ভারী লাগছে। গোটা শরীরটা টলমল করছে। পা পড়ছে না ঠিকমত। আমি ফিরছি। আমার ফেরার একটা অর্থ আছে। কিছু একটা করে ফিরছি। আমি কি করলুম! কি উদ্দেশ্য পূর্ণ হল? এতে সংসারের কতটা লাভ হবে? চুলোয় যাক লাভ লোকসান।
আকাশে একটা আলো। কলকাতার সব আলো। কলকাতাটা ভীষণ সুন্দর। মানুষ কেন এই সময় আকাশের দিকে তাকায় না। উচিত। অমল ঠিকই বলেছিল, প্রত্যেক মানুষ যেন আকাশের কথা ভাবে। নরম নরম। গভীর গভীর। মস্ত বড়। বিরাট। আকাশকে দেখলে শ্রদ্ধা হয়। আকাশকে দেখলে বিশ্বাস হয়। আকাশের দিকে তাকাবো।
এখন কোথায় যাই! পয়সা নেই, হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়ি অনেক দূর। কটা বাজে? যটাই বাজুক। আজ তাড়াতাড়ি ফিরব। আজ তাড়াতাড়ি ঘুমোব। কিন্তু তার আগে সেই লোকটার কাছে যেতে হবে। ও চেষ্টা করলেই কণ্ডাক্টারীর চাকরিটা হয়ে যাবে। এত রাতে গেলে কি রাগ করবে? করুক, গরজ আমার। কাবেরী বলল, বি-এ পরীক্ষাটা দিতে পারতেন। মাসকয়েক যদি খাটি তা হ’লে পাশ করে যাব। কাবেরীও খাটে। আহ কি সুন্দর এই দোতলা বাসগুলো!
.মাধবী বিছানা ছেড়ে উঠল। আজ অন্যদিনের থেকে শিগগির চিনু বাড়ি ফিরেছে। ভাত খেয়ে আবার বেরিয়েছে। সানু এখন ঘুমে কাদা। রমা সিনেমা দেখে ফেরেনি।
দিনেশের বিছানার ধারে মাধবী দাঁড়াল। দিনেশ এখনো ঘুমোয় নি।
-শরীর ক্লান্ত লাগছে বলছিলে কেন?
-বললুম না গঙ্গায় চান করেছি!
-হঠাৎ চান করতে গেলে কেন! এ বয়সে কি অনিয়ম সহ্য হয়?
-ইচ্ছে হ’ল কেমন যেন।
বিছানায় সরে গেল দিনেশ, মাধবীকে বসবার জায়গা করে দেবার জন্য।
-তারপর যদি অসুখ-বিসুখ হয়?
-হবে না। অনেকদিন সাঁতার কাটি না, আজ কাটলুম।
-কেমন লাগল?
-আমার বয়স বেড়েছে মাধু। আমি বুড়ো হয়ে গেছি।
অন্ধকার ঘরটা যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেল দিনেশের গলার স্বরে। মাধবী ওর পায়ের ওপর হাত রাখল। জোয়ান বয়সে দিনেশ মাধু ব’লে ডাকত।
-চেষ্টা করলুম সাঁতরাতে আগের মতন। পারলুম না। ভেসে রইলুম। ভাসতে ভাসতে অনেকদূর গেলুম, তারপর খেয়াল হ’ল বাড়ি ফিরতে হবে।
-তাই বুঝি জল থেকে উঠলে!
-হ্যাঁ, এ বয়সে আর ভাসা যায় না। তাছাড়া রাতও হয়ে গেছে। অন্ধকারে কোথায় ধাক্কা খাব শেষকালে। তাই ডাঙ্গায় উঠে পড়লুম।
-ভালই করেছ।
খসখস শব্দ হল। দিনেশের পায়ের চেটোয় মাধবী হাত বোলাচ্ছে। শব্দটা অন্ধকারকে চষে নরম করে দিচ্ছে। নরম অন্ধকারে দিনেশ টান টান ক’রে পা ছড়িয়ে দিল।
-ওই গঙ্গাতেই বনমালী ডুবে মরেছিল। অথচ কি আশ্চর্য দেখ যতক্ষণ জলে ছিলুম, সে কথাটা মনে পড়েনি।
-তাই তো নিয়ম। ছেলেমেয়েরা এ সংসারে ক’ত বুড়ো-বুড়ী দেখছে। তাই বলে কি তারা বয়সের কথা ভাবে!
