সাতটি নাবালকের বাবা অফিসের ভোলানাথ পাঁড়ুই এক বিকেলে ট্রামে উঠতে গিয়ে পিছলে বাসের চাকার নিচে চ্যাপটা হয়ে যায়। হাসপাতাল এবং শ্মশান হয়ে দ্বারিক ভোলানাথের বাড়িতে গেছল। সেখানে ছেলেমেয়েগুলির অসহায় মুখ এবং ভোলানাথের স্ত্রীর কান্না শুনে, দ্বারিকের বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে। নিজেকে ভোলানাথের জায়গায় কল্পনা করে, তারপর থেকে সে, মাঝে মাঝেই ভয় পাচ্ছে। সাবধানে রাস্তা পার হয়, নিশ্চল না হওয়া পর্যন্ত ট্রামে-বাসে ওঠে না, কর্পোরেশন অফিসে গিয়ে বসন্তের টিকা নিয়ে এসেছে। এমনকি বিয়ে না করার কথাও সে ভেবেছে। বড়োবউদি তার বিবাহযোগ্যা এক মাসতুতো বোনের অসাধারণ রূপ ও গুণাবলির কথা ইদানীং দ্বারিককে প্রায়ই শোনাচ্ছে। মেজোবউদি আড়ালে তাকে বলেছে, ”সব বাজে কথা, মানুর থেকেও দেখতে খারাপ।”
মানু অর্থাৎ মনীষা এইবার বি.এ. পরীক্ষা দেবে। বছর পাঁচেক আগে এ পাড়া থেকে উঠে গিয়ে শ্যামপুকুরে রয়েছে। মেজোবউদির থেকে বয়সে দশ-বারো বছরের ছোটো, কিন্তু সখীস্থানীয়া। এ পাড়ায় থাকার সময় ফ্রক পরে রোজই আসত। তখন ওকে দেখে দ্বারিকের সাধ হত হাস্য-পরিহাসের, সান্নিধ্যলাভের। কিন্তু ঘড়ঘড়ে গলায় ”এই যে” বলা ছাড়া আর কিছুই বলা হয়ে ওঠেনি।
তারপর হঠাৎ একদিন অফিস যাবার জন্য বাস স্টপে দাঁড়িয়ে দ্বারিক দেখল, মানু শাড়ি পরে কলেজে যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে দ্বারিকের মনে হল মানুতো বেশ সুন্দর! সঙ্গে সঙ্গে কিছু বাসনার উদয় হল এবং তারই প্রকোপে সে মুগ্ধ হয়ে তাকাল। মানু ওর পাশ দিয়ে যাবার সময় লাজুক হয়ে মাথাটি নামিয়ে আঁচলটি বুকে টেনে দেয় এবং কিছুদূর গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। এরপর, প্রায়ই দ্বারিক বাস স্টপে দাঁড়িয়ে তিন-চারটি বাস ছেড়েও অপেক্ষা করে। মাঝে মাঝে দেখা হয় মানুষ সঙ্গে। কিন্তু প্রথম দিনের মতোই মানু মাথা নামিয়ে চলে যায় এবং দূরে গিয়ে তাকায়। দ্বারিকের খুব ইচ্ছা করলেও আজও কথা বলা হয়ে ওঠেনি।
মানু গড়নে রোগা এবং ঢ্যাঙা। মাথায় প্রচুর চুল, গায়ের রঙ মিশকালো। হাসে হো হো করে, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শেষের দুটি ধাপ লাফিয়ে নামবেই, কণ্ঠস্বর অসম্ভব মিষ্টি এবং ভালোই গান গায়, তর্ক করতে ভালোবাসে, যুবকদের নাজেহাল করার সুযোগ পেলে ছাড়ে না, কলেজ স্পোর্টসে দৌড়ায় এবং কলেজ ইলেকশনে বক্তৃতা দেয়। মা-বাবা এবং পাঁচ ভাইবোনের সংসারে কোনো কাজ করতে তার ভালো লাগে না। দ্বারিকের মেজোবউদি প্রায়ই ভালোমন্দ শখের রান্না করে, ঘরে হিটার জ্বেলে। কীভাবে যেন মানু তখন ঠিক হাজির হয়ে যায়। ও অসম্ভব খেতে ভালোবাসে। অকপটেই বলে, ”ভাত-ডাল-চচ্চচড়ির বেশি তো আর জোটে না। তাই যেখানেই খাবার গন্ধ পাই ঠিক হাজির হই। কলেজে অ্যায়সা খিদে পায়, মাঝে মাঝে ভাবি বেশ পয়সাওলা ছেলে যদি পাই তো প্রেম করি!” তারপরই হো হো করে হেসে উঠে বলে, ”যা রক্ষেকালীর মতো চেহারা আমার। একটা ছেলেও কাছে আসে না।”
এই সময় হঠাৎ মানু এসে হাজির। দ্বারিক তখন সদর দরজায় দাঁড়িয়েছিল। অসীমের চেঁচিয়ে বলা কথায় উঁকি দিয়ে ঝকঝকে আকাশি-নীল একটা মোটর দেখে কৌতূহলী হয়ে নিচে নেমে আসে। সত্যচরণ বালতি হাতে যাচ্ছিল জল নিতে। দ্বারিককে দেখে বলল, ”হ্যাঁগো, গাড়িটা এখানে রাখা কি উচিত হল, বলো তো তুমি?”
