অনন্ত এই সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে দেখল, সদরের অর্ধেক আড়াল করে একটা ঝকঝকে নীল মোটর দাঁড়িয়ে। সুতরাং চিৎকার করল, ”গাড়ি কার, অ্যাঁ রাখার কি আর জায়গা পেল না। এটা লোকের বাড়ির সদর সেটা খেয়াল হল না।”
”কী হয়েছে অত চেঁচাচ্ছেন কেন?”
পা টেনে টেনে অসীম এগিয়ে এল। ওর গম্ভীর গলা, যেটা-‘চুপ কর শালা’ বলার সময় প্রয়োগ করে-শুনে অনন্ত থতমত হল। আঠারোর-সি-র দ্বারিক চক্রবর্তী অর্থাৎ ভোম্বল দোতালার জানলা থেকে উঁকি দিল।
”আমিই বলেছি ওখানে রাখতে। পাড়ার মধ্যে মোটর রাখার আর জায়গা কোথায়? যা একখানা গলি। রিকশা ছাড়া আর কিছুতে চড়া মানুষ তো কোনো জন্মে ঢোকেনি। অসুবিধে হয় তো একটু ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছি বরং।”
”একটু পরেই পুতুলকে দেখতে আসবে তো। তাই বলছিলুম”, অনন্ত কণ্ঠস্বর মোলায়েম করে বলল, ”কে এল অসীম, কার বাড়িতে?” ফ্যালা নামে ডাকার ভরসা হল না তার।
উত্তর পেয়ে অনন্ত অবাক হয়ে মোটরটার দিকে তাকিয়ে রইল। অসীম চলে যাচ্ছে একটু খুঁড়িয়ে। অনন্ত ব্যস্ত হয়ে বলল, ”হল কী পায়ে?”
”চোট লেগেছে।” অসীম মুখটুকুও ফেরাল না।
”চিকিৎসা করাচ্ছ তো?” অনন্তকে চেঁচিয়ে বলতে হল, কেননা জবাব দিতে অসীম দাঁড়ায়নি।
কিন্তু শুনেছে। দাঁত চেপে অসীম নিজেকে শুনিয়ে বলল, ”দরদ দেখাচ্ছে।” এখুনি তার ত্রিশটা টাকা দরকার, কেননা ওর বাবা এক কাণ্ড বাধিয়ে বসে আছে। যেভাবে হোক এখুনি তাকে টাকা জোগাড় করতে হবে।
অনন্ত চিন্তায় পড়ে গেল। গাড়িটা এখানে থাকলে, ওরা এসে দেখে কিছু ভাববে না তো। এসব লোক লম্পট দুশ্চরিত্র হয় বলেই তার ধারণা। ত্রিশ বছরে গুটি চারেক সিনেমা সে দেখেছে, কিন্তু ফ্যালাটা যার নাম করে গেল তার ‘বই’ একটাও দেখেনি। পুতুলের ডিসকোয়ালিফাই হবার কারণ, এই গাড়িটা হতে পারে কি না, সেটা কার কাছ থেকে জানা যাবে, তাই ভাবতে শুরু করল অনন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ঝি ভিতর থেকে এসে বলল-
”বাবু, মা তাড়া দিচ্ছে। আর বলে দিল সন্দেশগুলো বড়ো বড়ো চারটাকাওলার আনতে। ওম্মা, গাড়ি কার গো, এসে গেছে নাকি!”
”অন্য লোকের গাড়ি।” অনন্ত গম্ভীর স্বরে বলল। এইসময় তার মনে হল, সদরে এমন ঝকঝকে একটা মোটর দাঁড়িয়ে থাকলে মন্দ দেখায় না। গৃহস্বামীর মানও বাড়ে। পুতুলের মামা কি মেসোর গাড়ি বলেও তো চালিয়ে দেওয়া যায়!