-মাধু, ভাল করে উঠে বোস।
সরে গেল দিনেশ। দু’পা তুলে মাধবী বিছানায় গুছিয়ে বসল। দিনেশের পিঠে হাত রাখল।
-সেই কাটা দাগটা এখনো রয়েছে।
-আছে! কি করে বুঝলে?
-এই তো জায়গাটা কেমন তেলা।
মাধবী হাত বুলোল। শব্দ হল না। অন্ধকার জমাট বেঁধে রইল ওদের আশেপাশে।
-আমার খেয়াল ছিল না।
-আমারও।
-ও জায়গাটা আর তেলা থাকবে না। চামড়া ক্রমশই কুঁকড়ে আসছে।
-হ্যাঁ, বুড়ো হয়ে যাচ্ছ। আমরা দুজনেই হয়ে যাচ্ছি।
-হ্যাঁ, আমরা দুজনেই।
ঘরটা বড় হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার টানটান হয়ে উঠেছে। কাঁপছে।
-ছেলেমেয়েরা কি আমাদের কথা ভাবে?
দিনেশ চেপে ধরল মাধবীর আঙুল কটা। আঙুল কাঁপছে।
-জানি না।
-কেন, তুমিই তো বললে, এইটেই নিয়ম।
-অন্য কথা বলো।
-সেই ভাল। নিয়ম আমরা পালটাতে পারি না। অনেক জিনিস পালটান যায় না। আমাদের কথা মনে আছে?
-আছে।
মাধবী কাত হয়ে দিনেশের পাশে শুয়ে পড়ল। ওর মাথায় গাল রাখল দিনেশ। গালে হাত রাখল মাধবী।
-তুমি দাড়ি কামাও নি।
-ছেলেমেয়েরা এখুনি ফিরবে।
-উঠে যাব?
-না না, আর একটু থাকো।
মাধবীর চুলে দিনেশ হাত বোলায়। শরীরটাকে আলগা ক’রে মাধবী শুয়ে তাকে। নিঃশ্বাস ফেলে দুজনেই জোরে জোরে। হঠাৎ একটা আরশুলা উড়ে আসে মাধবীর গায়ে। ধড়মড় ক’রে ওঠে সে।
-উঠো না। পরে মেরো’খন।
-তুমি ঘুমোতে পারবে না। তোমার ঘুম দরকার। নয়তো শরীর ম্যাজম্যাজ করবে, এতদিনের অনভ্যাস।
-পুরনো অভ্যাস কিছু কিছু আবার ঝালাই করা দরকার। পইতে পুড়িয়ে ভগবান হয়ে বসে থাকলে আর চলবে না। অফিসে কথা উঠেছে, ছাঁটাই হবে।
-তোমাকেও করবে?
-জানি না। অনেক পুরনো লোকওতো ছাঁটাই হয়।
-কি করবে?
-কি জানি। বুঝতে পারি না কি করব। দিনকালতো আগের মত নেই। ছেলে-ছোকরারা যা করবে, তাই করব। ওরা আমাদের থেকে বেশি বোঝে।
-হ্যাঁ, অনেক জিনিস আমরা এখনো বুঝি না।
-ওরাও এখনো অনেক কিছু বোঝে না। বয়স হলে বুঝবে।
-বয়স হলে অনেক কিছু লাভ হয়। আবার খোয়াও যায়।
-চিনু না বুঝে নিজেকে নষ্ট করছে।
-ওদের কথা ভাবলে ভয় করে।
-আমরা শুধু ভাবনা নিয়েই বেঁচে থাকব।
ঘরটা বড় হয়ে গেছে। অন্ধকারগুলো থিতিয়ে নেমে এসেছে। কড়ি-বরগার ঢাকনাটা খুলে যেন আকাশ দেখা যাচ্ছে। আকাশ তারায় ভরতি। তারার আলোয় ওরা দুজন শুয়ে আছে। ওদের নিঃশ্বাসে কাঁপছে তারাগুলো।
-আমাদের আর বাড়ি করা হ’ল না।
-আর আমরা পারব না।
-ছেলেরা করবে।
-আজকাল গ্রামে খুব দুর্ভিক্ষ হচ্ছে। মানুষ মরছে।
-আমি গ্রাম দেখিনি। কলকাতার বাইরেও যাইনি।
-আমাদের আর কোথাও যাবার উপায় নেই।
