-ওর মন মেজাজ ভাল নেই।
-পুরুষ মানুষের এত অল্পেই ভেঙে পড়া ভাল নয়। তার ওপর তুইও জুটেছিস তেমনি।
কবে কার একটা তোলা তাঁতের শাড়ি শৈলর পরনে। হাতে শুধু লোহা আর প্লাষ্টিকের চুড়ি। ওর তুলনায় মাধবীর সাজ স্বচ্ছল। তাই লজ্জা পেল সে। শৈল ভেঙে পড়লে ওদের সংসারও পড়বে। ওর মনের জোর যাতে থাকে সেই কথাই বলতে হবে। অল্প বয়সে অনেকগুলো কুচোকাঁচার মা হয়ে ওর যন্ত্রণার শেষ নেই। আহা, ভালয়-ভালয় সবগুলো মানুষ হোক।
ফেরার সময় রিকশা কোরো।
দিনেশকে মুখ আড়াল করে মাধবী বলল।
-দুটো হলেই হয়ে যাবে। শৈলীটা একদম হাঁপিয়ে গেছে।
-ওকে না আনলেই হোত।
-বাঃ পুজোয় বেরোবে না? বচ্ছরকার একটা দিন। বাড়ির মধ্যে বসে থাকবে?
একদল অবাঙালী মেয়ে পুরুষ বরফ খেতে বসল ওদের পাশেই। মাধবীর গা টিপল শৈল। একটা জোয়ান তার কচি বৌকে হাতে করে বরফ খাওয়াচ্ছে। হাসল ওরা সকলেই।
রমা চারদিকে তাকাচ্ছে। বিশ্বকে বলা ছিল তারা রাত্রে বেরোবে। বিশ্ব বলেছিল রাস্তায় দেখা করবে। এতক্ষণেও দেখা হয়নি। এমন করে বসে থাকতে বিশ্রী লাগল রমার! হয় তো একটু এগোলেই দেখা হয়ে যেতে পারে।
-এমনি করে বসেই থাকবে?
-আর একটুখানি।
মাধবীর মজা লাগছে কচি-বৌটা আর তার জোয়ান স্বামীর হাবভাবে। তাড়া দিল দিনেশ।
-এখনো তো বড় প্রতিমাগুলো দেখা হয় নি। যত দেরী করবে ততই ভিড় বাড়বে।
বাচ্ছা তিনটের হাই উঠছে। সানু জুতো জোড়া রাস্তায় ফেলে রেখেছে। হাতে তুলে রাখল রমা। একটা ছেলে ঢুলছে। তাকে কোলে নিল শৈল।
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল। পথে ছোট ছোট প্যাণ্ডেল পড়ল। মানুষের ভিড়ে জমজমাট। ওরা থামল না। ভিড়ের মধ্যে মিশিয়ে ওরা হাঁটছে। তাঁবু খাটিয়ে ম্যাজিক দেখান হচ্ছে। আগুনে মানুষ। লোকটা যা ছোঁবে তাইতেই আগুন ধরে যাবে। ওদের হাঁটার বেগ কমে এল। দিনেশ এগিয়ে গেল বলতে বলতে।
-এখানে থেমো না। এখনো অনেক দেখার বাকি।
আবার জোরে হাঁটতে শুরু করল। সানুর বেলুনটা হঠাৎ হাত ফসকে উড়ে গেল। ওরা দাঁড়িয়ে দেখল। হেলে দুলে বেলুনটা উঠে যাচ্ছে।
-দাঁড়িয়ে থেকো না। অমন কত বেলুন আজ উড়বে, ফাটবে।
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল। এখানে আর্টের ঠাকুর। কেমন শোলা-শোলা ঠেকছে। কাঠেরও হতে পারে। না মাটিরই বোধ হয়। কি দরকার এত খেটে-খুটে পয়সা খরচ করে তৈরী করার। বিসর্জন তো দিতে হবেই। কিন্তু চোখ জুড়োয়। একঘেয়ে ঢঙ দেখে দেখে আলুনি লাগছিল। রোজকার দেখা রান্না ঘরটার মত। এই ভাল। রঙ দেখলে চোখ জুড়োয়। নতুন ঢঙ। এই বেশ।
-হাঁটো হাঁটো, থেমো না। দিনেশ কেমন মানুষের ফাঁক ফোকর দিয়ে গলে যাচ্ছে। যাবেই তো। পুরুষমানুষ, রাস্তায় চলার অভ্যাস আছে যে।
-শৈলী, ওই গাড়িটার দিকে তাকা। বৌটাকে গয়না পরিয়েছে কেমন। বেচারা! নিশ্চিন্তি হয়ে গাড়ি থেকে নামবে কি করে!
