সেদিন কোন তারাটাকে দেখেছিলুম। সেটাকে এখন কি খুঁজে বার করা যাবে! হারিয়ে গেছে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ। আমিও হারিয়ে যাব। আমায় কি কেউ খুঁজবে?
তারাটা ছুটে গেল। ওটা উল্কা। ওটা কি সেই তারাটা! আমি কি অমন করে ছিটকে পড়ব? যদি পড়ি কোথায় যাব! নরকে? আমি কি পাপ করেছি? যাদের অনেক আছে তারাই হিসেবী হয়। আমার কি আছে? বিশ্বর কি আছে? বুলাদের ঘরের বৌ হতে পারব না, কাবেরীর মত চাকরি করতে পারব না। কিন্তু ওদের মত আমারো মন আছে, শরীর আছে।
উল্কার মত আমি ছুটতে পারব না। ভয় করে। বিশ্বরও ভয় করে। ওই তারাগুলোর মধ্যে কোনটে বিশ্ব! বুলা, কাবেরী, বাবা, মা, সানু ওরা কোথায় হারিয়ে গেছে ভিড়ের মধ্যে। আমি এখন একা। এখন আমি সুখী। কিন্তু তারপর? তারপর কি আছে? ও হাঁপাচ্ছে। মরা ইঁদুরের মত মুখ গুঁজরে পড়ে আছে। অমনি ক’রে কি আমরা ভবিষ্যতেও থাকব! ক্ষেপামির ক্লান্তি ঘুচবে কি দিয়ে? চিরজীবন এইভাবে চলবে? আমরা যন্তর হয়ে যাব! আমরা মানুষ থাকব না।
-আঃ কেঁদ না।
রমার মাথায় হাত রাখল বিশ্ব। চুলে বিলি কেটে দিল।
-ওঠ, নিচে যাও, ঘুম পাচ্ছে।
রমা চুপ ক’রে রইল। শরীরে যন্ত্রণা, শরীরের মধ্যে যন্ত্রণা। দু’হাতে মুখ ঢেকে সে শুয়ে রইল। এক সময় হাত রাখল বিশ্বর পিঠে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
নিঃশব্দে রমা নিচে নেমে গেল।
ছয়
গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়তেই সানু বায়না ধরল গ্যাস বেলুনের। দিনেশ একটা কিনে দিতে মাধবী গা টিপল। হুঁশ হল দিনেশের। শৈল মুখ ঘুরিয়ে মানুষজন দেখতে শুরু করল আর তার দুই ছেলে ঘাড় তুলে দেখছে সানুর বেলুনটা। আরো দুটো বেলুন কিনে দিল দিনেশ।
-আয়রে শৈলী।
ওরা ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করল। তিনটে ছোট ছেলে বেলুন উড়িয়ে আগে তার পেছনে দিনেশ, আর একটু পিছিয়ে মাধবী, শৈল আর রমা।
-আজ কত লোক ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে বলতো?
-কত?
শৈল ছেলে দুটোর ওপর নজর রাখতে রাখতে বলল। মাধবী যেন লোক গুনতে শুরু করেছে। কথা না বলে এধার-ওধার তাকাতে লাগল। রমা একটু জোরে হেঁটে দিনেশের পাশে এল।
-বাবা, কলকাতায় কত লোক থাকে?
-কেন?
-বল না, এমনি জিগ্যেস করছি।
পঞ্চাশ ষাট লাখ হবে।
সানুরা দাঁড়িয়ে পড়েছে। দিনেশ কাছে আসতেই সানু আঙুল দিয়ে দেখাল।
-বাবা, খাব।
-এই মাত্তর খেয়ে বেরিয়েছিস না?
