ছেলে কোলে রমা টলে পড়ল। ওকে আঁকড়ে ধরল শৈল।
-দিদি এমন করে চললে রাত কাবার হয়ে যাবে। বাড়িতে উনি একা।
-তা’বলে ছেলে দুটোকে ফেলে রেখে যাবি নাকি!
বিরক্ত হয়ে ধমকাল মাধবী। দিনেশ বুকের কাছে হাত জড়ো করে সামনের মানুষকে ঠেলছে।
-ভুলপথে এসেছি। মেয়েদের ঢোকার রাস্তা এদিকে নয়।
-এখন আর ওসব ভেবে লাভ কি। আমাদের তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে।
মাধবীকে ঠেলছে পেছন থেকে। মুখ ফিরিয়ে দেখল, একটা পুরুষ মানুষ। দু’হাতে মাধবীর কাঁধ ধরেছে। চোখাচোখি হতে কেমন করে তাকাল। হাতটা নামিয়ে নেবার জায়গাও নেই। ধরুক! এখন আর অন্য কিছু ভাবার ফুরসতও নেই।
ভিড় চাপ খাচ্ছে। রমার কোলে ছেলেটা কান্না ভুলেছে। হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। পিঠের আঁচল খসে পড়েছে। ব্লাউজটা উঠে গিয়ে কোমর বেরিয়ে পড়েছে। পড়ুক, হাত নাড়াবার জায়গা নেই। এই ভিড়ে কেউ এখন তাকাবে না।
কে চেঁচিয়ে উঠল। গলার হার কেটেছে। রাস্তার ধারে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে কে যেন। অজ্ঞান হয়ে গেছে। দিনেশকে মাধবী বলল।
-আমাদের না আসাই উচিত ছিল। বুড়োরা কি পারে এই ধকল সামলাতে।
-আমরা কি ইচ্ছে করে এসেছি। ছেলেদের জন্যই তো আসতে হল।
দূরে সরে গেছে শৈল। তিন চার পরত মানুষের ব্যবধান। কাছে আসার জন্য ভিড় ঠেলছে। মানুষের চাপে আঁচল আটকে গেছে। নিজের শরীরটাকেই ও ঝাঁকুনি দিল। ভিড় আলগা হ’ল না। চেঁচিয়ে ডাকল শৈল। মাধবী, দিনেশ, রমা মুখ ফেরাল।
হঠাৎ সামনের ভিড়টা পাতলা হল। বোধ হয় দড়ি উঠেছে। পেছনের ধাক্কায় মানুষগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ল। টাল সামলাতে পারেনি দিনেশ। পড়ে গেল।
হুড়মুড়িয়ে ভিড় আসছে। পায়ে পায়ে চটকে দিয়ে যাবে দিনেশকে। চীৎকার করে মাধবী ভিড় আটকাতে গেল। ঝুঁকে পড়ল দিনেশকে তোলবার জন্য। পেছনের লোকটা শক্ত খোঁটার মত ভিড় রুখতে চেষ্টা করল। নড়বড় করে দুলছে মানুষটা। এখুনি ভেঙে পড়বে।
হঠাৎ শৈল ক্ষেপে উঠল। কোন রকমে পা তুলে হাঁটু দিয়ে সামনের লোকটার কোমরে চাড় দিল। নিঙড়ে গেল যেন মাংস। একটু জায়গা হয়েছে হাত খেলাবার মত। দু হাতে এলোপাথাড়ি ঘুষি ছুঁড়ল শৈল।
-দিদি টেনে তোল।
শৈল চীৎকার করল।
-পড়ে গেছে। হাত তুলে থামতে বলুন। ভিড়কে থামতে বলুন।
কে যেন চীৎকার করে হাত তুলল। কে শুনবে, একটা মানুষের কথা। যেমন করেই হোক মানুষ আগে পৌঁছতে চায়। ওই প্যাণ্ডেলের গেটটুকু পেরোলেই রেহাই। তারপর রঙ-বেরঙের আলোর সাজান দোকান। হরেক রকমের জিনিস। বিচিত্র মানুষ। দোকানে দোকানে হাতে করে জিনিস নাড়াচাড়া, দরদাম, সাধাসাধি।
-এখানে একটা মানুষ পড়ে গেছে।
একটা লোক তার পাশের লোককে বলল। পেছনের লোকও শুনল। ওরা কজন শক্ত হয়ে পেছনের ভিড় রুখল।
-কি হয়েছে এগোচ্ছেন না কেন?
