”বলো”। ধীর মৃদু হবার চেষ্টা করল হিরণ্ময়।
”আমাকে আর তুমি ভালোবাসবে না নিশ্চয়।”
”কেন!”
”ক্ষতি করলাম।”
”আগের থেকেও এখন বেশি ভালোবাসব।”
আভার মুখের উপর বিস্ময়ের ছায়া পড়ল। বোধহয় বিশ্বাস করছে না। হিরণ্ময় মমতা বোধ করল ওর জন্য। পোস্ট-মর্টেম থেকে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই জানা যাবে। সবাই তখন বুঝবে এটা আত্মহত্যা। কিন্তু এজন্য কে দায়ী সেটা জানা যাবে না। তাকে ধরা যাবে না। হিরণ্ময় টের পেল, তার মনের কোথাও যেন একটুখানি স্বস্তি দানা বাঁধল। তাইতে সে এই বলে নিজেকে বোঝাল-আর পাঁচজনের মতো তাহলে আমিও নিরাপদে বাঁচতে চাই! সব মানুষের মধ্যেই জানোয়ার আছে, আমিও বাদ নই।
তাহলে গুলি খাবার জন্য রাস্তায় বেরোই কেন? হিরণ্ময় পরমুহূর্তেই এলোমেলো হতে শুরু করল। মরতে চাওয়া এবং বাঁচার ইচ্ছার মধ্যে কোনটি খাঁটি। শোভা একটা সরল অঙ্কের ছকের মধ্যে এসে গেছে। ধাপে ধাপে নেমে যাবে নির্ভুলভাবে। স্বাভাবিক একটা গেরস্ত উত্তরও পাওয়া যাবে। উত্তরমালা খুলে শুধু মিলিয়ে নেওয়া। আভা অন্য কিছু। ওর অঙ্কটাই প্রশ্নমালায় নেই। পাঁচজনের মতো নিরাপদে বা জানোয়ার-বোধ দিয়ে এ অঙ্কের উত্তর মেলানো যায় না। সারাজীবনই কষে যেতে হবে শুধু। হঠাৎ এমন এক উটকো অঙ্কে কেন হাত দিলাম।
সব মিলিয়ে হিরণ্ময় যখন একটা ফর্মূলা তৈরি করার চেষ্টা করছে তখন আভা বলল, ”দিদি আপনাকে খুব ভালোবাসে।”
”জানি।”
”যদি জানতে পারে?”
”জানবে। আমিই ওকে সব বলব।”
”সে কি!” আভা দ্রুত কাছে এল হিরণ্ময়ের। ”না, কিছুতেই না। তাহলে দিদিকে আমি জ্যান্ত মুখ দেখাতে পারব না।”
মাত্র এক হাত উপরে ঝুঁকে রয়েছে মুখটা। হাত বাড়িয়ে কপাল, গাল অথবা চিবুক স্পর্শ করা যায়। হিরণ্ময়ের মনে হল, আর বোধহয় নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। আভাকে বুকের উপর চেপে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠবে কিংবা টানতে টানতে ছাদের পাঁচিলের কিনারে নিয়ে যাবে ঠেলে ফেলে দেবার জন্য।
”বড্ড ছেলেমানুষ তুমি আভা। এভাবে ব্যাপারটার সমাধান হয় না। আত্মহত্যা আমিও তো করতে পারি। কিন্তু তাতে অপমানের হাত এড়াতে পারব মাত্র। কেউ হয়তো বড়োজোর বলবে, লোকটার প্রবল আত্মমর্যাদা বোধ ছিল। তুমিও বোধহয় আমার প্রতি আনুগত্য দেখাতে কিছু একটা করে বসবে। কিন্তু এসব করার জন্যেই কি আমরা ভালোবেসেছি?”
