”না, হিমাংশুর কাছ থেকে এরকম ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া যায় না। ও আমাকে শ্রদ্ধা করে খুব।”
”তাহলে?” ভয় এবং যন্ত্রণা, একসঙ্গে আভার মুখের চামড়া টেনে ধরল। লাল ঢাকনা মোড়া টেবিল ল্যাম্পের আলো থুতনির নীচে গাঢ় অন্ধকার তৈরি করে মুখটাকে কঠিন করে দিয়েছে। হিরণ্ময়ের মনে হল, মেয়েটি মোটেই যেন আবেগপ্রবণ নয়।
”তাহলে আর কি।” বুদ্ধের মাথাটি বুক-সেলফের উপর যত্ন ভরে বসিয়ে দিয়ে হিরণ্ময় লক্ষ করতে লাগল।
”যখন সবাই জানবে, দিদি জানবে? তখন আপনার কি হবে?”
”কিছু একটা নিশ্চয় হবে, সেটা এখনও জানি না।”
”আমি তো হতে দেব না।”
”কীভাবে?”
”চলে যাব এখান থেকে।”
”কোথায়, বাবা-মার কাছে?”
”জানি না কোথায় যাব। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রেনে কাটা পড়ার কী ছাদ থেকে ঝাঁপ দেবার পথ তো খোলাই আছে।”
”আমিও তাই করব।’
শোনামাত্র আভা নিজের মুখগহ্বর তালু দিয়ে বদ্ধ করে দিল। তবু একটা ক্ষীণ শব্দ হিরণ্ময় শুনতে পেল।
”না, লক্ষ্মীটি না। এমন চিন্তা কোরো না।” আভা টেবিলে অনেকখানি ঝুঁকে বলল।
হিরণ্ময় হেসে উঠল নিঃশব্দে।
”বিবাহিতদের এমন চিন্তা করারও অধিকার নেই। তাহলে স্ত্রী-পুত্রের কী দশা হবে, তাই না?”
এরপর আভা মুখ নিচু করে দু’ হাতে টেবিলে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করল। হিরণ্ময় উঠে দাঁড়াবার আগেই সে হাঁটু গেড়ে বসে টেবিলের পায়া জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠল বিকৃত স্বরে।
”আমি শত্রুতা করেছি নিজের দিদির সঙ্গে। আমি জানি, দিদির সর্বনাশ করেছি, আমার জন্যই ছারখার হল এ সংসার। আমি মুখ দেখাতে পারব না আর।”
”ওঠো, ওঠো। এটা বাইরের ঘর। রাস্তা থেকে কেউ দেখে ফেলতে পারে, ওঠো।” বিরক্তি চাপার চেষ্টা করতে করতে হিরণ্ময় ধমক দিল।
আভা টেবিলের পায়ায় মাথা ঘষতে শুরু করেছে একগুঁয়ের মতো। হিরণ্ময় জানলার পাল্লাগুলো বন্ধ করে এসে বলল, ”ও ঘরে চলো।”
”আমার জন্য তোমারও মান-মর্যাদা রইল না।”
”আগে উঠে দাঁড়াও।” তীব্রস্বরে হিরণ্ময় বলল। এইবার সে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
আভা গ্রাহ্যে আনল না সে তীব্রতা। ”কিন্তু আমি কিছুতেই নষ্ট হতে দেব না তোমার সম্মান। আমি দুঃখ দেব না দিদিকে।”
হিরণ্ময় নিচু হয়ে আভাকে টেনে তোলার চেষ্টা করল। এবং পারল না। দেহে যে পরিমাণ শক্তি থাকলে এ কাজে সফল হওয়া সম্ভব, তা নেই বুঝতে পেরে একটা হিংস্র রাগে তাকে পেয়ে বসল। বগলের নিচ দিয়ে আভাকে দু’ হাতে জড়িয়ে সে আবার টানল ওকে দাঁড় করাবার জন্য। কুঁজো হয়ে টেবিলের পায়া আঁকড়ে আভা শরীরটাকে শক্ত করে রেখেছে।
