এরপর অসীমের ইচ্ছা হল, খবরটা আভাকে দেয়। তিরিশের একের বাড়ির একতলার ঘরগুলির জানলায় গাঢ় খয়েরি পর্দা। পিছনে এবং উপরে তাকিয়ে, দেয়াল ঘেঁষে আস্তে চলতে চলতে অসীম তৃতীয় জানলায় একবার থমকে, পর্দার কিনারের ফাঁক দিয়ে ভিতরে তাকাল। দেখল আভা টেবিলটার ধারে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে। চেয়ারে বসা হিরণ্ময় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। ঘরে টেবিল ল্যাম্পের চাপা আলো।
দুই
”তোমার দিদি জানে?”
”না।”
”কোথায় গেছে?”
”বলে যায়নি, টিপুকে নিয়ে বেরিয়েছে। বোধহয় দর্জির দোকানে।”
হিরণ্ময় চুলের মধ্যে আঙুল ঢোকাল। মুঠোয় চেপে চুল টানল। অভ্যাসমতো আঙুলগুলো চোখের সামনে ধরে দেখল কটা চুল উঠেছে। কয়েকটা ফুঁ দিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। অ্যাশ-ট্রের উপর রাখা সিগারেট থেকে ধোঁয়া উঠছে পেনসিলের মতো সরু হয়ে। হিরণ্ময় তাকাল আভার দিকে। ধোঁয়ার স্তম্ভটি পাতলা হয়ে ভেঙে যাওয়ার জায়গাটিতে স্থির চোখে তাকিয়ে ও। হিরণ্ময় সিগারেটটা তুলে ঠোঁটে রাখল।
”তাহলে?” হিরণ্ময় বলল।
আভা ওর মুখ থেকে চোখ সরিয়ে বুক-কেসের দিকে তাকাল। অর্থনীতির লেকচারারের পড়ার ঘর। বই আর পত্রিকা ইতস্তত ছড়ানো। বুক-কেসের উপর ব্রোঞ্জের বুদ্ধের মাথা। ধুলোয় কালো হয়ে রয়েছে। তার পাশে একটি মাটির ফুলদানি। ফুল নেই। সরকারি এক কারুশিল্প বিপণি থেকে শোভা বছরখানেক আগে ও দুটো কিনে এনেছিল। প্রথম মাস-দুয়েক মুছত, ফুল রাখত। লম্বা সোফার বিপরীতে একটি ছোটো তক্তপোশ। পাতলা তোশকের উপর ঝালর দেওয়া গাঢ় খয়েরি খদ্দরের চাদর। তাতে পাখি উড়ছে আর তাই দেখার ব্যস্ত ছেলে কাঁধে এক গ্রাম্য বধূর গুটি ত্রিশ ছাপে ভরা চাদরটি। লিখতে লিখতে বা পড়তে পড়তে ক্লান্ত হলে হিরণ্ময় তাকিয়া টেনে তক্তপোশে শোয়। কখনো বা সোফায় হেলান দিয়ে নিচু ছোট্ট টেবিলটায় পা তুলে দেয়। ছাত্ররা এলে সে চেয়ারে বসে। ওদের সোফায় বসতে বলে।
”এমন যে ঘটবে জানতুম।” হিরণ্ময় চশমাটা হাতে নিয়ে টেবিল ল্যাম্পের আলোর দিকে ধরল। জলের দাগ লেগে আছে। ধুতির খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, ”তোমার কোনো দোষ নেই।” গলাটা সামান্য ধরা। কথা বলল চাপা গম্ভীর স্বরে। সাধারণত উত্তেজিত হলে ওর স্বর সরু হয়ে যায়।
”কেন, দোষ নেই কেন?” আভা যেন তর্ক করতে চায়। কিন্তু ভঙ্গিটা উৎকণ্ঠার।
”কীসের দোষ তোমার?” চশমাটা চোখে এঁটে স্পষ্ট করে হিরণ্ময় তাকাল।
আভা উত্তর দেবার জন্য কথা খুঁজছে। টেবিলের ধারে দাঁড়িয়েছে বলে হিরণ্ময় ওর নাভি থেকে ঊর্ধ্বাংশটুকু শুধু দেখতে পাচ্ছে। ভয়েলের ছাপা শাড়ির পাড় নেই। নাভির উপরটা সামান্য উঁচু হয়ে রয়েছে কাপড়ের কুচির জন্য। আঁচলের কিনারে কোমরের মসৃণ তেলতেলা চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। ভাঁটার সময় গঙ্গার পাড়ে যেমন ফেলে যাওয়া পলিতে ভাঁজ দেখা যায়। অমন ভাঁজ ওর গ্রীবাতেও দেখা যায়, যখন মুখটা ফিরিয়ে বা ঘাড় কাত করে থাকে। আভা বেশ লম্বা, বাঙালি