রমা বলল কথাটা। ও এমন ভিড় আগে দেখেনি।
.-এই বেশ লাগে। মানুষ চলছে ফিরছে, ওদের চলা দেখতে বেশ লাগে।
দু হাতে ভর দিয়ে শরীরটা হেলিয়ে বসল চিনু। কাবেরী রাস্তার দিকে তাকিয়ে। পার্কের এই দিকটা অন্ধকার। থোকো থোকো মানুষ বসে আছে। জিরোতে এসেছে। আবার উঠে যাবে।
চিনু বা কাবেরী ক্লান্ত নয়। মানুষের ভিড় এড়িয়ে ওরা বসেছে সময় কাটাতে। ঘুরে বেড়াতে ওদের ভাল লাগছে না।
-তোমার ফিরতে দেরি হলে কিছু হবে না ত?
-না। সাড়ে ন’টার পর হলে সই করে ঢুকতে হবে।
কিছুটা ঘাস ছিঁড়ল কাবেরী। লুকোচুরি খেলতে খেলতে দুটো বাচ্ছা তাদের ঘিরে নাচানাচি শুরু করল। ওপাশ থেকে ডাকল ওদের মা। মস্ত পার্ক। মধ্যে আলো নেই। তাই অন্ধকার মাঝখানটা। বাচ্ছা দুটো নিজের মনেই হারিয়ে যেতে পারে। ওদের মা উঠে এসে ধরে নিয়ে গেল।
-কেমন লাগছে বলতো?
-বেশ লাগছে।
আবার ঘাস ছিঁড়ল কাবেরী। রাস্তা কমাবার জন্য অনেকে কোণাকুণি পার্কের মধ্যদিয়ে চলেছে। ধমকাচ্ছে একজন তার বৌকে নিড়বিড়িয়ে হাঁটার জন্য। খলবল করে গেল কতকগুলো মেয়ে। কাঁধে হাত রেখে ছেলেটি কি যেন বলল মেয়েটিকে। ওরা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। রাস্তা থেকে একঝাঁক বেলুন ছেড়ে দিয়েছে কে।
-কাল সকাল সাতটায় ডিউটি।
কাবেরী ঘাস ছেঁড়া বন্ধ করে বেলুন দেখতে লাগল।
-তোমার দিদির কাছে ছুটির দিন তো আসতে পার।
-আসব। দু’হাতে হেলান দিয়ে এলিয়ে পড়ল চিনু। মিষ্টি গন্ধ আসছে। কাবেরী কিছু একটা মেখেছে। উঁচু করে খোঁপাবাঁধা। গঙ্গামাটির মত ঘাড়। ঘাড় ফেরাল। ছলকে উঠল মাংস। গলায় সরু সরু দাগ। থুতনির নীচে একটু পল-তোলা। হাতের চেটোয় মাথা রেখে শুয়ে পড়ল চিনু।
-সারারাত এমনি করে এখানে বসে থাকা যায়, না?
-ঘুম পেয়ে যাবে। কেমন একটা না একটা শব্দ হচ্ছে যেন ট্রেনে চেপেছি। আপনার ঘুম পায় না ট্রেনে উঠলে?
-ঘুমোবার মত জার্নি কখনো করিনি।
-আপনি ভয়ানক কুঁড়ে।
-কিসে বুঝলে!
-আমি বসে রয়েছি অথচ শুয়ে পড়লেন।
-তাতে কি প্রমাণ হয় আমি কুঁড়ে?
-নিশ্চয় হয়।
সময়-কাটানো তর্ক একটা তৈরী হবার মুখে, এমন সময় জনাছয়েক ওদের কাছেই গোল হয়ে বসে হৈ-চৈ শুরু করল। ওদের পরনে সরু চোঙার মত প্যাণ্ট। নাইয়ের নীচ দিয়ে বেল্ট। ক’জনের মাথায় বেতের টুপি। হাতে হুঁকো। ওরা মানুষকে মজা দিতে বেরিয়েছে।
চুপ করে গেল চিনু। জায়গাটা এতক্ষণ নিরিবিলি ছিল। কয়েকজন এদিকে তাকিয়ে কি ফিসফিস করল। হেসে উঠল সবাই ভীষণ জোরে। পার্কের অনেকেই তাতে মুখ ফিরিয়ে দেখল। অস্বস্তি হচ্ছে। চিনু উঠে বসল।
-হঠাৎ কেমন গরম পড়েছে। ক’দিন ধরে।
-হ্যাঁ, গুমোট গুমোট ভাব।
-বৃষ্টি হবে কি?
