-কি বলছিলেন?
-কিছু না।
ঘাসের ওপর মুখোমুখি বসল দুজনে। অবাক লাগছে চিনুর। এমন একটা জায়গাও তা হলে আছে। মেয়ে-পুরুষ জোড়ায় বসে গল্প করছে। নিজেদের নিয়েই সবাই ব্যস্ত। অন্যের সম্পর্কে অসভ্য কৌতূহল নেই। কাবেরীর মত এরাও সারাদিন খেটে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এখন দু’দণ্ড জুড়িয়ে নিচ্ছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিনু তাকাচ্ছে। কাবেরী দেখছে চিনুর ভাবভঙ্গী। দূরের একটা ওয়ার্ড থেকে মেয়ে গলায় কে চীৎকার শুরু করেছে।
-ওখানে কী হচ্ছে!
-হয়তো কোন পেসেণ্ট। ও রকম প্রায়ই হয়।
চিনু এখানে নতুন, তাই উত্তেজিত হয়ে উঠল সহজেই। চীৎকারটা এখনো চলছে। মাঠের অন্য মানুষরা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল না। সকলেই ব্যস্ত। অন্যদিকে কান দেবার ফুরসত নেই।
এখানকার মানুষগুলো কি নিষ্ঠুর? এই বীভৎস চীৎকারে কেউই চঞ্চল হ’ল না। অথচ আমি হচ্ছি। নাকি আমার কোন উদ্দেশ্য নেই বলেই চট করে বাইরের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে পড়ছি। এখানে যারা আছে তারা কেউই দরকার ছাড়া বসেনি। এ দরকারটা হাঁফ ছাড়ার জন্য। যতটুকু পারা যায়, সারাদিনের একঘেয়ে কষ্টের হাত থেকে কিছুটা বৈচিত্র্য ছিনিয়ে নিতে সবাই ব্যস্ত। চীৎকারে কে কান দেবে? অথচ হয়তো, ওখানে একটা মানুষ মারা যাচ্ছে।
-চুপ করে আছেন যে!
-কি বলব।
-যা হোক। ভাল লাগে না চুপ করে থাকতে। যাহোক কিছু বলুন।
চিনু ঘাড় নামিয়ে কয়েক মুঠো ঘাস ছিঁড়ল। বলার মত একটা কথাও মুখে আসছে না।
-মালা নেবেন দিদি।
গামছায় তৈরী থলে হাতে, পাশে দাঁড়িয়েছে এক বিধবা।
-নিন দিদি একজোড়া। চার পয়সা ক’রে।
চিনুর দিকে তাকালও না। এখানকার মেয়েদের ও বোঝে। ফুল বড় নরম জিনিস। দু’দণ্ড জিরোবার জন্য যে মেয়েরা মাঠে এসেছে, তাদের কাছে এখন ফুল ভাল লাগবে।
দু’ছড়া রজনীগন্ধার মালা কাবেরীর সামনে ধ’রল। সরু সরু মালা। ওর দাম চার পয়সা হওয়া উচিত নয়।
দু’আনা দিয়ে মালা কিনল কাবেরী।
-হঠাৎ কিনলে যে!
-এমনি।
-বড্ড দাম।
-হোক। গরীব মানুষ!
লজ্জা পেল চিনু। কাবেরী রোজগার করে। ওর সঙ্গে মনের তফাত হবেই।
মালাজোড়া দুজনের মাঝখানে, ঘাসের ওপর রাখল কাবেরী। ফুল বড় নরম জিনিস।
কাকে দেখে, ‘আসছি’ বলে কাবেরী উঠে গেল। হেসে মহিলাটি কথা বললেন। তাকালেন কয়েকবার মাঠের দিকে। ফিরে এল কাবেরী।
-আমাদের স্টাফ, অনিমা-দি। বাড়ি থেকে ফিরলেন। বেশ লোক।
-মনে হ’ল যেন আমার সম্বন্ধে কথা হ’ল।
-হ্যাঁ, জিগ্যেস করলেন কার সঙ্গে কথা বলছি।
-কি বললে?
-বললুম আমার ভিজিটার।
-ভিজিটার কি?
-বাঃ যারা দেখা করতে আসে, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব তারাই ভিজিটার।
-বাড়ি থেকে কেউ আসে না?
