”ক’ নম্বর খুঁজছেন?”
অসীম গলার স্বরে ব্যক্তিত্ববান হবার চেষ্টা করল। এ পাড়ায় তার ওজন আছে, এবাড়ি-ওবাড়ির মধ্যে ঝগড়া হলে মধ্যস্থতা করে, ছোটোদের বেচাল দেখলে কড়কে দেয়, অন্য পাড়ায় গিয়ে সোডার বোতলও ছুঁড়ে আসে, নানাবিধ রাজনৈতিক আন্দোলনে যখন পুলিশ রাইফেল তুলে তাড়া করে, সে ইঁট ছোঁড়ে। জয়রাম মিত্র লেন তার স্টুডিয়ো ফ্লোর।
”নীরবালা ভটচায, তিনের বি, বছরখানেক এসেছেন, স্কুলে পড়ান।”
”বিধবা, একলা থাকেন, চুলগুলো ধবধবে, কর্পোরেশন স্কুলে পড়ান?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, কতটা ভেতরে হবে বলুন তো ভাই?”
অসীম দু’ পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। উদাসীন বা ক্লান্ত, ভরাট কণ্ঠস্বরের ‘ভাই’ শব্দটি তার ভালো লেগেছে।
”চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।”
”গাড়িটা কি ভেতরে নিয়ে যাব, না এখানেই রাখব?” অসীমের মুখের দিকে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে তাকিয়ে রইল নির্দেশের অপেক্ষায়। এটা অসীমকে অভিভূত করল আবার। তার ইচ্ছা হল, মোটরটা জয়রাম মিত্র লেনের মধ্যে ঝকঝকে একটুকরো আকাশের মতো ভেসে আসুক।
”গলির ভেতরেই রাখুন। চোরের উৎপাত বেড়েছে আজকাল এখানে। এই সেদিন একটা গাড়ির হেডলাইট খুলে নিয়ে গেছে। আসুন জায়গাটা দেখিয়ে দিচ্ছি।”
”তাই নাকি! কেরিয়ারের লকটা আবার ভেঙে গেছে, স্পেয়ার টায়ারটা ভেতরে। বলে ভালোই করলেন।”
অসীমকে অনুসরণ করে ঝকঝকে আকাশি-নীল মোটরটা গলির মধ্যে ঢুকল। তেইশ নম্বর বাড়ির লাগোয়া কর্পোরেশন টিউবওয়েলে স্নান করছিল সত্যচরণ। দু’বেলা স্নান করে এবং অফিস যাওয়ার আগে ও ফিরে এসে তার একমাত্র কাজ বালতি বালতি জল টিউওয়েল থেকে এনে সারা বাড়ি ধোওয়া এবং ভাতের কণা কী মাছের কাঁটা বাড়ির কোথাও পড়ে আছে কিনা খুঁটিয়ে লক্ষ করা।
সত্যচরণের আট বছরের ছেলেটি হাতলে বুক দিয়ে পাম্প করে বালতিটা ভরে চলেছে। জলটা ঠান্ডা। মগে করে জল তুলে অনেকক্ষণ ধরে চোখ বুজে মাথায় ঢেলে ঢেলে সত্যচরণ আনন্দ করছিল। মোটরের ইঞ্জিনের শব্দে চোখ খুলেই আঁতকে উঠল সে।
”দ্যাখো দ্যাখো, কাণ্ড দ্যাখো, চাপা দেবেন নাকি মশাই!”
গামছার কসি চেপে ধরে সত্যচরণ উঠে দাঁড়াল। অসীম দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ”চুপ করুন তো, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, এখনও শিখলেন না।”
”কেন, ইনি কি চিফ সেক্রেটারি।” সত্যচরণ খিঁচিয়ে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গেই আঁতকে বলল, ”মাড়িয়ো না, মাড়িয়ো না, জুতো পরে মাড়িয়ো না, ধুয়ে রেখেছি যে জায়গাটা।”
অসীম টিউবওয়েলের চারপাশে ধুয়ে রাখা অঞ্চলের উপর পা রেখেই সত্যচরণের কানের কাছে মুখ এনে শুধুমাত্র দুটি শব্দ চাপা স্বরে বলেই পিছিয়ে গেল। সত্যচরণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আ মোলো, যত রাজ্যের গু-মুত লাগানো চাকা একেবারে চান করার জায়গায়!”