-মেঘ কই!
ওরা মেঘ খুঁজতে লাগল। হৈ-চৈ করছে ছেলেগুলো। গান ধরেছে একজন। গলাটা মিষ্টি। হাত তালি দিচ্ছে সকলে। হঠাৎ একজন লাফিয়ে উঠে নাচতে শুরু করল। হাত ধরে, কোমর ভেঙে, ঘাড় নাড়া দিয়ে নাচছে। কে একজন হুঁকোটা হাতে তুলে দিল।
-আপনার ক্ষিদে পায়নি?
-না, তোমার পেয়েছে?
-হ্যাঁ, সেই কখন খেয়ে বেরিয়েছি।
-তাহলে ওঠো।
ওরা উঠে পড়ল। দেখে দেখে খুপরিওলা একটা রেস্টুরেণ্টে ঢুকল। দোকানের বাচ্ছাটা চিনুর মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। চিনু তাকাল কাবেরীর দিকে।
-কি খাবে?
-যা হোক।
-তবু?
-খুব ক্ষিদে পেয়েছে।
-তাহলে মাংস আর পরোটা।
খাওয়ার পর বিল নিয়ে এল বাচ্ছাটা। মৌরির প্লেটে বিলটা রাখল চিনুর সামনে। বিলটা তুলে নিয়ে সে পড়তে শুরু করল। বাচ্ছাটা দাঁড়িয়ে। দোকানে আজ অনেক খদ্দের। একজায়গায় আটকা থাকলে চলবে না। উশখুশ করল সে।
চিনু তাকাল কাবেরীর দিকে। বাচ্ছাটাকে এক-গ্লাশ জল আনতে পাঠাল কাবেরী।
-কত হয়েছে?
-দু’টাকা চার আনা।
ছোট্ট ব্যাগটা থেকে তিনটে টাকা বার করল কাবেরী বাচ্ছাটা আসার আগেই। রাস্তায় বেরিয়ে খুচরোগুলো ফেরত দিচ্ছিল চিনু। কাবেরী নিল না।
-এরপর কিন্তু সিগারেট খেতে দেবো না। গন্ধটা আমার বিচ্ছিরি লাগে। খাবেন তো এখানেই খেয়ে নিন।
অর্থহীন কথা। কথা না বাড়িয়ে পয়সাগুলো পকেটে রাখল চিনু। আঙুলগুলো আড়ষ্ট হয়ে গেছে। বুকের মধ্যে তালগোল পাকাচ্ছে একরাশ নিঃশ্বাস।
-কোন দিকে যাবেন?
-যেদিকে হয়।
সামনের দিকেই হাঁটতে শুরু করল। উল্টোদিক থেকে মানুষ আসছে। পথ ছেড়ে দেবার জন্য কখনো ওরা ঘেঁষে এল, কখনো দূরে সরে গেল। রাস্তা পার হবার জন্য পাশাপাশি দাঁড়াল। কথা না বলে ওরা হাঁটছিল। হঠাৎ চিনু বলল:
-একটা চাকরির চেষ্টা করেছিলুম স্টেট বাসে, হোল না।
-কেন?
-আর লোক নিচ্ছে না।
-অন্য কোথাও?
-খুঁজছি।
-অবস্থা খুব খারাপ, চাকরির।
-আরো খারাপ হবে।
ওরা দাঁড়াল। ডানদিকের রাস্তায় খুব ভিড়। রাস্তাটা একটা প্যাণ্ডেলে পৌঁছেছে।
-যাবেন।
-ভিড় দেখেছ?
-দেখেছি, তা’ ত কি হয়েছে।
ভীষণ ঠেলাঠেলি করতে হবে। কষ্ট হবে তোমার।
-তাহলে কি করব। পার্কে বসে থাকব!
-আচ্ছা চল। ওদিক দিয়ে এস, মেয়েদের রাস্তা ওদিকে।
-একা একা ঘুরতে আমার ভাল লাগে না।
-কিন্তু পুরুষদের দিকের অবস্থা দেখেছ?
-আমার যে দু’একটা জিনিস কিনতে হবে!
-কিনবে।
-আমি দরদাম করতে পারি না। সব সময় ঠকে যাই।
-আমার জিনিস কেনা অব্যেস নেই। এদিকে সরে এস।
ওরা ফুটপাতে উঠে দাঁড়াল। দুজনেই তাকাল ভিড়ের দিকে। নির্ঝঞ্ঝাটে দাঁড়াবার জো নেই। ধাক্কা দিয়ে মানুষ চলেছে।
