জয়রাম মিত্র লেনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে হলে মুখটাকে তুলতে হয় যতক্ষণ না ঘাড়ে টান পড়ে। সূর্যকিরণ একমাত্র গ্রীষ্মে ছাড়া রাস্তা স্পর্শ করতে পারে না। সারা বছর স্যাঁতস্যাঁতে, ভ্যাপসা গন্ধ গলিতে অনড় হয়ে থাকে। নতুন মানুষরা ঢুকলেই অনুভব করে, দেড়শো বছরের বন্ধ সিন্দুকের ডালা যেন খুলে গেল। তারা কৌতূহলে এপাশ-ওপাশ তাকাতে তাকাতে পথ চলে। পাড়ার বৃদ্ধদের সন্দিগ্ধ চোখ দেখে দ্রুত হয়ে যায়।
অনন্ত সিংহের মেয়ে পুতুল ষোলোয় পড়েছে! দুবছর আগে, ক্লাস সিক্সে ওঠামাত্র স্কুল ছাড়িয়ে ওকে সংসারের কাজে লাগানো হয় অনন্তের নির্দেশে। সেই সময় থেকে পাত্রের সন্ধান করে করে অবশেষে আহিরিটোলার শীলেদের পঞ্চম পুত্রটির খোঁজ পেয়ে অনন্ত দ্রুত কথা চালিয়ে ব্যাপারটা প্রায় পাকা করে এসেছে। ছেলেটি দু’বার স্কুল ফাইনালে ব্যর্থ হয়ে পৈতৃক হার্ডওয়ার দোকানে বসছে। ত্রিশ হাজার টাকা যৌতুক পেলে আলাদা দোকান করবে বরানগরে। অনন্ত ত্রিশ হাজারকে পনেরো হাজারে এবং দশ ভরি গহনাকে আট ভরিতে নামাতে পেরেছে ছয় মাসে। পাত্রের বাড়ির মেয়েরা পুতুলকে দেখে গেছে। আজ আসবে পাত্র তার দুই বন্ধুকে নিয়ে। মাসখানেক আগে অনন্ত কলি ফিরিয়েছে বাড়ির। দেখলে মনে হয় গলিটার কপালে শ্বেতি হয়েছে।
ঝকঝকে নীল স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডটা যে টিউবওয়েলের ধারে রাখা হয়েছে, সেটি অনন্তর সদর দরজারই লাগোয়া। টিউবওয়েলটি এখানে বসানোর ব্যাপারে ওর সঙ্গে বাসুদেব ধরের প্রচণ্ড একচোট হয়ে গেছল। কুমার চৌধুরী কাউন্সিলর হয়েছে তারই কৃপায়, এরকম একটা ধারণা অনন্ত বরাবরই পোষণ করে আসছে।
পাড়ার প্রাচীন এবং বনেদি বাড়ি হিসাবে সিঙ্গি বাড়ি জয়রাম মিত্র লেনে বিদিত। তিনতলায় গোপীনাথ জীউয়ের বিরাট ঘর। তার মেজে শ্বেতপাথরের। পালা পার্বণে অনন্ত খরচ করে। এখনও পাড়ায় যে তিন-চারটি বাড়িতে বৈঠকখানা আছে, তার মধ্যে বৃহত্তমটি অনন্তের। চারটি নিচু তক্তপোশের উপর শতরঞ্চি পাতা। দেয়ালে পাগড়ি মাথায় ওর ঠার্কুদা পূর্ণচন্দ্র এবং তার ভাই নারায়ণচন্দ্রের তেলরঙা প্রতিকৃতি। ধুলায় বিবর্ণ। এক বাণ্ডিল কোম্পানির কাগজ এবং চারটি বাড়ি দিয়ে যায় পুত্র গৌরচন্দ্রকে। বছর দশেকের মধ্যে তার অর্ধেক ফুঁকে দিয়ে যৌনব্যাধিতে ভুগে দুই পুত্র অনন্ত ও দুলালকে রেখে গৌরচন্দ্র মারা যায়। বাবা মারা যাবার আট মাসের মধ্যেই সম্পত্তি ভাগ করে অনন্ত ও দুলাল আলাদা হয়ে যায়।