-একটা লোক পড়ে গেছে।
-একটা লোক পড়ে গেছে?
ওরা পেছনে চাপ দিল। পেছনের মানুষ এগোতে চাইল। বিরক্ত হল। রেগে উঠল।
-একটা লোক পড়ে গেছে।
মানুষের বিরাট চাপ থমকে গেল। রেগে উঠল।
ছিঁড়ে গেল শৈলর এতদিনকার তোলা শাড়িটা। ঘড়ির স্টীলের ব্যাণ্ডে কনুই ছড়ে গেছে। মুখে রক্ত জমেছে। হাতের লোহা তুবড়ে বসে গেছে। পা মাড়িয়ে দিয়েছে কার জুতোর গোড়ালি। পাঞ্জাবি আর সার্টের হাতা, আঁকড়ে টেনে ধরে, ফাঁক দিয়ে গলে এল শৈল।
দিনেশকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কারা। ভিড় আবার চলেছে একটু একটু। ঝুঁটি-ভাঙা পায়রার মত লটকাচ্ছে দিনেশের মাথা। ওকে দু হাতে জড়িয়ে ধরল শৈল।
-দিদি তুমি সামনে যাও।
মাধবীর হাত ধরে শৈল ঠেলে দিল।
-রমা, ইদিকটায় আয়। খোকাকে কোল ফিরিয়ে আমার দিকে রাখ।
শৈল দু’হাতে রমা আর দিনেশকে ঘিরে রাখল। মাধবী ওদের দুজনের সামনে রইল।
-ঠেলছেন কেন?
পাশের মানুষটাকে রুখে উঠল শৈল।
-ইচ্ছে করে কি ঠেলছি।
সমান রুখে জবাব এল। মাধবী বলল:
-আর পারা যায় না।
-এই তো এসে গেছি। গেট দেখা যাচ্ছে। ছেলে দুটোর এই ভিড়ে কি যে হয়েছে কে জানে।
-ওরা কি পারবে আমাদের মত সহ্য করতে।
-পেরেছে নিশ্চয়, নইলে হৈ-চৈ হ’ত। একটা কিছু জানতে পারতুম।
শৈল হাঁপাচ্ছে। তবু শান্ত স্বরে কথা বলল। কেউ যেন না ভয় পায়, তাই নিজের ব্যস্ততা দেখাল না। এদের তিনজন আর নিজের ছেলেটাকে সামলে এগোতে হচ্ছে। রাস্তায় খোয়া উঠেছে। জলের পাইপ বসাবার জন্য খুঁড়েছিল বোধ হয়। পায়ে ফুটছে। পেছন থেকে জুতোর ঠোক্কর লাগল গোড়ালিতে। এমন ভিড়ে লাগবেই। তার জন্য ঝগড়া করে লাভ নেই। যে করে হোক এগিয়ে যেতে হবে। দিনেশ আর মাধবীর বয়স হয়েছে, ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রমাটা আনকোরা। ঘাবড়ে গেছে। খোকার যেন কষ্ট না হয়। কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা এখনো ওর হয়নি। এদের সামলে এগোতে হচ্ছে শৈলকে।
পৌঁছে গেছে। একটা খণ্ড ভেঙে বেরিয়ে যেতেই ওরা দড়ির সামনে পৌঁছে গেল। ওপাশ দিয়ে আর একদল মানুষ আসছে। ওরা প্যাণ্ডেল থেকে বেরিয়েছে। ওদের যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বাঁশিতে ফুঁ পড়বে। দড়ি ঘুরে ওপাশে যাবে। ওরা আটকে পড়বে। এরা তখন ছাড়া পাবে।
অপেক্ষা করছে এরা। সামনে দিয়ে ভিড় চলেছে। কথা বলছে। হাতে হাত দিয়ে ছুটছে। আর এক প্যাণ্ডেলে। সেখানেও হয়তো এমন ভিড়। আজ সারারাত ওরা এমনি করে ভিড় ঠেলবে।
-মানুষ এতও পারে।
