ইলার রুদ্ধশ্বাস বাক্যস্রোতে পারুল ভেসে গেল। ধুপ করে উবু হয়ে বসে ইলার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ”চল না, এখটুখানি দেখে আসি। সিনেমায় কত দেখেছি, রক্তমাংসের মানুষটাকে সামনা-সামনি একবারও দেখিনি। দ্যাখ না, রোজই তো বাপু এই সময় রাস্তার জানলার ধারে এটা করি ওটা করি, কেউ গেলে চোখে পড়েই। আর আজকেই এমন বরাত যে-আরে বলব কী, বিকেল থেকেই বুড়িটা খালি খাবো খাবো করে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। চুপ করে শুয়ে ছিলুম। মনে হল বটে মোটরগাড়ির মতো কী একটা যেন ঢুকল। বুড়ি যে কবে ঘাটে যাবে।”
অন্য সময় হলে পারুলের শাশুড়ির বিষয়ে শোনার সময় হত ইলার, এখন সেও ব্যস্ত হয়ে বলল, ”ওনারও মাথা ধরেছে, শুয়ে আছেন খোকাকে নিয়ে।”
”ভালোই তো হল, চট করে তাঁতি গলিতে ঢুকে জানালা দিয়ে দেখেই চলে আসব। মাইরি, একবার চল।” পারুল দু হাতে ইলাকে জড়িয়ে শব্দ করে গালে চুমু খেল এবং বগলের নিচে খামচে ধরল।
”অই অই, আবার যা-তা শুরু হল তো। ইলা সরিয়ে দিল পারুলের হাত। গলা নামিয়ে বলল, ‘উনি রয়েছেন ঘরে, পাগলামি করিসনি’।”
”ওরে বাবা, আজ যে বড়ো তাড়াতাড়ি! দশটা-এগারোটার কম তো ফেরে না।”
”মাথা ধরেছে ভীষণ।”
”শনিবার দিন তো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গেছল, আমি না থাকলে আর উঠতে হত না-বাব্বাঃ মুখে কী ভুরভুরে গন্ধ।”
ইলা তীক্ষ্ন চোখে তাকাল পারুলের দিকে। আঁটকুঁড়িটার বড্ড নজর অশোকের দিকে। রোজ রাতে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য জেগে বসে থাকে। যখন তখন উপরে উঠে আসে অশোক থাকলে। গায়ে মাথায় কাপড় ঠিক থাকে না। এর জন্যই শেফালিদের ছাদের দিকের জানলাটা বন্ধ রাখতে হয়। শনিবার রাতে অশোককে ধরে তুলেও দিয়েছে। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ইলা, হঠাৎ মনে পড়ল দোকান থেকে আট গজ মারকিন আনিয়ে দিয়ে পারুল দাম নেয়নি।
”কী দেখছিস, যাবি তো তাড়াতাড়ি কর।”
পারুল এইভাবে ইলার তাকানোয় অস্বস্তি বোধ করল। তাও সে বলেনি, অশোক বারবার ঝুমি ঝুমি, তোমাকে ঝুমির মতো দেখতে, বলে ঘাড়ে চুমু খেয়েছিল। ঝুমিটা কে, কদিন ধরে পারুল তাই জানার চেষ্টা করেও জানতে পারেনি। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নামটা ইলার সামনে করেছে কিন্তু ইলা কখনো শুনেছে বলে মনে হয়নি তার।
পারুল উঠে দাঁড়াল। শোবার ঘরের আধখানা দেখা যাচ্ছে। খাটে আট মাসের বাচ্চচাটা ঘুমোচ্ছে। তার পাশে অশোকের পিঠ আর মাথা। ফুটফুটে, উলের বান্ডিলের মতো নরম ছেলেটা। সারা দুপুর ওকে নিয়ে পারুল চটকায়, কাঁদায় হাসায়। অমন একটা বাচ্চচা তার চাই। বাপের বাড়ি গিয়ে, লুকিয়ে যে ডাক্তার দিয়ে নিজেকে পরীক্ষা করিয়েছে। ডাক্তার বলেছে, বাঁজা নও। তোমার স্বামীকে পরীক্ষা করা দরকার, তাকে নিয়ে এসো। মৃত্যুঞ্জয়কে সে কথা আজও জানায়নি পারুল। মা হবার ক্ষমতা তার আছে, এইটুকু জেনে সে স্বস্তি