”কার গাড়ি?”
”ওম্মা, এখনও শোননি। ওই যে বায়স্কোপের হিরো গো। যাকে দেখলে মেয়েরা পাগল হয়ে যায়।”
নামটা শুনে খুবই অবাক হল দ্বারিক। বিশ্বাসই করতে পারল না। অসীমকে আসতে দেখে সে ইতঃস্তত করল, জিজ্ঞাসা করবে কি না।
”ওগো, এটাকে তো পাড়ায় ঢোকালে”, সত্যচরণ অসীমকে লক্ষ করে বলল, ”চাকায় চাকায় যত রাজ্যের গু-মুত এবার থেকে ঢুকতে শুরু করবে তো।”
”তা করবে।” অসীম তার প্রায় ছ’ফুট দেহটিকে তেরিয়া করে দাঁড়াল। সত্যচরণ কথা না বাড়িয়ে ডিঙি মেরে কিছু একটা অতিক্রম করে টিউবওয়েল পৌঁছে গেল।
”চাকায় চাকায় আসে আর লোকের পায়ে পায়ে আসে না? রাস্তাটা কি আপনার শোবার ঘর?” অসীম আরও কিছু বলত, ওর ছোটোভাইকে ছুটে আসতে দেখে চুপ করল।
”দাদা, সেই লোকটা এসেছে।”
”কিছু বলেছে?” চাপা গলায় অসীম বলল।
”হ্যাঁ, রাগারাগি করছে, টাকা ফেরত চাইছে আর তোমাকেও খুঁজছে।”
কিছুক্ষণের জন্য পাংশু হয়ে রইল অসীমের মুখ। দ্বারিক তাকিয়ে আছে দেখে ছোটোভাইকে বলল, ”আমি ঠাকুরের চায়ের দোকানে আছি, চলে গেলেই খবর দিবি।”
অসীম চলে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মানু এল। দ্বারিক তখনও সদরে দাঁড়িয়ে। মানুকে দেখামাত্র বলল, ”কার গাড়ি বল তো?”
মানু অবাক হল। এমন উত্তেজিত ছেলেমানুষি গলায় দ্বারিককে কথা বলতে শোনেনি কখনো। তাছাড়া চারটি শব্দবিশিষ্ট বাক্য দ্বারা তাকিয়ে যেচে কথাও শুরু করেনি। মোটরের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে বলল, ”কী জানি।”
”যদি বলতে পারো তাহলে মিত্র কাফের ফাউল দোপেঁয়াজি খাওয়াব, ফুল প্লেট।”
”ওরে ব্বাস, তবে বলতেই হয়।” মানু কোমরে হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে আকাশ-পাতাল ভাবার ভান করল। দ্বারিক সেন্টের মৃদু গন্ধ পেল। খোঁপায় লাল গোলাপ দেখল। শাড়িটি সিল্কের। ব্লাউজের হাতা নেই।
সত্যচরণ বালতি ভরে জল নিয়ে যেতে যেতে দুজনের দিকে তাকিয়ে গেল। দ্বারিক তাইতে অস্বস্তি বোধ করল। মেজোবউদি বিকেলে বাপের বাড়ি গেছে ছেলেমেয়েদের নিয়ে। মায়ের নাকি অসুখ করেছে, রাতে ফিরবে। বড়োবউদি ইনফ্লুয়েঞ্জায় শয্যাশায়ী। অফিস থেকে ফিরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দ্বারিকের কানে আসে বড়দা বাঁকা সুরে বলছে, ”রান্নাঘরে যেতে হবে কিনা, তাই বোধহয় মায়ের অসুখ হয়েছে।”
