-একটা বেড-কভার কিনতে হবে।
-ভিড় দেখেছ, যাবে?
-চলুন না।
-চল।
ওরা গুটিগুটি এগিয়ে এল ভিড়ের দিকে। পাতলা ঝুরঝুরে প্রথমটায়। যত এগোয় মানুষ জমাট হচ্ছে। প্যাণ্ডেলের গেট অনেকদূরে, তবু মানুষ চাপ বাঁধছে।
-এই তো সবে শুরু।
-হ্যাঁ, সবে শুরু।
কি একটা ঠেকল চিনুর হাতে। হাতটা সরিয়ে নিচ্ছিল। কাবেরী টেনে ধরে ব্যাগটা গুঁজে দিল।
-রাখুন। আমি দরদাম করতে পারি না।
-এবার বোধ হয় ছাড়া পাব।
দড়িটা ওদের বুকের কাছে কাঁপছে। টুলের ওপর বাঁশি মুখে দিয়ে দাঁড়ান ভলাণ্টিয়ারটির দিকে সকলেই তাকিয়ে। সে ভুরু কুঁচকে মানুষ মাপছে। হিসেব কষছে, বাঁশিতে ফুঁ দেবার সময় হয়েছে কি না।
-পৌঁছে গেলুম।
আবার বলল দিনেশ। তাকাল সে মাধবীর দিকে। ঘোমটা তুলে দিল মাধবী।
-ছেলে দুটোর জন্যই যত কাণ্ড।
-হ্যাঁ, নিশ্চিন্তে কি থাকতে দেয়। এখন আবার ভলাণ্টিয়ারদের সঙ্গে ছোটাছুটি করতে হবে।
বাঁশিতে দুবার ফুঁ পড়ল। তার মানে দড়ি-ধরা ভলাণ্টিয়াররা তৈরী হও, দড়ি সরাতে হবে। বড় ফুঁ পড়লেই দড়ি সরবে। আটকান মানুষগুলো ছাড়া পাবে। হঠাৎ ওই জায়গার মানুষগুলোর শব্দ কমে গেল। নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়েছে সকলে।
-ছেলেটাকে আমার কোলে এবার দাও।
রমার কাছ থেকে ছেলেকে তুলে নিল শৈল। রমা পিছু ফিরে একবার তাকাল। বিশ্ব বলেছিল দেখা করবে রাস্তায়। দেখা হয় নি।
-এতক্ষণ বুকে একটা ব্যথা করছিল। অভ্যাস নেই তো। সেদিনও করেছিল, সাঁতার কাটার পর।
-করবেই তো, কম খাটুনির ব্যাপার!
-ছেলে দুটো বোধ হয় ভেতরে মজাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
-না, বোধ হয়। কাঁদছে। হয় তো আমাদের দেখতে না পেয়ে কাঁদছে।
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
ঝকঝকে আকাশি-নীল স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডটা, আট হাত চওড়া জয়রাম মিত্র লেন আর কুড়ি হাত চওড়া তারক কবিরাজ স্ট্রিটের মোড়ে, তারক কবিরাজের বাড়ির সামনে অসীমকে লক্ষ করেই থেমে গেল। অসীম তখন ভাবছিল, এখুনি ত্রিশটা টাকা কোথা থেকে জোগাড় করা যায়। ড্রাইভার-আসন থেকে প্রশ্ন হল, ”এটাই কি জয়রাম মিত্র লেন?”
অসীম দাঁড়িয়েছিল বাঁ পায়ের উপর ভর দিয়ে, কোবরেজদের রকে বাঁ হাত রেখে শরীরটাকে হেলিয়ে, যাতে ডান পা ভারমুক্ত থাকে। ডান পায়ের হাঁটুতে গত বছর চোট পেয়েছিল নবদ্বীপে এক শীল্ডের ফাইনালে খেলতে গিয়ে। দিন পঁচিশ ভুগিয়েছিল হাঁটুটা। তারপর একটু ভয়ে ভয়েই খেলত। মাঝে মাঝেই খচখচ করে ওঠে ব্যথাটা। লাফিয়ে ট্রামে উঠতে গিয়ে কী স্লাইডিং ট্যাকল করতে গিয়ে অসীম বুঝেছে চিকিৎসা করানো দরকার। ডাক্তার দেখিয়েছিল। এক্সরে করানোর পরামর্শ নিয়ে ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরে। করাবো করাবো মনে রেখে প্রায় একটা বছর তারপর কেটে গেছে।
গতকাল তারকেশ্বরের মাইল ছয়েক দূরে এক গ্রামে ফোর্থ রাউন্ড খেলতে গিয়ে চোট পেয়েছে আবার ডান হাঁটুতে। রাইট-ইনটা প্রথম থেকেই পা চালিয়ে খেলছিল। হাফ-টাইমের আগেই অসীমের লেফট-হাফকে মাঠ থেকে বার করে দিল মুখ ফাটিয়ে। অসীম রাইট-ইনের কাছে গিয়ে বলেছিল-”এটা কী খেলা হচ্ছে, ফুটবল?” রাইট-ইন কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দেয়, ”তবে নয় তো কি।” দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে অসীম বলেছিল, ”বটে।”
”শুনছেন, এই গলিটাই কি জয়রাম মিত্র লেন?”
