ঘরের ঠিক মাঝামাঝি একটিপ আগুন জ্বলছে। এক একবার উসকে উঠেই বাসি রক্তের ছোপ ধরেছে। এ ঘরে বিশ্ব ছাড়া কেউ শোয় না। জানলায় হাত রেখে শব্দ করল রমা। কাঠের ওপর দিয়ে আরশুলা চলে বেড়ালে যতটুকু শব্দ হয়।
আগুনটা কিছুক্ষণ একভাবে রইল। নিভে গেল। সামান্য খসখস। জানলা জুড়ে বিশ্বর ছায়া পড়ল।
-এত রাত্রে, কি ব্যাপার!
-কিছু না, এমনি। ঘুম আসছে না।
-তাই ব’লে ওপরে কেন!
-ইচ্ছে হ’ল।
-নিজের ইচ্ছেমত সবসময় চলা যায় না। এখন যদি কেউ দেখে ফেলে?
-ফেলে ফেলবে। আমি বুঝব।
জানলা থেকে সরে গেল বিশ্ব। বেরিয়ে এল ছাদে। শক্ত মুঠোয় রমার হাত ধরে সিঁড়ি পর্যন্ত টেনে আনল।
-চলে যাও।
-কেন?
-হ্যাঁ।
-না যাব না।
-কেন যাবে না?
চুপ করে রইল রমা। হাত ছেড়ে দিল বিশ্ব।
-তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?
চুপ করে রইল বিশ্ব। রমা ওর হাত ধরল।
-কেন? আমি কি দোষ করেছি?
-কিছু না।
-তবে!
বিশ্বর হাতদুটো কাঁধের ওপর তুলে নিল রমা। একরাশ কাপড় ঝোলান দড়ির মত হয়ে রইল হাতদুটো।
-তুমি আমায় ভালবাস না রমা।
-কে বলল!
-কেউ না। না বললেও বুঝতে পারি। হিসেব ছাড়া কেউ চলে না। বলতে পার আমার কি আছে, কেন তুমি আমায় ভালবাসবে? আমার চাকরিটাই কি তোমার ভালবাসাকে টেনে এনেছে?
-চাকরি পাবার আগে থেকেই ভালবাসি।
-কিন্তু কেন?
-জানি না।
-মিথ্যে কথা। শুধু শুধু এমনি ভালবাসা জন্মায় না। তুমি ব’ল?
-বললুম তো জানি না।
-আমায় ভালবাসার কোন কারণ নেই। এখন আর সে সময় নেই যে চিরন্তন ভালবাসার নাম ক’রে, জীবনটাকে নিয়ে যা খুশি করা যায়। তাহলে, কেন এ সময়ে তুমি এলে?
-জানি না।
-তুমি আমায় জানোয়ার বলেছিলে।
ঝুঁকে পড়ল বিশ্ব। ওর নিঃশ্বাস রমার মুখে পড়ল। চুপ করে রইল সে।
-পেশাদার হতে চাও!
-তার মানে।
মুখ সরিয়ে পিছিয়ে গেল রমা। পিছনে দেয়াল। শব্দ হল। বিশ্বর হাতটা কাঁধ থেকে খসে পড়েছে। হাত বাড়িয়ে আবার রমার কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরল। দাঁত দিয়ে গুঁড়িয়ে গুঁড়িয়ে বিশ্ব কথা বলল।
-জানোয়ারের কাছে এসেছ কেন? প্রেমের ব্রত পালন করতে? বল, বল?
ঝাঁকুনি দিল বিশ্ব। অস্ফুটে রমা কি যেন বলল। রাস্তা থেকে শব্দ এল। ভিজিলেন্স পার্টি লাঠি ঠুকে চলেছে। দোতলার নর্দমায় কেউ জল ঢালল। মা-মরা বেড়ালবাচ্ছাটা আবার ভয় পেয়েছে।
-আমার লাগছে। ছেড়ে দাও।
বিশ্বর হাত ছাড়াতে রমা চেষ্টা করল। আরো জোরে ধরে রইল বিশ্ব।
-ছাড়তে পারি, কথা দাও আমার সঙ্গে মনের কোন সম্পর্ক রাখবে না।
-না, কথা দেবো না।
-তোমায় বিয়ে করবো না, জেনে রেখ।
-কেন? তোমার কাছে এসেছি ব’লে?