শুধু একটা ধমকেই রমা চুপ করিয়ে দিল। রঙীন শরবতের গ্লাসগুলোর দিকে তাকিয়ে সানু তবু দাঁড়িয়ে থাকে।
-সানু, অসভ্যতা করলে মা’কে বলে দোব।
-আচ্ছা, পরে কিনে দোব।
দিনেশই শেষ পর্যন্ত সানুকে হাঁটাল। শৈলর ছেলে দুটি জুলজুল করে এতক্ষণ তাকিয়েছিল দিনেশের দিকে।
ওরা হেঁটে পৌঁছল একটা ছোট প্যাণ্ডেলে। পুরুষদের পথে দিনেশ ঢুকে গেল। সানুর বয়সী ছোট্ট একটা ভলাণ্টিয়ার ওকে সাবধান করে দিল, দড়িতে যেন হাত না দেয়। দিনেশ তার গাল টিপে দিতেই গম্ভীর হয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
বেলুন নিয়ে ওরা ঢুকেছিল। পাখায় লেগে শৈলর বড় ছেলেরটা ফেটে গেল। মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে শঙ্কিত হয়ে রইল।
ছোট্ট প্রতিমা। মামুলি ঢঙ। এক কাঠামোতেই সব কটা মূর্তি। আলোর বাহাদুরি নেই। ঝুড়ি-চুপড়ির কারচুপি নেই। এ্যামপ্লিফায়ারে সিনেমার গান। তবু লোকের ভিড়।
ভক্তিভরে প্রণাম করল মাধবী আর শৈল। সিঁদুরের টিপ নিল। চরণামৃত ছেলেদেরও খাওয়াল। খুশি হয়ে ওরা বেরিয়ে এল সেখান থেকে।
ওরা হাঁটল। পথে যতগুলো প্যাণ্ডেল পড়ল ওরা ঢুকল। প্রণাম করল। চরণামৃত খেল। সিঁদুরের টিপ পরল।
এক নাগাড়ে হাঁটা যায় না। রাস্তাপার হতে হবে। গাড়ি চলেছে। কলকাতার সব গাড়ি যেন একটা রাস্তা দিয়েই যাবে বলে ঠিক করেছে। হঠাৎ ব্যাজ-আঁটা একটা ছেলে বাঁশি বাজিয়ে রাস্তার মাঝখানে হাত তুলে দাঁড়াল। গাড়ি চলা থামল। সকলে রাস্তা পার হল। ওরাও পার হল।
-শৈলী, তুই বড় ঢিকিয়ে হাঁটিস।
-কি করব। অব্যেস নেই।
-রমা, আঁচল দিয়ে গলাটা ঢাক। লোকটা তখন থেকে আমাদের সঙ্গে ঘুরছে।
সরু একচিলতে হারটাকে রমা আঁচলে ঢাকল।
-বাচ্ছাগুলোর ওপর নজর রাখ।
-সন্ধিপুজো আরম্ভ হতে দেরী আছে।
-হ্যাঁ, সেই মাঝরাতে। দেখবি নাকি?
শৈল মাথা নাড়ল।
-না। উনি বাড়িতে একা। বাচ্ছাগুলো উঠে পড়লে সামলাতে পারবেন না।
মাধবী দিনেশকে ডাকল।
-কোন দিকে যাচ্ছ! গঙ্গার ধার দিয়ে চল না। এ রাস্তায় বড্ড ভিড়।
-এখনো তো বড় বড় গুলো দেখা হয়নি। কুমোরটুলি, আহিরীটোলা, বাগবাজার, তারপর ফায়ার-ব্রিগেড।
-তা হলে গঙ্গার ধার দিয়েই তো ভাল!
-অনেক ঘুরতে হবে।
-এ ভিড়ের চেয়ে তাই ভাল। বরং একটু জিরিয়ে নি। রমা ছেলেগুলোকে ডাক।
উবু হয়ে মাধবী ফুটের ধারে বসল। সানুর পায়ে ফোস্কা! জুতো খুলে ফেলল সে।
-কুলপী-বরফ খাবে?
মাধবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে দিনেশ বলল।
-এই খোলা রাস্তায়?
-কে আর দেখছে।
-ও শৈলী, বরফ খাবি?
-না দিদি।
মাধবী বুঝল শৈলর বাধাটা কোথায়।
-তুই না খেলে আমারও খাওয়া হবে না। কতদিন যে খাই না।
অপ্রতিভ হয়ে শৈল তাকিয়ে রইল। দিনেশকে ইশারা করল মাধবী।
রাস্তায় বসে ওরা বরফ খেল। হাঁটার অভ্যাস নেই কারুর, দিনেশ ছাড়া। উঠতে ইচ্ছে করছে না। হাঁটু ভেঙে আসছে।
-দিদি বাড়িতে উনি একা আছেন।
-আছে তো কি হবে। ওরা বেরোয়, বুঝুক একটু বাড়িতে বসে ছেলে আগলানোর মজাটা।