মোটর চালকের মুখ জানলা থেকে একটু বেরিয়ে এসেছে। তারক কবিরাজ স্ট্রিটের রাস্তার বালবগুলো খুলে ফ্লুরোসেন্ট টিউব লাগানো হয়েছে। কাউন্সিলর কুমার চৌধুরীর এইটিই আপাতত সর্বশেষ কৃতিত্ব জনগণকে তার সেবা সরবরাহে। এই আলোয় মোটর চালকের গৌরবর্ণ কপালের টিকোলো নাকের এবং চিবুক ও গালের কিছুটা অংশ অসীমের চোখে পড়ল। ওর মনে হল, মুখখানি যেন চেনা-চেনা।
অসীম কৌতূহলী হয়ে, চোখ দুটি তীক্ষ্ন করে তাকাল। কোথায়, কোথায়, কোথায় যেন দেখেছে।
হেরাল্ডের দরজা খুলে নেমে এল আরোহী। দোহারা গড়ন, লম্বায় প্রায় পাঁচ-দশ, ধুতি-পাঞ্জাবি, চুলগুলি অবিন্যস্ত। দরজায় চাবি দেবার জন্য পিছন ফিরতেই ঘাড়ে দুটি ভাঁজ দেখতে পেল অসীম। ওর কাছে হেঁটে এল হালকাভাবে, কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে দেহের ওজন জমিতে রেখে, মাথাটা ঝুঁকিয়ে।
সামনে এসে দাঁড়াতেই অসীম চমকে উঠল। আশ্চর্য, এতক্ষণ চিনতে পারেনি কেন সে। এই গলির মোড়ে, সন্ধ্যাবেলা এমন অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি, অসীমকে অভিভূত করে ফেলল।
”আলোটা বড্ড কম ঠিক বুঝতে পাচ্ছি না, আচ্ছা এটাই কি জয়রাম মিত্র লেন?”
সেই ভরাট গলা, নিরাসক্ত ভঙ্গি, শব্দগুলো শিথিল করে মুখ থেকে বার করে দেওয়া। বছর পাঁচেক আগের, নিউ থিয়ের্টাস দু’নম্বর স্টুডিয়োর ফ্লোরের একটি দৃশ্য ঝলসে উঠল অসীমের চোখে। ডিরেক্টর শেষবারের মতো সিচুয়েশন বুঝিয়ে দিচ্ছে। শুনতে শুনতে একবার চোখ তুলে ওদের কয়েকজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ”তাহলে, প্রথম ঘুষিটা খেয়েই পড়ে যাব। সেটা মারবে কে?” অসীমের মনে হয়েছিল স্বর কেমন যেন ক্লান্ত। ডিরেক্টর আঙুল দিয়ে দেখাল অসীমের পাশে দাঁড়ানো দাঁত উঁচু লোকটিকে। তখন হেসে বলল ”দেখবেন ভাই, খুব জোরে কষাবেন না। তেবড়ে-তুবড়ে গেলে রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে।” তাই শুনে লোকটার দাঁত আরও খানিকটা বেরিয়ে আসে এবং চাপা গলায় একমাত্র অসীমকে শুনিয়ে বলেছিল, ”গাল দুটো তো বাবা, লাখ টাকার ইন্সিয়োর করে রেখেছ, রোজগার বন্ধ হলেই বা কি!” শুনে সির সির করে উঠেছিল অসীমের দুই বগল। চাপা গলায় সে বলেছিল, ”এইরকম একস্ট্রার পার্ট করতে হয়েছিল ওকেও।” দাঁত-উঁচু তাই শুনে অসীমের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিল, ”নায়ক হবার সাধ হয়েছে? ভালো ভালো।” শুনে জ্বালা করে উঠেছিল অসীমের মাথার ভিতরটা।
