বিরক্ত হয়েই অশোক বাস স্টপে দাঁড়িয়েছিল, এমন সময় সাহেবি পোশাক পরা পোর্টফোলিয়ো ব্যাগ হাতে বেঁটেখাটো একটা লোক ওর সামনে এসে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। অশোক দেখেই বুঝল মদ খেয়ে চুর হয়ে আছে। লোকটা চেনার চেষ্টা করছে কিন্তু অশোক চিনতে পারল সুকুমারকে। বেশ মোটা হয়ে গেছে।
”অশোক ভাটাচারিয়া আই প্রিজিউম।”
”হ্যাঁ, আর তুমি সুকুমার গুহ।”
”অনেকদিন পর, কত বলো তো?”
”প্রায় আট বছর।”
”করছ কী?”
এইবার অশোক মনে মনে রেগে উঠল, কেননা সুকুমার দিব্যি মদ সাঁটিয়ে মেজাজে কথা শুরু করেছে এবং বলছে ভারিক্কি চালে, যেন উত্তর দিতে বাধ্য এমন কারুর সঙ্গে। তখন অশোক স্থির করে ফেলে সুকুমার চাল মারতে পারে এমন একটা প্রশ্নও সে করবে না, অর্থাৎ কবে আমেরিকা থেকে ফিরলে, এখন কোথায় কাজ করছ, কত মাইনে পাচ্ছ, কলকাতার কোন মহল্লায় থাকো এবং কত ভাড়া দিচ্ছ, গাড়ি কিনেছ কি না, ছেলে বা মেয়ে কোন ফিরিঙ্গি স্কুলে পড়ে, পুজোয় কোথায় ঘুরে এলে-এইসব প্রশ্ন। আর স্থির করল চাল মেরে ব্যাটার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
”আপাতত একটা সিনারিও নিয়ে ব্যস্ত।”
অশোক মোটামুটি নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে হিসেব করে ফেলেছে কতটা দামি করা যায় নিজেকে। ধুতি-পাঞ্জাবি-চটি-ঘড়ি এবং চেহারাটা দিয়ে সিনারিও রাইটার, বড়োজোর এম.এল.এ-এর বেশি ওঠা যায় না।
”বাংলা না হিন্দি?”
অশোক লক্ষ করল কথাগুলো জড়িয়ে গেল, এবং স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। মদ খেত না, এখন খাচ্ছে। কেন? একটু সদুপদেশ দিয়ে দিলে কেমন হয়! ওর বউ অর্থাৎ ঝুমি তো খুবই মাতালদের ঘেন্না করে বা একদা করত!
”হিন্দি।”
”পয়সা আছে হিন্দিতে।”
যেন তারিফ করল। এটা ভালো লাগল না অশোকের। ঈর্ষা করাতে না পারলে চাল মেরে সুখ নেই।
”তেমন আর কই, মাত্র পঞ্চাশ হাজার দেবে।”
”ওতেই রাজি হয়ে যাও। নয়তো অন্য কেউ দেখবে বাগিয়ে নেবে। কোথা থেকে টুকলে? লিখতে-টিখতে পারতে বলে তো শুনিনি।”
”কলিন কাউড্রের একটা ছোটো গল্প থেকে।”
”হু ইজ কাউড্রে?”
”সে কি!”
আকাট মুখ্যু বানিয়ে দেওয়া যাক। এই ভেবে অশোক খুশি হল বিস্তর।
”ওহ তুমি কি খবর-টবর আর রাখো না নাকি?”
”না, মানে, আজকাল এত কাজের চাপ, কাউড্রে নামটা অবশ্য শোনা-শোনা লাগছে, ইজ হি এ ক্রিকেটার।”
”নো নো, এ কানাডিয়ান রাইটার।”
”ওহোঃ, হ্যাঁ হ্যাঁ পড়েছি। ব্রিলিয়ান্ট তবে কিছুটা সেন্টিমেন্টাল, বোধহয় আটলান্টিক মান্থলিতে ওকে নিয়ে”-
”না, না, তুমি ভুল করছ, এনকাউন্টারে একটা রিভিউ বেরিয়েছিল বিল লরির করা, বছরখানেক আগে।”
”আটলান্টিক মান্থলি নয়? আর ইউ সিওর? কী জানি পড়াশুনোর সময় একদমই পাইনা তো। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত শুধু…টাকা টাকা টাকার পিছনেই তাড়া করে চলেছি। ব্যাপারটা এত অশ্লীল আগে বুঝিনি, এই সংসার-ধম্মো করা। তুমি কি বিয়ে করেছ?”
