কয়েকদিন পর হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়েই বাসু ছুটত। তারপর চুপিসারে সিট ধরা হাতটাও ছেড়ে দিত মাঝে মাঝে। অনন্ত যখন ব্যাপারটা বুঝত অমনি হাত কেঁপে বেটাল হয়ে পড়ে যেত। বাসু সামনের উঁচু দাঁত দুটো বার করে হাসত, ”অমন টুকটুকে গতর নিয়ে কী আর সাইকেল শেখা হয়রে ব্যাটা। এবার আমায় দে দেখি।” বলেই তড়াক করে সাইকেলে উঠে পাঁই পাঁই চালিয়ে উধাও হয়ে যেত বাসুদেব। ওদের চুক্তিই ছিল, প্রথম আধঘণ্টা অনন্ত সাইকেল শিখবে, শেষ আধঘণ্টা বাসুদেবের। ভাড়ার পয়সা অবশ্য অনন্তের। বাসু আধঘণ্টায় ধর্মতলা কী শেয়ালদা কী কাশিপুর ঘুরে আসত। সেন্ট্রাল অ্যাভিনু তখন কয়েক বছর মাত্র তৈরি হয়েছে। এত মোটর, ট্রাক, মানুষজনের ভিড় তখন ছিল না।
একদিন বাসুদেব ফিরল পিছনের মাডগার্ডটা তুবড়ে। সাইকেলটা অনন্তের হাতে গছিয়ে দিয়েই বাসুদেব সটকে পড়ে। ভুবন দেখামাত্র আট আনা ফাইন চেয়ে বসে এবং না পেলে অনন্তর ঠাকুর্দার কাছ থেকে আদায় করে আনবে বলে হুমকি দেয়। পূর্ণচন্দ্রের বয়স তখন ঊনসত্তর। বদরাগী, রাশভারী। কয়েকদিন আগেই চার টাকার বদলে সাড়ে চার টাকার গামছা কেনার জন্য লাঠি হাতে দুই সন্তানের পিতা গৌরচন্দ্রের দিকে তেড়ে গিয়ে বলেছিল, ”রক্ত জল করা পয়সা আমার, আর বাবুয়ানি করে ফুঁকে দেওয়া হচ্ছে?” এমন লোকের কাছে আট আনা এবং পৌত্রের পিঠের চামড়া সমান বস্তু।
অনন্ত ভয়ে কেঁদে ফেলে। তাই দেখে হঠাৎ নরম হয়ে গেল ভুবনের মন। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে ওকে দোকানের ভিতরে নিয়ে গেল ভুবন। ন-দশ বছরের কুমার বসেছিল দোকানের মধ্যে। তাকে ধমক দিয়ে বার করে দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। অনন্ত যখন বেরিয়ে এল তখন বাসুদেব দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে কুমারের সঙ্গে। অনন্তকে দেখে মিটমিট হেসে বলল, ”ফাইন শোধ হয়ে গেছে তো, ব্যস। এবার থেকে তোর ভাড়ার পয়সাও আর লাগবে না।” শুনে কুমারও হেসে ওঠে।
ওইদিন থেকেই অনন্ত চটতে শুরু করে বাসুদেবের উপর। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারে না। বাসু যদি ব্যাপারটা রটিয়ে দেয়, লজ্জায় মুখ দেখানো যাবে না। তারপর পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে। ভুবন মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানও উঠে যায়। কুমার এখন দু’শো টাকা ফি-এর উকিল। ওকে দেখলেই অনন্তর মনে পড়ে, দোকান থেকে বেরোবার আগে কেমন অদ্ভুতভাবে ও তাকিয়েছিল তাদের দুজনের দিকে আর হেসেছিল। নিশ্চয় বুঝেছিল ব্যাপারটা। এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে আর ভেতরে দুঃসহ জ্বালা বোধ করে অনন্ত। ইলেকশনে দাঁড়িয়ে কুমারকে হারিয়ে দিতে পারলে বোধহয় কিছুটা সান্ত্বনা পাওয়া যেতে পারে-এই চিন্তা তখন জেঁকে বসে।
