মেজোবউদি না থাকলে মানুর এ বাড়িতে ঢোকার কোনো কারণই থাকে না। বড়োবউদির সঙ্গে ওর আলাপটা নেহাতই সৌজন্যমূলক। দ্বারিক সাহস করে বলে ফেলল, ”এখানে দাঁড়িয়ে ভাবলে আর বলতে পারবে না। মেজোবউদি তো নেই বরং আমার ঘরে বসে ভাবতে পারো।”
”কোথায় গেছে মেজোবউদি!”
”বাপের বাড়ি, মায়ের অসুখ করেছে। কোথাও যাচ্ছ নাকি, এত সেজেছ যে?”
”ধ্যেৎ, একে আবার সাজা বলে নাকি। এই চেহারায় সাজবোটা কোথায়।”
হেসে উঠতে গিয়ে দ্বারিকের মুখের দিকে তাকিয়ে মানুর বুকের মধ্যেটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। দ্বারিকের চোখে ভর্ৎসনা এবং আহত হওয়ার মিশ্র একটা রূপ ফুটে রয়েছে। অস্ফুটে সে বলল, ”চলুন”।
দুজনেই পা টিপে চুপিসারে দোতলায় এসে দ্বারিকের ঘরে ঢুকল। কেন যে এমন করে লুকিয়ে এল, ওরা তার কৈফিয়ৎ খোঁজার জন্যই বোধহয় পরস্পরের মুখের দিকে, তাকাল। দ্বারিকের চোখ চাপা উত্তেজনায় ঝকঝক করছে। ঘড়ঘড়ে গলায় সে বলল, ”দাঁড়িয়ে কেন, বসো।”
”আপনার ঘরে এই প্রথম এলুম।”
”সে কি! এত বছর আসছ অথচ-”
”যা গম্ভীর আপনি। ভয় করে আপনাকে দেখলে।”
”এখন করছে না?” দ্বারিক খুশি হয়ে দরজার পর্দাটা ভালো করে টেনে দেবার জন্য পিছু ফিরল।
মানু ঘরের সর্বত্র চোখ বুলিয়ে, টেবিলের উপর পাতা খুলে উপুড় করে রাখা একটি বই দেখে বলল, ”পড়ছিলেন বুঝি?”
ফ্যাকাশে মুখে ঘুরে দাঁড়াল দ্বারিক। বইটা তোশকের নিচে রেখে একতলায় যাওয়া উচিত ছিল তার।
”হ্যাঁ, ব্যাঙ্কিংয়ের সেকেন্ড পার্টটা দেব ভাবছি।”
দ্বারিক পায়ে পায়ে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। তবু রক্ষে বইটা কালো মলাটে বাঁধানো। টেবিলে আরও কয়েকটা বই রয়েছে। মানুর দিকে পিঠ ফিরিয়ে বইটা চটপট গুঁজে দিল অন্যগুলোর মধ্যে।
”কি, বললে না তো, এখন তো ভয় করছে কিনা?” হাঁফ ছেড়ে দ্বারিক মুখোমুখি চেয়ারে বসল।
”বলুন না গাড়িটা কার?”
”উঁহু, আগে আমার কথাটার উত্তর দাও।”
”কী উত্তর দেব!”
”বারে, সেটা কি আমি বলে দেব।”
”দিন না বলে।” হেসে মুখ ফিরিয়ে মানু আলনায় ঝোলানো পোশাকগুলো দেখতে মন দিল। দ্বারিকের মনে হল, এত সুন্দর মুখ আর হয় না।
”বললে কী খাওয়াবে?”
”আমার পয়সা কোথায় যে খাওয়াব?”
”পয়সা লাগে বুঝি খাওয়াতে!”
মানু চট করে দ্বারিকের মুখটা দেখে নিল একবার। বেপরোয়া দুঃসাহসে পেয়ে বসল দ্বারিককে। জীবনে এই প্রথম একঘরে একটি বিংশোত্তীর্ণা অনাত্মীয়া কুমারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সে পেয়েছে, জীবনে আর কোনোদিন আসবে কিনা কে জানে। এলেও হয়তো তখন সে আর যুবক থাকবে না। কিংবা কালই ভোলানাথ পাঁড়ুইয়ের মতো বাস চাপা যেতে পারে।
”পয়সা লাগে না এমন জিনিসও তো মেয়েরা খাওয়াতে পারে!”
”সে আবার কি জিনিস?” মানু সন্ত্রস্ত হয়ে খোলা বাঁ-কাঁধটি আঁচলে ঢাকল। দ্বারিকের চোখে অদ্ভুত মিষ্টি এক চাহনি।
”বলব?”
