”হ্যাঁরে ফ্যালা, কাদের বাড়িতে এল রে?”
অসীম উপর দিকে তাকাল। সতেরো নম্বরটা একতলা। ছাদের পাঁচিল নেই। ও বাড়ির সেজোমেয়ে শেফালি, বয়স প্রায় চল্লিশ, সময় পেলেই ছাদের কিনারে এসে বসে থাকে। বিয়ের ছয় মাস পরই স্বামীর ঘর থেকে চলে এসে, শেফালি পনেরো বছর যাবত বাপের বাড়ি রয়েছে। কেন রয়েছে তাই নিয়ে পাড়ায় প্রভূত জল্পনা হয়ে গেছে এক সময়। নতুন ভাড়াটেরা কৌতূহল দেখালে শেফালি একই জবাব দেয়, ”সন্ন্যাস নিয়ে বেরিয়ে গেছেন।” তবে পাড়ার প্রত্যেকেরই ধারণা, শেফালির কর্কশ কণ্ঠস্বর, রোমশ, কঠিন পেশি সম্বলিত দেহে কোমল বক্রতার নিদারুণ অভাব, পুরুষোচিত চলাফেরা, সতেরো বছরের কিশোরের মতো গোঁফ, কুচুটে স্বভাব ইত্যাদির জন্যই স্বামী সংসার ত্যাগ করে বিবাগী হয়ে গেছে। কেউ বলে, মোটেই সন্ন্যাসী হয়নি, আবার বিয়ে করেছে, চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ে, বউ নিয়ে দিব্যি সংসার করছে। বাগবাজারে স্টেশনারি দোকান আছে, বিশ্বাস না হয় যে-কেউ গিয়ে ভজিয়ে আসতে পারে। কিন্তু কেউ ভজিয়ে এসেছে বলে জানা যায়নি।
শেফালির বাবা মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। দাদা এবং তিন ভাই বিবাহিত। সে থাকে রান্নাঘরের পাশের ঘরটিতে। বাড়ির আঠারো জনের রান্না করে যে সময়টুকু পায়, সেটা ব্যবহার করে ছাদের কিনারে বসে আর এবাড়ি-ওবাড়ি করে। শেফালির আনন্দ প্রতি বাড়ি থেকে সংবাদ সংগ্রহে ও বিতরণে। ছাদের কিনার তার পর্যবেক্ষণ-ঘাঁটি। পাড়ার বউ-ঝিরা দুপুরে সাজগোজ করে বেরোলেই ছাদ থেকে অবধারিত প্রশ্ন ঝরবে-”কোথায় গো, সিনেমা?” ছোটো ছেলেমেয়ের হাতে শালপাতার ঠোঙা কী ভাঁড় দেখলে প্রশ্ন হয়-”কে এসেছে রে?”
শেফালি যখন যে বাড়িতে হাজির হয়, সঙ্গে সঙ্গে চালু আলোচনা ধামাচাপা পড়ে। পাশের বাড়ির বউ ইলার শোবার ঘরের জানলাটি শেফালিদের ছাদের লাগোয়া। সন্ধ্যা থেকেই সে জানলা বন্ধ রাখে, যেহেতু গল্পচ্ছলে শেফালি তাকে জানিয়েছে, ”বুঝলে গো, এ পাড়ার সব ঘরেই কোনো-না-কোনো ব্যাপার আছে, শুধু তোমাদের ঘরেই যা নেই।”
শুনেই ইলা বুঝে গেছে, শেফালি নজর রাখছে তার ঘরে এবং একটা ‘ব্যাপার’ আবিষ্কার না করা পর্যন্ত ও স্বস্তি পাবে না। অশোক প্রায়ই রাতে মদ খেয়ে ফেরে। কিন্তু মাতলামো করে না। সে কথা কি আর জানেনা শেফালি, নিশ্চয় জানে। তবু বলেছিল, ”সব ঘরেই আছে, জোর দিয়ে অমন কথা বলবেন না, ঠাকুরঝি।”
”বেশ, তাহলে বলো কোন ঘরে নেই?”
”তা কী করে বলব।” ইলা অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করে ওঠে। কোন ঘরের নাম করলে সেটাকে মোচড় দিয়ে শেফালি কী অর্থ করে পাড়ায় চাউর করবে কে জানে!