মেয়েদের তুলনায়। কাঁধ দুটি পুরুষালি ঢঙে প্রশস্ত। ব্লাউজের গলার ঘের কাঁধের প্রান্তে এসে ঠেকেছে, পিঠে শিরদাঁড়ার চতুর্থ গ্রন্থিটিও দেখা যাবে যদি পিছন ফেরে। হাঁটলে, পুরুষমাত্রেই ওর নিতম্বে চোখ রাখতে বাধ্য হয়। ওর স্বাস্থ্যের দৃঢ়তা বিষয়ে যাবতীয় অনুমান দর্শকরা এইখান থেকে করতে শুরু করে এবং গলা পর্যন্ত পৌঁছে অভ্রান্তই প্রমাণিত হয়। কিন্তু ওর থুতনি চাপা, গালের হনু উঁচু, ঠোঁট দুটি পুরু, মুখ গোলাকৃতি। চোখ দুটি বড়ো হওয়ায় মাত্রা-হারানো ভাব সারা মুখে।
”দোষ আমার, যেহেতু আমি বিবাহিত। স্ত্রী ছাড়া অপর কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি আকর্ষণ বোধ করার অধিকার আমার নেই। হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন অপরাধ, দেহ স্পর্শ করা পাপ। অথচ তিনটি অন্যায়ই আমি করেছি। সুতরাং আমি দোষী নয়তো কী?”
হিরণ্ময় থেমে থেমে এমনভাবে বলল, যেন ক্লাশের ছেলেমেয়েদের নোট দিচ্ছে-লিখে নিতে অসুবিধা না হয়।
”ভালো কথা, তুমি কি সিওর যে-” হিরণ্ময় অসমাপ্ত রাখল।
”হবার তারিখ ছিল ফিফথ।” আভা ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে হিরণ্ময়ও। সমুদ্রতীরে জেলে-ডিঙি, ঝাউবন এবং আবছা কয়েকটা মূর্তি ক্যালেন্ডারে। দিন গুণতে গুণতে মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল হিরণ্ময়ের মুখ।
”আজ টোয়েন্টি ফিফথ, এতদিন বলোনি কেন?”
”ভেবেছিলাম-” আভা মাথা নামিয়ে রাখল।
”কী ভেবেছিলে?”
”এমন তো আগেও হয়েছে দু-একবার। ছ’দিন, সাতদিন পর্যন্তও দেরি হয়েছে।” আভা ফিস ফিস করে বলল। ডান হাতে টেবিলের প্রান্ত আঁকড়ে ঈষৎ নুয়ে পড়েছে। আঙুলগুলোয় উত্তেজনার প্রবাহ স্পষ্টই দেখতে পেল হিরণ্ময়। ”আচ্ছা, আপনার যে একজন ডাক্তার বন্ধু আছে, সে তো ব্যবস্থা করে দিতে পারে!”
আভা উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে। কথাটির প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটা আদ্যপ্রান্ত সে দেখতে চায়। আভাকে তার মনোভাব বুঝতে না দেবার জন্য হাত বাড়িয়ে হিরণ্ময় বুদ্ধ-মস্তকটি তুলে নিল। হিমাংশুকে বললে ব্যবস্থা করে দেবে। একটা করুণ, শোচনীয়, বিয়োগান্ত গল্প বানিয়ে বললেই হবে। হিমাংশু আর্ত-আতুরকে সেবার সুযোগ পেলে ছাড়ে না।
কিন্তু আমি তো জানতামই। আমি তো বহুদিন আগে, একমাস, ছ’মাস, এক বছর আগে থেকেই জানতাম কিছু একটা ঘটবে। হিরণ্ময় বুদ্ধের মাথার ধুলো তর্জনী দ্বারা মুছতে মুছতে ভাবল। তোমার কোনো দোষ নেই আভা। আমি অপেক্ষা করেছি বহুদিন কিছু একটা ঘটাবার জন্য। কারণ আমি হাঁফিয়ে পড়েছি। আমি বদল চাইছিলাম এই নিত্যদিনের একঘেঁয়েমির থেকে। যখনই কলকাতায় কোনো কারণে পুলিশ গুলি চালায়, আমি রাস্তায় বেরিয়ে যেতাম এই আশায় একটা গুলি যদি গায়ে লাগানো যায়। তাহলে বেঁচে যেতাম রোজ এই চেয়ারে বসে ছাত্র-পাঠ্য বই লেখার দায় থেকে। ও-ঘরের বিছানাটায় শোবার দায় থেকে। ক্লাশে দম দেওয়া পুতুল হওয়ার দায় থেকে। আভা, আমি তৈরিই ছিলাম কিছু একটা ঘটাবার জন্য।