-না, আমরা কেউ কাউকে ভালবাসি না ব’লে। আমাদের মন আর পরিষ্কার নেই। নিশ্চিন্তে সুখের জীবন, কোনরকমেই আর আমরা পাব না। নদীর মতন আমরা এঁকেবেঁকে এগোব। কোনদিনই দু’পার ছুঁতে পারব না। কি হবে বিয়ে ক’রে, সংসার পেতে!
বেড়াল কাঁদছে। ছাদের দরজার শিকলিটা হাওয়ায় খুটখুট করল। পায়রার বাসায় বোধহয় ইঁদুর ঢুকেছে। বড় রাস্তার গর্তে লরীর চাকা পড়ল। রমার কাঁধ থেকে হাত নামাল বিশ্ব। ওর আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরল রমা।
-আমার বয়স কত জান?
-এখন তা’ দিয়ে কি হবে?
-জান, আভা আমারই বয়সী, ওর ঘর হয়েছে, ভালবাসার লোক হয়েছে, ও মা হবে!
ফিসফিস ক’রে বলা কথাগুলো বিশ্বকে ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়ল। পাক খেল। পাকিয়ে স্থির হয়ে রইল ওদের দুজনের মাঝে।
-তা’তে আমার কি?
-আমি পালাতে চাই। তুমি আমায় বিয়ে কর। নাহ’লে কি ক’রে বাঁচব।
হঠাৎ জড়িয়ে ধরল রমা। গলা থেকে প্রাণপণে হাত দুটো ছাড়িয়ে নিল বিশ্ব।
-এমন করে বাঁচা যায় না। আর আমরা মিলতে পারব না। আমাদের অনেক চাই, অনেক কিছু চাই। আমরা লোভী, স্বার্থপর হয়ে গেছি।
বুকের কাছে হাত ঠেকল। ঝটকা দিয়ে বিশ্ব সরিয়ে দিল। হাত দুটো আবার আঁকড়ে ধরতে এল। পিছিয়ে গেল বিশ্ব।
-নেমে যাও। নেমে যাও।
-তোমায় ভালবাসি।
ফিসফিসে কথাটা আবার পাকিয়ে উঠল ওদের মাঝে। কথাটাকে গুঁড়িয়ে দেবার জন্যেই বিশ্ব হাতটা ছুঁড়ল। দাঁতে দাঁত ঠোকার শব্দ উঠল। দেয়ালে টলে পড়ল রমা।
-আমায় বাঁচতে দাও। তুমি আমায় মেরো না।
দু’হাত মেলে রমা ঝাঁপিয়ে পড়ল। আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরল বিশ্বর পিঠ। জ্বালা করছে। ছাল উঠে গেছে। ঘাম গড়িয়ে নামছে। রমা ফোঁপাচ্ছে।
আলতো ক’রে কাঁধে হাত রাখল বিশ্ব। হাতটা কাঁধ বেয়ে গলায় উঠল। তুলতুল করছে মাংস। চাপ দিল। আঙুলগুলো ছড়িয়ে গলাটাকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে, মুঠোটা ছোট করতে শুরু করল।
শব্দ হচ্ছে। টিউব থেকে অল্প অল্প বাতাস সরু নল দিয়ে যেন বেরিয়ে আসছে। হাঁ করে মুখ তুলল রমা। পিঠের হাত ঝুলে পড়ল। শব্দ করল মুখ দিয়ে। তারপরই বিশ্বর মুখে ঘুঁষি মারল।
আলগা হয়ে গেছে মুঠোর চাপ। ঠোঁট চাটল বিশ্ব। নোনতা স্বাদ। ঘাম নামছে। জ্বালা করছে পিঠ। জোর নিঃশ্বাস পড়ছে। মুখটা যন্ত্রণায় ভোঁতা হয়ে গেছে। বেড়াল বাচ্ছাটা সমানে ডাকছে। খুটখুট শিকলি নড়ল।
হাত বাড়াল বিশ্ব। চুল, গাল, গলা, কাঁধ। টেনে আনল। নোনতা স্বাদ। রমার ঠোঁট কেটে গেছে। নোনতা স্বাদ। রমার গাল গলা কপাল ঘামে ভেজা।
শব্দ হল। টিউব থেকে যেন বাতাস বেরিয়ে আসছে। বিশ্বর চিবুকে লেগে খসখস করল রমার চুল। মুখ তুলল। আবার নোনতা স্বাদ। বিশ্বর বুকে শব্দ করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলল রমা।