পেয়েছে। আঁটকুড়ি আঁটকুড়ি শুনে এখন তার প্রচণ্ড রাগ হয় অপদার্থ হোঁৎকা স্বামীর উপর। ময়না কিনে দিয়েছে, টিয়া কিনে দিয়েছে অথচ সাজানো তকতকে ঘরটা তছনছ নোংরা করে দেবার মতো একটা দস্যি নিয়ে আসার ক্ষমতা নেই। দোকান থেকে রোজ রাতে বাড়ি ফিরে টাকার হিসেব নিয়ে বসবে। একটা সিকি এধার-ওধার হয়ে গেলে রাতে ঘুমোবে না। মাদুলি, জলপড়া, হত্যে দেওয়া, মানসিক করা-সবকিছুই মৃত্যুঞ্জয়ের নির্দেশে করে যায় পারুল। শুধু ডাক্তারের বলা কথাটা জানায়নি।
ইলা পিছন ফিরে রান্না ঢাকা দিয়ে রাখছে। পারুল শোবার ঘরে বাচ্চচার দিকে আবার তাকাল। হঠাৎ অশোককে পাশ ফিরতে দেখে সে চোখ সরিয়ে নিল। ইলা ন্যাতা দিয়ে রান্নাঘরের মেঝে নিকোচ্ছে। পারুলের মনে হল যেন, অশোক ওঘর থেকে তার দিকে তাকিয়ে। সন্তর্পণে সে চোখ ফেরাল। সোজা তার মুখের উপর একদৃষ্টে অশোক তাকিয়ে। ওর চোখে পারুল কী যেন দেখতে পেল আর সঙ্গে সঙ্গে বুকের মধ্যে থরথর করে উঠল।
”আমার শরীরটা কেমন করছে রে ইলা।”
”সেকি রে!”
”হ্যাঁ, বুকের ব্যথাটা শুরু হবে মনে হচ্ছে। বোধহয় আমি আর যেতে পারব না।” পারুল দেয়ালে হাতের ভরে শরীর রেখে চোখ বুজল।
”সেকি! তোরই লাফানি বেশি আর তুই-ই এখন যেতে পারবি না বলছিস। কী যে ঢঙ বুঝিনা বাপু।” ইলা গরগর করে উঠল ক্ষোভে।
”আমার শরীরটা ভালো লাগছে না, মাথা ঘুরছে, তুই বরং শেফালি ঠাকুরঝিকে সঙ্গে নে, আমি আর যাব না। শুয়ে পড়ি।” বলতে বলতে পারুল সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল দ্রুত। শেষের তিনটে ধাপ আগে পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেল সে। তাড়াতাড়ি উঠে ঘরে গিয়ে, আলো নিভিয়ে আছড়ে পড়ল খাটে। তার সারা শরীর এখন কেমন করছে।
দালানের কোণ থেকে শাশুড়ি বলে উঠল, ‘অ-বউ, কী পড়লে রে?’
অশোক একদৃষ্টে পারুলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আসলে সে পারুলকে দেখছিল না। ভাবছিল গত চার ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা।
চার ঘণ্টা আগে সুকুমারের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হল চৌরঙ্গীর পুব ফুটপাথে, বাস স্টপে। জেনারেল ম্যানেজারের কাছে এগারো দফা দাবি পেশ করার জন্য ব্রাঞ্চগুলো থেকে যে মিছিল শ্লোগান দিতে দিতে হেড অফিস পর্যন্ত আসে তার মধ্যে অশোকও ছিল। গেটের সামনে জমায়েত হয়ে বক্তৃতা শুরু হতেই সে ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে। একঘেঁয়ে কথাগুলো শোনার উৎসাহ তার আর নেই। ধর্মতলা-চৌরঙ্গীর মোড়ে পৌঁছে ভাবল, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কী করব। এখন সিনেমার ম্যাটিনি শো মাঝামাঝি অবস্থায়, ফুটবল লিগের খেলা শুরু হতেও ঘণ্টা দেড়েক বাকি। হাসপাতালে কেউ পরিচিত রুগি হয়েও নেই যে দেখে আসা যায়, শুঁড়িখানায় বসার মতো পকেটে যথেষ্ট টাকাও নেই। তাহলে কি ইউসিস লাইব্রেরিতে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে হবে?