”তাহলে! বলতে তো পারলে না।” শেফালি খুশি হয়ে বলল।
ইলা তখন বলে, ”প্রফেসারদের ঘরে কিন্তু আপনি খুঁজে পাবেন না। বেশ ছিমছাম পরিবার, বউ, ছেলে আর শালি। ভদ্রলোক মাঝে মাঝে রেডিয়োয় বলে, গলাটি বেশ। ওর বউ নাকি স্কুলে পড়ায়। উনি বলছিলেন, মাসে হাজার সাতেক টাকা রোজগার করে।”
শেফালি নিমীলিত চোখে, মুখে হাসি ফুটিয়ে কথাগুলি শুনে যায়। অবশেষে বলে, ”তা ঠিকই বলেছ, তবে বউকে ফেলে আইবুড়ো যুবতী শালির সঙ্গে সিনেমা যাওয়া, দিদি বাড়ি থেকে বেরোলেই বোনের অমনি ভগ্নিপতির গা ঘেঁষে বসা, শ্বশুর তো বোর্ডিংয়ে রেখেই মেয়েকে পড়াতে চেয়েছিল, অমনি জামাই হাঁই-হাঁই করে বলে উঠল, ‘আমি থাকতে আভা বোর্ডিংয়ে থাকবে কি!’ লক্ষ করেছ তোমার প্রফেসারের বউ কেমন দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে! আসলে রস মরে গেছে, বুঝলে গো, রস মরে গেছে। আর ওদিকে বোনের চেকনাই ফুটেছে। নদীর এ-কূল ভেঙে ও-কূল গড়ে উঠছে। তুমি বাপু, রোজ ও লোকটার বেরোবার সময় জানলায় অমনভাবে দাঁড়িয়ো না, খারাপ দেখায়।”
শেষ বাক্যটিতে বিবর্ণ হয়ে গেছল ইলার মুখ।
”এই ফ্যালা, কাদের বাড়ি বল না?”
অসীম ভেবেছিল না শোনার ভান করে চলে যাবে। কিন্তু হাঁটুটার হঠাৎ চিড়িক দিয়ে ওঠায় দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। আভাকে বঙ্গ-সংস্কৃতি সম্মেলনের কার্ড দিতে গেছল অসীম, আধুনিক গানের দিন। আভা নেয়নি। বলেছিল, ”একা কোথাও যাওয়া দিদি পছন্দ করে না। দিদির কাছে থাকি, সুতরাং তার পছন্দ-অপছন্দ মেনে চলতে হবে তো।” অপ্রতিভ হয়ে অসীম বলেছিল, ”আমি পৌঁছে দেব, নিয়েও আসব আপনাকে।”
”না, দিদি ভীষণ স্ট্রিক্ট, একা কিছুতেই যেতে দেবে না।”
কথাগুলো হয়েছিল চার মাস আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। জয়রাম মিত্র লেন, তারক কবিরাজ স্ট্রিট ছাড়িয়ে যেখানে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যুয়ে পড়েছে, সেই মোড়ে। আভা তখন কলেজ যাচ্ছিল। কিন্তু শ্যামলের কাছে থেকে অসীম তিনদিন পরই শোনে, ”কিরে, কার্ড নিল না তো।” এবং শ্যামল জানায়, খবরটা সে বাড়িতে আলোচিত হতে শুনেছে মেয়েমহলে এবং শেফালি তখন হাজির ছিল।
”আপনাকে আর বলব কী, ঠিকই জেনে যাবেন।” অসীম মুখ তুলে বিরক্ত স্বরে বলল। ”যে এসেছে, তার মতো লোক এ গলির বাপের জন্মে ঢোকেনি, ঢুকবেও না।”
”কে, কে, নামটা বল নারে।” শেফালি হামা দিয়ে ঝুঁকে পড়ল।
অসীমের কী খেয়াল হল, নামটা চেঁচিয়ে বলল। শোনা মাত্র শেফালি লাফিয়ে উঠে ইলার বন্ধ জানলায় কিল মারতে মারতে চাপা চিৎকার শুরু করল, ”শিগগিরি খোল গো ইলা, পাড়ায় কে এসেছে দেখে যাও।”