”ন্নাঃ” অশোকের মুখ দিয়ে আপনা থেকেই শব্দটা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে এল। সুকুমারের ঘোলাটে এলোমেলো চাউনিতে যেন এখনই সে পরশ্রীকাতরতা ফুটে উঠতে দেখল।
”আজকাল বড্ড বেশি খাটতে হচ্ছে। একদিন এসো-না আমাদের বাসায়। একটা ট্যাক্সি ধরার চেষ্টা করছি তখন থেকে অথচ পাচ্ছি না। কী যে জঘন্য এই চৌরঙ্গীটা।”
”কোথায় আছ?”
সুকুমার বাঁ হাতে কোটের ভিতর পকেট থেকে পার্স বার করল। হাতে ঝোলানো ব্যাগটা ফুটপাথে রেখে, পার্স থেকে কার্ড বার করে দিল। ঠিকানাটা পড়ে অশোক বলল, ”টালায় আছ? আমি শুনেছিলাম যোধপুর পার্কে!”
”ঝুমির জন্য। দক্ষিণ কলকাতায় বাপের বাড়ি তাই ওদিকে যাবে না। জানোই তো ওরা আমাদের উপর কি ভীষণ খাপ্পা। বুঝিনা অশোক, আমি এমন কি অপাত্র! ঝুমির মতো মেয়ে কি আমার থেকেও ভালো স্বামী জোটাতে পারত! তুমি জানো, স্বভাবটাও ওর সত্যিই মিষ্টি কিন্তু কী ভীষণ ডাল।”
সুকুমারের কথা আরও জড়িয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে দুলে উঠছে। গলা চড়ছে। দু-একজন ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
”বড্ড একঘেঁয়ে, কোনো ভেরিয়েশান নেই। অথচ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। জানো অশোক, আমার মাঝে মাঝে কী ইচ্ছে করে?”
এলোমেলো চোখ দুটো অশোকের মুখের কাছে এগিয়ে এনে সুকুমার বলল, ”ইচ্ছে হয় ওকে খুন করি। আমাকে ঠকিয়েছে। ওর সেক্স দিয়ে আমাকে চিট করেছে। তুমি খুব বেঁচে গেছ, ওযে তোমায় রিফিউজ করেছিল সেটা তোমার পক্ষে ঈশ্বরের আশীর্বাদ। তবে শিগগিরিই একদিন সকালে কাগজ খুলে দেখতে পাবে হেডিং-স্বামী কর্তৃক স্ত্রী খুন। কিন্তু নিশ্চিত জেনো, আমি ফেরার হব না। আমি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করব। ডিফেন্ড করব না। কোর্টে। শুধু বলব, জেল-টেল নয়, আমাকে ফাঁসি দেওয়া হোক। আই ওয়ান্ট টু ডাই!”
ঝুঁকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সুকুমার কোনোরকম বিদায় না জানিয়ে হাঁটতে শুরু করল উত্তর দিকে। ভিড়ের মধ্যে একাকার হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত অশোক ওকে লক্ষ করল। শরীরটা ডানদিকে একটু হেলে রয়েছে, পা ঠিকমতো পড়ছে না, মাথা ঝুঁকিয়ে গুলি খাওয়া শুওরের মতো রাগে দিশাহারা হয়ে যেন ও লন্ডভন্ড করতে চলেছে।
অশোক ঘড়ি দেখল। সাড়ে চারটে মাত্র। সুকুমারের দেওয়া কার্ডটা তখনও হাতে। আর একবার চোখ বুলিয়ে পকেটে রাখল। এখনও কয়েক ঘণ্টা সময় কাটাতে হবে। জয়রাম মিত্র লেনে রাত না বাড়লে কোলাহল থামে না। অশোক আনমনে রাস্তার ওপারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে, আউটরাম ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখবে ঠিক করে, রাস্তা পার হবার জন্য প্রস্তুত হতে গিয়ে বাঁদিকে তাকাল, তারপর ডানদিকে।