”ওঠো, ওঠো বলছি।” আভার কানের কাছে মুখ রেখে হিরণ্ময় অক্ষম রাগে চাপা চিৎকার করল। আবার ওকে টেনে তোলার জন্য সে নিজেকে ধনুকের মতো বাঁকাল। দম বন্ধ করে, আভাকে দু’ হাতে বেড় দিয়ে সোজা হয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করে এবারও পারল না। আভাও হাঁফাচ্ছে। দশটা আঙুলকে বেঁকিয়ে থাবার মতো করে হিরণ্ময় ওর বুকের কোমল মাংসে বসিয়ে উপড়ে ফেলার জন্য টেনে ধরল। সারা শরীর অন্ধ জেদে টনটন করছে। নিশ্বাস ফেলে আবার বুক ভরে নিল। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু একটিই কথা-ভাঙব, ওর অবাধ্যতা আমি ভাঙবই। ধীরে ধীরে সে মোচড়াতে শুরু করল তার থাবা দুটো। একটু একটু করে আভার মুখ ঊর্ধ্বমুখী হল। যন্ত্রণায় ঠোঁট দুটি ফাঁক হয়ে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। তারপর জিভ দেখা গেল। গলার দুটো পেশি দড়ির মতো পাকিয়ে উঠল আর চোখের কোল বেয়ে জল কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে নামল। এবং আরও জোরে সে আঁকড়ে ধরল টেবিলের পায়াটা।
হিরণ্ময় ওকে ছেড়ে দিয়ে সিধে হয়ে দাঁড়াল। কপালে চিটচিটে ঘাম ফুটেছে। দপদপ করছে রগের শিরা দুটো। নিজেকে তার মনে হচ্ছে অক্ষম, দুর্বল, পরাভূত। শুধুমাত্র গায়ের জোরে আভা তাকে অগ্রাহ্য করতে পারল। আভা টেবিলের পায়ায় কপাল ঠেকিয়ে কাঁদছে। টেবিল ল্যাম্পের চাপা আলোয় ওকে দেখতে দেখতে হিরণ্ময়ের মনে হল একটা কুকুর টেবিলের পায়া ধরে দাঁড়িয়ে কুঁই কুঁই করছে।
নিজের উপর সে হঠাৎ রেগে উঠল। বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে শোবার ঘরে এসে, চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল খাটে। আলো থেকে চোখ আড়াল করতে ডানবাহু চোখের উপর রাখল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, সম্মান, মর্যাদা, দুঃখ! আশ্চর্য নির্বোধ! আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখাতে ট্রেনে কাটা পড়বে! যদি বলি এই মুহূর্তে ছাদ থেকে ঝাঁপ দাও, নিশ্চয় দেবে। পাড়ার লোকগুলো অমনি পিলপিল করে পিঁপড়ের মতো এসে ওকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াবে। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ঘাড়গুলো শুঁড়ের মতো নাড়াবে। আর আভার থেঁতলানো দেহ থেকে ছিটকানো রক্ত এত লাল কেন তাই নিয়ে বলাবলি করবে। আভা মরার আগে ওদের শুনিয়ে স্বীকারোক্তি দেবে-পাঁচিলে ঝুঁকতে গিয়ে ভার সামলাতে পারিনি। তারপর পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্স আসবে। হাসপাতালে পোস্ট-মর্টেম করা হবে এবং তখন জানা যাবে-”ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসো।”
আভা পর্দা সরিয়ে ঘরের ভিতর এল। হিরণ্ময় আপাদমস্তক দেখল ওকে। শোভার থেকে আট বছরের ছোটো। একই উচ্চচতা, একই গড়ন, একই রঙ দুজনের। শুধু আলাদা হয়ে যায় চুম্বনের সময়, চাহনিতে, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষেপণে, দেহের তাপে।
”আমাকে-” আভা দ্বিধায় থেমে রইল। কিছু চুল ওর গালে লেপটে রয়েছে। ব্লাউজটা কুঁকড়ে কোমর থেকে উঠে গেছে খানিকটা। চওড়া কাঁধ যেন ঝুলে পড়েছে। ওকে দেখাচ্ছে ভগ্নস্তূপের মতো।