কিন্তু কুমার তাকে যথোচিত সমীহ ও সম্ভ্রম দেখায়। কুমারের নির্দেশে, তার সদর দরজার মাথায়ই রাস্তার আলো লাগানো হয়েছে। তাই নিয়ে বাসুদেব গণ-দরখাস্ত সংগ্রহ করে প্রতিবাদ পাঠিয়েছিল কমিশনারের কাছে। টিউবওয়েলও বসেছে অনন্তর বাড়ির লাগোয়া।
”কর্পোরেশন কি কারুর বাপের সম্পত্তি।” টিউবওয়েল বসাবার সময় বাসুদেব চিৎকার করেছিল পাড়ায় দু-তিনজনকে দাঁড় করিয়ে। ”দেখুন, কোথায় বসানো হচ্ছে দেখুন। এখানে টিউবওয়েল বসলে পাড়ার একটা বাড়ি ছাড়া আর কার লাভ হবে, বলতে পারেন? সকলের বেনিফিটের কথাটা ভাবুন একবার। আমরা কি ট্যাকসো দিই না? ধরুন, হঠাৎ কারুর রান্নার জল ফুরিয়ে গেল, বাড়িতেও তখন কোনো পুরুষ কি ছোটো ছেলেপুলে নেই যে দৌড়ে এক বালতি জল এনে দেয়। এমন অবস্থা হতে তো পারে? বলুন, আপনারই বলুন, তখন কি বাড়ির মেয়েরা এত দূরে এসে কল থেকে পাম্প করে জল নিয়ে যাবে? যুবতী মেয়েও তো অনেক বাড়িতে রয়েছে, তারা কি এখানে আসবে জল নিতে?”
বাসুদেবের কথা শুনে একজন বললে, ”পাড়ার আরও ভেতর দিকে বসলেই ভালো হত, বেপাড়ার লোক এসে দিনরাত জল নিয়ে নিয়ে কলটা খারাপ করে দিতে পারবে না।”
আর একজন বলল, ”ভিতরের বসাবার স্থান কোথায়! কল বসলে রিকশাও আর যাইতে পারবো না। এখানে রাস্তাটা চওড়া, ঠিকই বসানো হচ্ছে। রাত্রদিন খ্যাচাং খ্যাচাং শব্দ আর জলকাদায় রাস্তা মাখামাখি হয়ে তো থাকব, বরং বাইরের দিকেই বসানো ভালো। পিপাসা পাইলি বাইরের লোক এসে খ্যায়া যেতে পারবো।”
”দেখুন মশাই, আপনাদের মাথায় মেয়েদের প্রেস্টিজ জিনিসটা একদমই আসে না। আপনাদের মেয়েরা যেটা অনায়াসে পারে, ওয়েস্ট বেঙ্গলের মেয়েদের সেটা করতে বাধে। টিউয়েলটা এখানে বসানো কেন উচিত নয়, সেটা অন্য পয়েন্ট থেকে দেখছি আমরা, আপনি আর কথা বলতে আসবেন না।” বাসুদেব এক বেঁটেখাটো নিরীহদর্শন লোকের নাকের কাছে ঘন ঘন হাত নাড়ল চপেটাঘাতের ভঙ্গিতে। এরপর দেখা গেল পাড়ার এক-চতুর্থাংশ বাসুদেবের বিরুদ্ধে চলে গেছে এবং টিউবওয়েলও অনন্তের সদরের পাশেই বসেছে।
প্রথম জল নেয় সত্যচরণ। টিউবওয়েলকে স্নান করিয়ে চারপাশের তিন হাত পর্যন্ত রাস্তা জল দিয়ে ধুয়ে বালতি পাতার আগে সে চেঁচিয়ে বলেছিল, ”যুবতী মেয়েদের জন্য ভেবে ভেবে তো আমাশা হয়ে গেল ব্যাটার। নিজের মেয়ের কী হল সেটা খোঁজ কর আগে।”
বাসুদেব কথাগুলো স্বকর্ণে শোনেনি। গল্পচ্ছলে শেফালি বলে আসে বাসুর বউকে এবং সত্যচরণ দোতলার পিছন দিকে লুকিয়ে একটা পায়খানা করেছে সে তথ্যও জানিয়ে দিল। বাসুদেব দ্রুত কর্পোরেশনে বেনামা চিঠি দিয়ে সত্যচরণের একশো টাকা খসিয়ে দেয়। রাগটা তাতে অনেকখানি কমে।
