কড়া নাড়ার শব্দ হ’ল। ওরা কথা থামাল। কড়ি-বরগার ঢাকনাটা নেমে এল। দু’ফোঁটা আলোর বিন্দুর মত ওরা স্থির হয়ে রইল। আবার কড়া নাড়ল।
-বোধ হয় রমা এসেছে।
-তুমি এবার শুয়ে পড়।
-তুমি আর জেগে থেকো না।
-না। তুমিও।
-হ্যাঁ, আমিও।
.চান করার পর সামান্য হাওয়াও গায়ে লাগলে হালকা লাগে নিজেকে। ফুটের ওপর পায়চারি করছে চিনু। রাত করে বাড়ি ফিরে খেয়েই ঘুম। ঘুমোলেই রাত কাবার। কিন্তু ঘুম আসার আগে পর্যন্ত সারাদিনের ঘাম আর ময়লায় চটচটে শরীরটাকে নিয়ে অস্বস্তি ভোগ করতে হয়। আজ চান করেছি। সকাল সকাল খেয়েছি। খাওয়ার পর পায়চারি করছি। নিজেকে হালকা লাগছে। অন্যদিনের থেকে আলাদা লাগছে। স্নায়ুগুলো ঢিলে হয়ে গেছে।
ফুটপাথে সারি দিয়ে ঘুমোচ্ছে অনেকগুলো মানুষ। দুধারে দুটো সারি। মাঝখানে চলবার পথ। চলতে গিয়ে একজনের পায়ে চিনুর পা বেধে গেল। লোকটার ঘুম তাতে একটুও চটকাল না।
সাবধানে হাঁটল চিনু। দাঁড়িয়ে মাথাগুলো গুনল; দু’সারিতে ত্রিশের কাছাকাছি। খালি গা, জড়াজড়ি করে ঘুমোচ্ছে। দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। লোকগুলো অবাঙালী। কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। গতর খাটিয়ে রোজগার করে। রাস্তায় ঘুমোয়।
একটা মিষ্টির দোকান। দোকান বন্ধ হবে তাই ধোয়া মোছা চলছে। ফুটপাথে জল গড়াচ্ছে। পাশে পানের দোকান। খোলা। আবার ঘুমন্ত মানুষের সারি। চিনুর মনে পড়ল এইখানে সে দাঁড়িয়েছিল বুলগানিন খ্রুশেভকে দেখার জন্য। এ রাস্তা দিয়ে যাবার কথা থাকলেও সেদিন ওরা যায়নি। কয়েকঘণ্টা মিছিমিছি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ও পারের বাড়িটার বারান্দায় তিনটে মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। খুব সাজগোজ করা। তিন বোন মনে হয়েছিল। কিছুদিন আগে শোনা গেল-ওরা একসঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। বোম্বে থেকে পুলিশ ওদের ধরে আনে। কালকেও ওদের দেখেছি সাজগোজ করে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।
চিনু আর একটু এগোল। মানুষের সারি এখানে শেষ হয়েছে। খাটিয়া পেতে ঘুমোচ্ছে একজন। কোলে একটা বাচ্ছা। গোটা দশেক ছাগলও ঘুমোচ্ছে খাটিয়ার ধারে।
একটা রিকশা থামল। সওয়ারি মাতাল। রিকশাওলা সন্দেহ করছে, লোকটার কাছে যত পয়সা আছে তা দিয়ে ভাড়া দেবার সামর্থ্য হয়ত হবে না। বিড়বিড় করে কি বলে লোকটা নেমে পড়ল। পকেট থেকে একমুঠো রেজগি বার করে রিকশাওলার হাতে দিয়ে, কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। পয়সাগুলো গুনে পেট কাপড়ে বাঁধতে বাঁধতে চিনুকে দেখে শুধু শুধুই রিকশাওলা হাসল।
-আস্তে ভাই।
ঝাঁটা চালান থামাল মিষ্টির দোকানের ছোকরাটা। রাস্তায় নেমে ফুটপাথটাকে এড়িয়ে গেল চিনু।
কয়েক সেকেণ্ড অপেক্ষা করতে হয়েছিল ওকে। তাতেই মুখে বিরক্তির দাগ তুলেছিল। বোধহয় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে, তাই একটু তরও সইছিল না। আমার উচিত হয়নি একটুর জন্যও ওর কাজ থামান।
-ওম্মা, চিনুদা আকাশের দিকে তাকিয়ে কাকে খুঁজছেন?