হ্যাঁ, বলতে গিয়ে কিছু না বলে, মানু মাথা নুইয়ে চুপ করে রইল। দ্বারিক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ভাবল, শেষ পর্যন্ত বোধহয় যুবক হতে পারব।
মনে মনে সে দ্রুত বলল, আসলে আমি খুব ভিতু। কোনোদিন মেয়েদের সঙ্গে মেশার সুযোগ তো হয়নি। আমার গাম্ভীর্যটা পুরোপুরিই নকল। আমায় তুমি ভয় পেয়োনা, কেমন।
দম বন্ধ করে উৎকণ্ঠিত চোখে দ্বারিক তাকিয়ে রইল। মানু মুখ তোলেনি।
”মনীষা, উত্তর দিচ্ছ না যে?”
মুখ তুলে মানু তাকাল। দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। দ্বারিকের বুকের মধ্যে মোচড় দিল। কী বলবে ভেবে না পেয়ে, অসহায়ভাবে এধার-ওধার তাকাল। দারুণ একটা কিছু বলতে ইচ্ছে করছে তার এবং কোনোক্রমে আবেগ সংযত করে বলল, ”ওই নীল গাড়িটায় আমাদের পাড়ায় কে এসেছে জানো!”
নামটা শুনেও কোনো ভাবান্তর ঘটল না মানুর। তাইতে দ্বারিকের মনের গভীরে নিরুদ্বিগ্ন সুখের সঞ্চার ঘটল। হেসে বলল, ”বেরিয়ে যখন মোটরে উঠবে আমার এই জানলা দিয়ে দেখা যাবে। তুমি ততক্ষণ বসবে?”
মানু ঘাড় নেড়ে বলল, ”আমার একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না দেখার।”
পাঁচ
”অ বউ, কোথায় গেলি, সন্ধে দেখিয়েছিস? অ বউ, শুনতে পাচ্ছিস? খোকাকে বলিস কাল বাজার থেকে যেন কচুরমুখী আনে। মনে করে দিস ওকে। বড়ি দিয়ে ঝাল করিস।”
থুত্থুড়ে শাশুড়ি এক তলায় দালানের এক কোণায় সকাল-সন্ধে উবু হয়ে বসে থাকে। হামা দিয়ে নর্দমা পর্যন্তও যেতে পারে না। চোখে দেখে না, কানে কম শোনে।
”অ বউ, খোকা দোকান থেকে ফিরেছে?”
কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলল, ”আঁটকুঁড়ির গেরায্যই নেই। মর তুই, খোকার আবার বিয়ে দোব, টুকটুকে বউ আনব, বছর বছর বিয়োবে, দেখি তোর দেমাক থাকে কোথায়।”
বুড়ি এখন ঘণ্টাখানেক এইভাবে বকবক করে যাবে। কিন্তু যাকে শোনাবার জন্য, সে তখন দোতলায় ইলার রান্নাঘরের দরজায়।
”বলিসকি লো, সত্যি!” পারুল ধাক্কাটা সামলে ওঠার জন্য দরজাটা চেপে ধরল।
”হ্যাঁরে গুঁপো-ঠাকুরঝি এই তো জানালা দিয়ে বলল। তিনের-বি-তে যে বিধবা মাস্টারনি থাকে, ওই যে রে, রাস্তায় কুকরদের বিস্কুট কিনে খাওয়ায়, ওরই কাছে এসেছে।” ইলা বেগুনের পিঠ ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল।
”যাঃ, বাজে কথা, অন্য কেউ হবে।” পারুল বিশ্বাস করতে পারছে না। ”এই গলিতে কী কত্তে আসবে, ওর মতো দেখতে কেউ হয়তো হবে।”
”তোর অমনি অবিশ্বাস।” ইলা চটে উঠল। বেগুনটাও পুড়ে গেছে। কড়াটা ঠকাস করে উনুন থেকে নামিয়ে রাখল। ”কেন, আসতে পারে না নাকি এ পাড়ায়? এক সময় কত বড়ো বড়ো লোক ছিল জানিস! ওই যে ছুঁচিবেয়ে সত্যচরণ, ওর ঠাকুর্দার নামে মেডিকেল কলেজে একটা বেড আছে। স্যাকরা বাড়ির পাশে বাসু ধর, ওদের বাড়িটা তো তিন মহলা ছিল, ওই পেছনের কালী ঘোষ স্ট্রিটে ছিল সদর দরজা, এখন তো ওরা থাকে আগের বাড়ির খিড়কির দিকে। সব বিক্রি হয়ে গেছে। ওর যে কাকা ব্রাহ্ম হয়ে গেছে, সে হাইকোর্টের জজ হয়েছিল, এই পাড়াতেই তো মানুষ! আর এখনও কি নেই ভেবেছিস? ওই প্রোফেসারের কাছে কত বড়ো বড়ো লোক আসে তা জানিস?”