”এই গলির মধ্যে তিনের-বি, চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।”
অসীম হাত তুলে তাঁতিদের গলিটা দেখাল। চওড়ায় দু’হাত, দৈর্ঘ্যে প্রায় চল্লিশ হাত। এর মধ্যে আছে চারটি বাড়ির ঠিকানা। এরকম শাখা গলি জয়রাম মিত্র লেনে গুটি পনেরো আছে। কোনোটির নাম উকিলদের গলি, কোনোটি চক্রবর্তীদের গলি, কোনোটির নাম ময়রাদের গলি।
”আপনি না থাকলে ট্রাবলে পড়তাম।”
তাঁতি গলির মুখেই কর্পোরেশনের আলো। অসীম লক্ষ করল, দুজনের ছায়াই দৈর্ঘ্যে যেন সমান। কথা বলতে গিয়ে ঘড়ঘড় করে উঠল তার গলাটা।
”নতুন লোকের পক্ষে একটু ট্রাবল হবেই।”
তিনের বি-র দরজা বন্ধ। দরজার পাশেই জানলা। তার একটা পাল্লা খোলা। অসীম উঁকি দিয়ে দেখল পিছন ফিরে নীরবালা ভটচায ঠোঙা থেকে কৌটোয় কিছু একটা ঢালছেন। অসীম গলাখাঁকারি দিতেই জানলার দিকে তাকালেন।
”আপনাকে একজন খুঁজছেন।” অসীম নামটা উচ্চচারণ করতে গিয়ে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল।
”আমাকে?”
অবাক হয়ে তিনি জানলার ধারে এলেন। আবছা গলিতে ঠাওর করার চেষ্টা করছেন মুখটিকে, তখন অসীমের পিছন থেকে ক্লান্ত অথচ ব্যক্তিত্বে ভরাট স্বর বলে উঠল, ”পিসিমা, আমি হাঁদু, দরজাটা খুলুন।”
অসীমের মনে হল, তার মতো খুবই সাধারণ একজন, এই লোকটা। বাড়ির এবং পাড়ার অনেকেই এখনও তাকে ফ্যালা নামে ডাকে। পিসিমা থাকলে তার বাড়ি গিয়ে হয়তো এইভাবেই সে বলত, ”আমি ফ্যালা, দরজাটা খুলুন।”
অসীম এই কথা ভেবে, সমান-সমান একরকমের বোধের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। ঝকঝকে আকাশি-নীল মোটরটির গায়ে সে যত্নে হাত রাখল। এটিকে এখন তার নিজের বলেই মনে হচ্ছে। এখন ইওসেবিয়ো-র পর্যায়ের ফুটবলার হিসেবে নিজেকে ভাবতে ইচ্ছে হল তার। ঝুঁকে ডান হাঁটুতে হাত ছোঁয়াল। মুখ থেকে আপনিই বেরিয়ে এল, ”শাললা।”
পা-টা সরিয়ে নিতে মুহূর্তের জন্য দেরি হয়ে গেছল। রাইট-ইন বুট তুলেছে দেখতে পেয়েও অসীম এগিয়ে দিয়েছিল ডান পা, বলটাকে টাচ লাইনের ওধারে ঠেলে দেবার জন্য। না দিলে বল যেত রাইট-আউটের কাছে। সে চিপ করলেই, ওৎ-পাতা সেন্টার ফরোয়ার্ড বল পায়। সেখান থেকে নেট করা এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়। রাইট-ইনের পা-টা ঠিক হাঁটুতেই লাগল। বাকি সময়টা অসীম লেফট-আউটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেয়। খেলায় এক গোলে হেরেছিল। খেলা শেষে একদল লোক লাঠি নিয়ে তাড়া করে তাদের চারজনকে-যারা কলকাতা থেকে এসেছিল টাকা নিয়ে খেলতে। অন্ধকারে ধান খেতের মধ্যে দিয়ে ছোটবার সময় অসীম দু’বার পড়ে যায়। দু’মাইল ছুটে এসে বাসে ওঠে। বাসে উঠে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ওরা। অবশেষে একজন চাপা গলায় বলে, ”বাকি টাকাটা আর দিল নারে।” আর একজন বলেছিল, ”বড্ড খিদে পেয়ে গেছে, জিতলে মুরগি খাওয়াবে কথা ছিল।” অসীম হাঁটু চেপে ধরে মাথা নামিয়ে শুধু বসে ছিল। হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছবার পয়সা মাত্র তার পকেটে। তখনও সে জানত না বাড়িতে তার বাবা কী কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে।