চমকে উঠল চিনু। সিনেমা দেখে ওরা ফিরছে। রাস্তাটা পরিষ্কার। দূর থেকেই দেখা যায় কেউ হেঁটে এলো। অথচ সে দেখতে পায়নি।
-তোমাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে ভাবলুম যাই খোঁজ করি।
-তাই বুঝি এখানে দাঁড়িয়ে আকাশে আমাদের খুঁজছেন। খুব বাবা দরদ দেখালেন। ভয় নেই আপনার বোনকে নিয়ে পালাব না। এই নিন।
রমাকে ঠেলা দিল আভা। সুবল হেসে উঠল। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে আভার ভাইবোনেদের। ওরা হাঁটতে শুরু করল।
-চিনুদাকে বলেছিলুম আমাদের ওখানে যেতে, তা বুঝি আর মনে নেই। থাকবে কি করে? বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা তাদের ফেলে কি আর আমাদের কথা মনে থাকে।
-বা রে, যার বাড়ি, যে কত্তা সে যদি না বলে তাহলে যাব কেন?
-আর গিন্নী বললেই যত দোষ। ওগো একবার যেতে বলতো। দেখি কেমন যায়।
-নিশ্চয় আসবেন।
-আর রমাকেও সঙ্গে করে আনবেন।
-আনবো।
সুবল বা আভা লেখাপড়া করে না। ওরা যা বলে তা অন্তর থেকে বলে। অন্তরের কথা শোনা মহাপুণ্য। এতদিন এমন কথা শুনিনি। মন স্নিগ্ধ হচ্ছে। আমি বললুম, ওদের বাড়ি যাব। এটাও আমার অন্তরের কথা। অন্তরের কথা বলাও মহাপুণ্য। ওরা আমার পুণ্য সঞ্চয়ের কারণ। ওরা মনের গ্লানি ধুইয়ে দেয়।
আভাদের বাড়ি আগে পড়ে। ওরা বাড়ি ঢুকে গেল। চিনু আর রমা নিজেদের পথ ধরল।
-কেমন দেখলি।
-ভাল।
রমা আড়ষ্ট হয়ে উত্তর দিল। চিনুর এ ধরনের প্রশ্নে সে অভ্যস্ত নয়।
-যাবার সময়ও কি হেঁটে গেছলি?
-না, ট্যাক্সিতে।
-হেঁটেই যেতে পারতিস। মিছিমিছি কতকগুলো টাকা নষ্ট হল।
-আমিতো বলেছিলুম। আভা শুনল না।
-খোঁড়াচ্ছিস কেন?
-জুতোটা ছোট হয়ে গেছে।
-জুতো কখনো ছোট হয়! হাঁটার অব্যেস নেই বলে এমন হয়েছে। বেরোতে পারিস তো। রোজ একবার পার্কটায় অন্তত চক্কোর দিয়ে আসবি।
বাড়িতে ওরা ঢুকল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। রকটা এক জায়গায় গর্ত হয়ে গেছে। রমাকে হাতে ধ’রে জায়গাটা পার করে দিল চিনু।
-আজ কাবেরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
-ও অনেকদিন আসে না।
-নার্স হবে বলে ট্রেনিং নিচ্ছে। হোস্টেলেই থাকে। তোকে একদিন নিয়ে যাব ওর কাছে।
এরপর কড়া নাড়ল চিনু।
ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ, উঠছে পড়ছে। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এ বাড়ির সব ঘরের সব মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। গোটা বাড়িটাই ভারী ঠেকছে।
চুড়িকটা কনুইয়ের দিকে চেপে বসিয়ে পা-টিপে ঘর থেকে রমা বেরোল। দালানে দাঁড়িয়ে চোখে অন্ধকার সইয়ে দরজার খিল খুলল। সিঁড়িগুলো মুখস্থ। বিশ্বর ঘরের জানলায় পৌঁছল নিঃশ্বাস বন্ধ ক’রে।