-না, দরকার কি। আমিই তো বাড়ি যাই।
মালা দু’টো আঙুলে জড়াতে লাগল কাবেরী। দুটি ছেলেমেয়ে রেলিঙের ওপর এসে বসল। হোস্টেলের দোতলার বারান্দার হঠাৎ ক’টি মেয়ে, হৈ চৈ করে কি একটা কাড়াকাড়ি করতে করতে আবার ঘরে ঢুকে গেল। এ্যাম্বুলেন্সের হেডলাইটের আলো মাঠটাকে ঝলসে দিয়ে ঘুরে গেল। টালির শেডের নিচে অনেকক্ষণ একাকী দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি মাথা নিচু করে হোস্টেলের দিকে চলে গেল। মুঠো-মুঠো ঘাস ছিঁড়ল চিনু।
-তাহ’লে তোমার কোন ভিজিটার নেই।
-না। আমার কোন ভিজিটার নেই।
হাতে মালা জড়ান বন্ধ করল চিনু। মুখ তুলে তাকাল সে আকাশের দিকে। কলকাতার সব আলোর ছাট গিয়ে লেগেছে আকাশে। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ মিলেমিশে কোথাও চলেছে। মেঘের গায়ে ধাক্কা খেয়ে কলকাতার সব আলো ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। আকাশটা কুচকুচে। আকাশটা এখন নরম নরম। আকাশটা এখন গভীর গভীর। আকাশটা এখন মস্ত বড়। আগাগোড়া দেখা যাচ্ছে না। তবু বোঝা যাচ্ছে ওটা বিরাট।
কাবেরীর হাতে ফুল। ফুল নরম। কাবেরী নরম। ওর থুতনি পায়রার মাথার মত। ওর ঘাড়ের বাঁকান ছাঁদটা কচি শশার মত। ওর গোড়ালি বাছুরের নাকের মত। ওর চুল মাকড়সার ঘন জালের মত।
ঘাড়ে একটা ব্যথা করছে। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বেঁকে যাচ্ছে। গলার কাছে বাতাস জমেছে। সারা শরীরে নতুন ব্লেডে দাড়ি কামাবার আমেজ লাগছে। এখন আমি কাবেরীকে কি কথা বলব!
-তোমার খাওয়া হয়েছে?
-হ্যাঁ।
-কি খেয়েছ?
-এখানে যা দেয়।
-তুমি রোগা হয়ে গেছ।
এখন আমি কাবেরীকে কি বলব!
-তোমার সঙ্গে কি অদ্ভুতভাবে দেখা হল। ভাবতেও পারিনি। একদিন তোমার কলেজে গেছলুম, খুঁজতে।
-কবে!
-অনেকদিন হ’য়ে গেল।
-বাড়ি গেলেন না কেন?
আর কি বলব কাবেরীকে।
-আজ আমি জুতো কিনব বলে যাইনি। এমনি দর কচ্ছিলুম।
-কেনা তো দরকার।
-হ্যাঁ।
-জামাটাও ছিঁড়ে গেছে।
-হ্যাঁ। একটা কিনবো। পুজো না গেলে কাপড়ের দাম কমবে না।
-হ্যাঁ।
-ডিউটির পর কি তুমি একলা ঘুরে বেড়াও?
-হ্যাঁ।
ঝমঝম করে কোথায় ভারি কড়া নাড়ার শব্দ হল। উঠে দাঁড়াল কাবেরী।
-এবার চলি।
-যাবার সময় হল?
-আমাদের আর বাইরে থাকার নিয়ম নেই।
-আচ্ছা যাও।
-ওই পর্যন্ত চলুন।
হোস্টেলের দরজার কাছে এসে ওরা দাঁড়াল। আরো অনেকে সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কথা যেন এখনো ফুরোয় নি।
-আসবেন না আর?
-আসবো। তোমার কি রোজ এই সময় ছুটি থাকে।
-না, তবে কাল ছুটি আছে।
-আসবো। আজ চলি।
-এটা নিয়ে যান।
একটা মালা হাতের মুঠোয় দলা পাকিয়ে এগিয়ে ধরল কাবেরী। চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাল চিনু। কেউ জানে না কি আছে ওর মুঠোতে। চিনু হাত বাড়িয়ে দিল।