রাস্তা পড়েছে। ওরা দাঁড়াল। চারদিক থেকে মানুষ আসছে। এই মানুষের ধাক্কা সামলাতে হবে। গাড়ি দেখে পার হতে হবে। শৈল ঘুমন্ত ছেলের ভারে বেঁকে পড়েছে।
-অ শৈলী, ছেলেটাকে দে।
-না দিদি, পারব।
-না পারবি না। রমা ওকে কোলে নে।
চটকা লেগে ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেল। রমার কোলে কাঁদতে শুরু করল।
-ওগো, এখানে বটঠাকুর-ঝির দ্যাওরের বাড়ি না?
-না, এখানে নয়, কম্বুলিটোলায়। সে এখান থেকে অনেক দূর।
-কত নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে, দেখেছ?
-আমি আর কি দেখব, তুমি দেখ।
-এখানে বাড়ির ভাড়া কত করে?
-অনেক।
-অ দিদি ছেলেগুলো কোথা?
-তাই’ত রে শৈলী!
ওরা দাঁড়াল। আগে আগে যাচ্ছিল দুটো ছেলে।
-তোমরা এখানে দাঁড়াও আমি দেখি।
দিনেশ ভিড়ে ঢুকে পড়ল। এখান থেকেই ভিড় শুরু হয়েছে। রাস্তাটা খুব চওড়া নয়। মানুষ অজস্র। তাই দু’পা হাঁটলেই আর দেখা যায় না। একবার ভিড়ে মিশলে উল্টোদিকে ফিরে আসা দুঃসাধ্য। ঠেলতে ঠেলতে সেই প্যাণ্ডেলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে। ছেলে দুটো যদি ভিড়ের মুখে পড়ে তাহলে আর ফিরতে পারবে না।
একটু পরেই ফিরল দিনেশ মুখ শুকনো। চাউনিটা বেঠিক।
-ওরা আসেনি?
-কই না তো!
-দিদি কি হবে!
-কি আর হবে, খোঁজ করতে হবে। প্যাণ্ডেলের ভেতর অফিস, সেখানে গিয়ে বলতে হবে। ওরা মাইকে বলে দেবে। সানুটাতো পড়তে পারে, চিনে চিনে ঠিক অফিসে হাজির হতে পারবে।
-তাহলে দেরী করে লাভ কি। হয়তো ওরাও আমাদের খুঁজতে, কোথায় ছিটকে পড়বে!
ওরা ভিড়ের দিকে এগোল। ঝুরঝুর মানুষ প্রথমটায়। যত এগোয় মানুষ জমাট হচ্ছে। প্যাণ্ডেলের গেট অনেকদূরে, তবু মানুষ চাপ বাঁধছে। এই চাপটা এগোবে। গেটের মুখে ভলাণ্টিয়ার দড়ি আর বাঁশি বাজিয়ে চাপটাকে আটকাচ্ছে। খণ্ড করছে। এক একটা খণ্ড ভেতরে ঢুকবে। আবার দড়ি পড়বে। ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ততক্ষণে পিছনে মানুষ জমেছে। সামনে পিছনে দুদিক থেকে ঠেলা আসছে। মানুষ হাঁপসাচ্ছে। ঠেলা খেয়ে চাপটা দুলছে। টলে টলে উঠছে। ওরই মধ্যে প্রত্যেকটা মানুষ চেষ্টা করছে স্বস্তিতে থাকবার। হাত তুলে সামনের মানুষটাকে ঠেলে কিছুটা জায়গা ফাঁকা করতে চাপ দিচ্ছে। সব মানুষই নিজের সুবিধের জন্য চাপছে। একটা বিরাট চাপ তৈরী হচ্ছে।
হঠাৎ দড়িটা খুলল। হুড়মুড় করে একটা খণ্ড ভিতরে ঢুকে গেল। খানিকটা জায়গা ফাঁকা হল। ফাঁকা জায়গার লোভে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই।