বাসুদেব ধর অফিস থেকে ফিরছে। দূরে ওকে দেখতে পেয়েই অনন্ত সিংহ মোটরটার বাম্পারে একটা পা তুলে দিল। পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরিয়ে, এটার মালিক তার খুবই নিকট আত্মীয় এতই নিকট যে পা পর্যন্ত তোলা চলে, এমন একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে অনন্ত আকাশে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল।
যাবার সময় বাসুদেব আড়চোখে একবার মাত্র তাকাল।
চার
দ্বারিক ওরফে ভোম্বল জয়রাম মিত্র লেনে সবথেকে ভালো ছেলে হিসাবে ঘরে ঘরে সুখ্যাত। স্কুল ফাইনালে অঙ্কে লেটার পায়। বি.কম-এ উঁচু সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে। কিছুদিন জোড়াবাগানে এক আখড়ায় কুস্তি শিখেছিল। লাইব্রেরি থেকে বই আনে হপ্তায় চারবার। দ্বারিক স্কুলজীবনে মোহন সিরিজ, শরৎচন্দ্র ও তারাশঙ্কর শেষ করে ফেলেছে। কলেজে ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হয়ে কিছুদিন বিবেকানন্দ এবং মাও-সে-তুং পড়ে। ব্যাঙ্কের চাকরিতে ঢুকে এখন রবীন্দ্রনাথ পড়ছে। তবে ছোকরা লাইব্রেরিয়ানটি যেদিন বসে, সেদিন ক্যাটালগে যৌন-বিজ্ঞানরূপে চিহ্নিত বইগুলি থেকেই একটি নেয়। নিজের ঘরে তোশকের নীচে সেই বই রাখে। দরজা বন্ধ করে গভীর রাতে পড়ে এবং শরীরে খুবই চঞ্চলতা অনুভব করে। লুকিয়ে হিন্দি ফিল্ম দেখছে প্রায়শই। সন্ধ্যার পর চৌরঙ্গী অঞ্চলে সে অলসভাবে হেঁটে ফেরে। সুগঠিতা মহিলারা এই অঞ্চলে মানসিক জড়তামুক্ত হয়ে চলাফেরা করে এবং তাদের দেখতে দেখতে দ্বারিক ঝিমঝিমে এক ধরনের অনুভবের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে কাউকে অনুসরণ করে, কখনো সিনেমায়, কখনো মনুমেন্টের নীচে রাজনৈতিক প্রতিবাদ সভায়, কখনো বাসে উঠে গড়িয়া বা হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর বাড়ি ফেরার সময় নিজেকে প্রভূত ধিক্কার দিতে দিতে প্রতিজ্ঞা করে ”এই শেষ। আর এভাবে ইন্দ্রিয়ের দাস হবে না। কিছুতেই না।” পরদিন থেকেই সে শীর্ষাসন শুরু করে, এবং সপ্তাহকাল অফিস থেকে সোজা বাড়ি চলে আসে। ট্রামে বা বাসে লেডিজ সিটের দিকেও তাকায় না। কিন্তু পরশু দিনই গড়ের মাঠ থেকে কিছু নিয়ে একটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ে বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের পার্ক সার্কাসের বাড়ির দরজায় পৌঁছেই বিবেকের এক প্যাঁচে নিজেকে মাটিতে ফেলে কষে লাথি মেরেছে আর বলেছে ”এই শেষ, এই শেষ।”
প্রকৃতপক্ষে দ্বারিক কিন্তু মুখচোরা, দায়িত্ববান যুবক। চাকরিতে ঢুকেই ব্যাঙ্কিং-এর প্রথম পরীক্ষা পাশ করে পঞ্চাশ টাকা ইনক্রিমেন্ট পেয়েছে, দ্বিতীয়টির জন্য তৈরি হচ্ছে। তাহলে আরও দুটি ইনক্রিমেন্ট পাবে। এখন তার বেতন প্রায় চার হাজার। এম.কম. পরীক্ষা সামনের বছর দেবেই। অফিসে পরিশ্রমী হিসাবে সুনাম অর্জন করেছে। দ্বারিকের বারো বছর বয়সে মা এবং ষোলো বছরে বাবা মারা যায়। দুই দাদার যৌথ সংসারে সে এখন মাসিক হাজার টাকার সদস্য। দোতলার রাস্তার দিকের ছোটো ঘরটি তার ফলে সম্পূর্ণই তার একার। পঞ্চাশ হাজার টাকার জীবনবিমা করেছে সে। ব্যাঙ্কে প্রতি মাসে দু’হাজার টাকা জমা দেয়। প্রতিদিন জমা খরচের হিসাব লেখে, রাত্রে শোবার আগে। প্রতি রবিবার কাগজে জমিবাড়ি-সম্পত্তির বিজ্ঞাপনগুলি খুঁটিয়ে পড়ে। কলকাতার আশেপাশে চার-পাঁচ কাঠা জমি কিনে রাখার ইচ্ছা সম্প্রতি তার হয়েছে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