তেইশ নম্বরের ভিতরের অংশে থাকে দুলাল। পিতার দোষগুলি সে পূর্ণ মাত্রায় আয়ত্ত করে দুখানি বাড়িই বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সন্ধ্যা থেকেই দিশি মদের দোকানে বসে থাকে। অপরপক্ষে, অনন্ত পৈতৃক সম্পত্তি পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করে, নিজে একটি বাড়ি কিনেছে, শেয়ার বাজারে দালালি থেকে অর্জিত অর্থ, তিনটি বাড়ির ও চারটি রিকশার ভাড়া এবং তেজারতি ও বন্ধকি কারবার থেকে মাসে তার যা আয়, তাতে জয়রাম মিত্র লেনের মধ্যে ধনী হিসাবেও সে খাতির পেয়ে থাকে।
কাজেই ইলেকশনের সময় কুমার চৌধুরী এ পাড়ায় প্রথম অনন্তর কাছেই এসেছিল। ওকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ার প্রতি বাড়িতে যায়। শুধু ছাব্বিশ নম্বর বাড়িটি ছাড়া। বাসুদেব ওর বাল্যবন্ধু কিন্তু বাক্যালাপ বন্ধ যৌবন থেকেই। কুমার সতেরো ভোটে জিতেছিল। বৈঠকখানায় তাকিয়া কোলে নিয়ে দুলতে দুলতে অনন্ত বলেছিল, ”আমি না বেরোলে ওই সতেরোটা ভোট পেত কি?”
তাই শুনে সত্যচরণের চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। বিস্ময় দমন করে এক সময় বলতে পারল সে, ”সিঙ্গিমশাই যার হয়ে নিজে ক্যানভাস করছেন, সে জিতবে না তো কে জিতবে! এগেনস্টে নেহরু দাঁড়ালেও যে হেরে যাবে। সামনের বার আপনিই বরং দাঁড়ান, কমপক্ষে দু’হাজার ভোটের মার্জিনে জিতবেন।”
অনন্ত অপ্রতিভ হয়ে বলে, ”না না, এসব ঝামেলায় আমি যেতে চাই না। পাবলিক ওয়ার্ক বড়ো কঠিন কাজ সত্য, বড়ো কঠিন কাজ। ভালো করলেও ব্যাটা চোর, খারাপ করলেও ব্যাটা চোর। এ হচ্ছে শাঁখের করাত।”
কিন্তু শাঁখের করাত, অনন্তর মনের মধ্যে তারপর থেকে প্রতিদিনই একটি কথা কেটে চলেছে-”কমপক্ষে দু’হাজার ভোটের মার্জিনে জিতবেন।” পাড়ায় পাড়ায় কুমারের খাতির, বৈঠকখানা ভর্তি অনুগ্রহপ্রার্থীদের দেখে মাঝে মাঝে লোভ হয় অনন্তের। নিজের পাড়ার বাইরে কেউ তাকে চেনে না, পাত্তাও দেয় না। ইদানীং সেটা বেশি করে সে বুঝেছে। গত বছর সার্বজনীন পুজোর জেনারেল মিটিংয়ে সত্যচরণ সহ-সভাপতি পদে অনন্তর নাম প্রস্তাব করেছিল। বাসুদেব বানচাল করে বেপাড়ার এক আগরওয়ালার নাম ভোটে পাশ করিয়ে নেয়।
তাছাড়া আর একটি কারণ অনন্তর অবচেতনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে, যেটা সে কোনোক্রমেই তুলে ফেলতে পারেনি। কুমার চৌধুরীর বাবা ভুবনের ছিল সাইকেল সারাই ও ভাড়ার দোকান। স্কুল পালিয়ে অনন্ত এক আনা ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া নিয়ে সাইকেল চালানো শিখত। সহায়ক ছিল বাসুদেব। অনন্ত সাইকেলে বসত, এক হাতে সিট আর অন্য হাতে হ্যান্ডেল ধরে বাসু নির্দেশ দিতে দিতে ছুটত-”চাকার দিকে তাকাচ্ছিস কেন? ম্যাড়া কোথাকার, সামনে তাকা…..ব্রেক কর গাধা, ব্রেক কর…আরে রাঙামূলো বেলটা আছে কী করতে, বাজা, বাজা।”
