছল। এখন সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বালিশটাকে কামড়ে মনে মনে হেসে বলল : আসবে, যেভাবেই হোক। তোমায় আমি দেখে নেব।
”খোকন রইল, ওকে একটু দেখো। আমি একবার ঘুরে আসছি শেফালি ঠাকুরজির কাছ থেকে। জানো পাড়ায় কে এসেছে?” ইলা কাছে এসে দাঁড়াল।
”মাথা ধরেছে এখন বকবক কোরোনা। যেখানে যাচ্ছিলে যাও।”
ছয়
মাস দুয়েক আগে শচীন দত্তগুপ্ত একদিন পারসোনেল ডিপার্টমেন্ট থেকে ফিরে চেয়ারে বসেই বাসুদেব ধরকে বলেছিল :
”এখানকার মায়া কাটাবার নোটিশ পেলুম বাসু। এক্সটেনশন দিল না। আমি নাকি ফিজিক্যালি আনফিট। পঁয়ত্রিশ বছর কাটালুম এই ঘরেই, সামনের মাস থেকে আর আসতে হবে না।” এই বলে ঘরের সকলের দিকে তাকিয়ে হাসবার চেষ্টা করেছিল ষাট বছরের শচীন দত্তগুপ্ত।