”আমি যদি মুখ ফুটে না জানাতাম, হিরণ্ময়, তোমায় আমি ভালোবাসি, তাহলে ব্যাপারটা এই পর্যন্ত গড়াত না।” কথাগুলো আভা কাঁপা গলায় বলল। হিরণ্ময়ের নাম উচ্চচারণের সময় ওর ভিতরটা প্রতিবারই নড়ে ওঠে।
”একটা কিছুতে গড়াত।” হিরণ্ময় আনমনা হয়ে গেল সামান্য। যেভাবে ক্লাসে চাহিদা ও জোগান তত্ত্ব বোঝায়, সেই ক্লান্ত স্বরে থেমে থেমে বলল, ”একটা কিছু ঘটাবার জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু বুঝছি না, কেন আমি তা চাই। বাঁচার জন্য না মরার জন্য, সেটা বুঝছি না।”
রাস্তায় জানলার কাছে টিপুর গলা শোনা গেল। সদর দরজায় খিল দেওয়া। কড়া নাড়ার শব্দ হল। ঠাকুর রান্নাঘর থেকে গিয়ে খিল খুলে দিল। টিপু বাড়ি ঢুকতে চাইছে না। শোভার ধমক শোনা গেল সদরের দরজায়।
আভা ফ্যাকাশে মুখে হিরণ্ময়ের দিকে তাকাল। ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাবার আগে চাপা স্বরে শুধু বলল, ”আমি তোমাকে মরে যেতে দেব না।”
হালকা চটির শব্দ ঘরের দরজা পর্যন্ত এসে থেমে রইল। শোভা এসেছে। হিরণ্ময় প্রাণপণে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করতে করতে বলল, ”কী ব্যাপার দাঁড়িয়ে রইলে!”
”আসব?”
”তার মানে!”
হিরণ্ময় সত্যিই অবাক হল এবং সেই সঙ্গে বুঝতে পারল স্নায়ুগুলো, হঠাৎ প্রখর আলোয় ধাঁধানো চোখের মতো অনুভবরহিত হয়ে পড়েছে। শোভা কি জানতে পেরেছে? জানার পর লক্ষ করে যাচ্ছে? নিশ্চয় তুমুল একটা কিছু করবার জন্য তৈরি হচ্ছে। বিশ্রী কুৎসিত একটা নাটক। রাস্তার জানলায় দর্শক জমবে, মনে মনে তারা হাততালি দিতে দিতে এনকোর এনকোর বলবে। দৃশ্যটি চকিতে ভেসে উঠল হিরণ্ময়ের চোখে। নিজেকে সে বলল, তার আগে আমিই ওকে সব জানাব। ওকে চিৎকার করার সুযোগ দেব না। ওকে বলব, কেন আমি আভার সর্বনাশ করেছি।
চোয়াল কঠিন করে হিরণ্ময় বলল, ”ভেতরে এসো, তোমাকে একটা খবর দেব।”
”সে খবরটা আমিও জানি!” পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল শোভার মুখ। ”রাস্তায় বেশ ভিড় জমে গেছে। আশ্চর্য, ওই টিচারের বাড়িতে আসবে ভাবতেই পারিনি। আভা কোথায়, ওর তো ফেবারিট হিরো।”
তিন
জয়রাম মিত্র লেনের এক থেকে ত্রিশ নম্বর পর্যন্ত চুয়াত্তরটি বাড়ির রঙই পাণ্ডুর, কলিচটা। প্রায় দুশোটি উনুনে আঁচ পড়ে প্রতি ভোরে। অধিকাংশ বাড়ির পলেস্তারা খসে জিরজিরে ইঁট বেরিয়ে পড়েছে। এই গলিতে ভোটার সংখ্যা সাতশো, খবরের কাগজ রাখে বত্রিশটি, বছরে বিয়ে হয় গড়ে তিনটি, শ্রাদ্ধ তিনটি, অন্নপ্রাশনও তিনটি। সাতটি আস্তাকুঁড়ে, একটি টিউবওয়েল, রাস্তার আটটি ইলেকট্রিক বাতি, একটি খাটাল, একটি পাঠশালা, গুটি পঞ্চাশ রেডিয়োর শব্দ এবং কমপক্ষে পঞ্চাশটি শিশুর চিৎকার জয়রাম মিত্র লেন দিয়ে হেঁটে গেলে চোখে বা কানে আসবে।
তারক কবিরাজ স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে গলির দিকে তাকালেই চোখে পড়বে তিন নম্বর বাড়ির ছাদে ভাঙা-ট্যাঙ্কের পাশে অশ্বত্থ গাছটাকে। ওটা বাড়তে চাইলেই ও-বাড়ির ভাঁড়ু বা হাবু লাঠি-পেটা করে ডালগুলো ভেঙে দেয়। ফলে গাছটা বাড়তে না পেরে ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে। শিকড়ের ঝুড়ি নেমেছে দোতলা পর্যন্ত। বৃষ্টি জলের পাইপগুলো রাস্তা পর্যন্ত নামানো, কিন্তু ছেলেদের বলখেলার ধকল সইতে না পেরে সবকটিরই তলার অংশ ভাঙা। বহু বাড়ির জানলার পাল্লা লটপটে বুক পকেটের থেকেও অর্থহীন-ঝড়, বৃষ্টি, রোদে সামাল দিতে পারে না।
