-কোথায় যাবে?
-চায়ের দোকানে।
-চল।
খুঁজতে খুঁজতে একটা চায়ের দোকান পেয়ে গেল। দোকানটা ওদের জন্য মোটেই তৈরী ছিল না। চমক খেয়ে একটা টেবিল খালি হয়ে গেল। বাচ্ছাটার নড়াচাড়ায় অনেকখানি ছেলেমানুষি ভাব এল। চেয়ার থেকে পা নামিয়ে কাপড়টা টেনে দিল ক্যাশ-বাক্সের লোকটা। ছাড়া ছাড়া কথা শুরু হল বাকি দুটো টেবিলে।
-কি আছে কি?
-চা, টোস, মামলেট, বিসকুট।
-আর?
-আর কিছু নেই।
-কি খাবেন?
-কিছু না, শুধু চা।
-খান না।
-না।
বাচ্ছাটা তবু কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। চিনুর বিশ্রী লাগল দোকানটা। ঘিঞ্জি, নোংরা। না ঢুকলেই হোত। বেরিয়ে যাবার পর লোকগুলো নিশ্চয় নোংরা আলোচনা শুরু করবে। চা’টাও বিচ্ছিরি। এখানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে, অসুখ-বিসুখ আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ার মত, নিরীহ বিষয় ছাড়া, অন্য বিষয়ে মুখ খুলতে পারে না।
মুখ বুজে চা খেল দুজনে। কথা হয়েছিল বাড়িতে কে কেমন আছে জিজ্ঞাসা করে। খাওয়া শেষ হতেই একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে কাবেরী দাম চোকাল। তার ধারণা হয়তো চিনুই দামটা দিয়ে দেবে। যেন আহত হয়েছে এমন একটা মুখের ভাব করল চিনু।
-কোনদিকে যাবেন?
-তুমি কোন দিকে?
-ঠিক নেই, যেদিকে হয়।
-ফেরার কোন নিয়ম নেই!
-আছে। সাড়ে ন’টার পর সই করে ঢুকতে হয়।
-এখন কটা?
-য’টাই হোক না। আপনার তো তাড়া নেই, চলুন না বেড়াই। সারাদিনে যা খাটুনি আর কিছু ভাল লাগে না।
মুখের দিকে তাকাল চিনু। চান করা তাজা মুখ। বোঝা যায় না যে শরীরের ওপর দিয়ে খুব খাটুনি গেছে।
-কি ভিড় দেখেছেন রাস্তায়।
-হ্যাঁ পুজো এসেছে তো!
-শুধু পুজো নয়, সব সময়েই এমন ভিড়।
-হ্যাঁ।
-একটু বসার জায়গা পর্যন্ত কোথাও নেই।
-কোলকাতাটা বিশ্রী হয়ে উঠেছে।
-গোলদীঘিতে যাবেন?
-চল।
কড়কড়ে মাড় দেওয়া ধুতি পাঞ্জাবি পরলে এমন অবস্থা হয়। কাপড়গুলো ফুলে ফেঁপে থাকে, গায়ে লাগে না। মনে হয় শরীরটা আ-ঢাকা। অস্বস্তি হয় খুব। তেমনি অস্বস্তি লাগছে এখন। সম্পর্কটা শুধু আলাপের। বিশেষ কোন কাজেও আমি যাচ্ছি না। ও ডাকল, আমি না বললুম না। তবু অস্বস্তি! ওকে দেখে মনে হয় খুশি হয়েছে। আমারও খুশি হবার কথা। হচ্ছি না। গোলদীঘিতে গিয়ে যদি বসি তা হলে কথা হবে আমাদের। কাজ-কর্ম, সাহিত্য, বন্ধুবান্ধব, রাজনীতি? ওসব ভাল লাগে না। তা হলে আর কি বলার থাকে।
-আপনি এখন কি কচ্ছেন?
-আগের মতই আছি।
-চাকরি পাননি!
ওরা দুজন কথা না বলে হাঁটল কিছুটা।
-বি-এ পরীক্ষাটা তো দিতে পারতেন।
চিনু কথা বলল না। আরো কিছুটা হাঁটল দুজনে।
-আপনার একখানা বই আমার কাছে আছে।
-থাক। আমার আর দরকার নেই।
-ডিউটির পর যে সময়টা থাকে তাতে বাড়ি যাওয়া যায় না। যেতে ইচ্ছেও করে না। সংসার সেই একই ধরনের রয়ে গেছে। একটুও বদলায়নি। বাড়ি গেলেই আরো ক্লান্ত লাগে।
কাবেরীর গলার স্বরে চিনু বুঝল সত্যিই ওকে খাটতে হয়।
-তোমার আগে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ ছিল না?
হাসল কাবেরী। ব্লাউসের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা ব্যাগ বার করে দেখাল।
-ওসব বাতিল করে দিয়েছি।
চিনু এবার লক্ষ্য করল, সাজগোজ বদলে গেছে কাবেরীর।
-তুমি বদলে গেছ।
-বদলাবো না?
পাল্টা প্রশ্ন করল কাবেরী। অবশ্য উত্তরটাও তারই দেবার কথা ছিল না। গোলদীঘি এসে গেছে।
-চিনেবাদাম খেতে কিন্তু বেশ লাগে।
-আমার একটুও ভাল লাগে না। একটা একটা করে ভেঙে খাওয়ার ধৈর্য আমার নেই।
-ছাড়ানোও পাওয়া যায়।
-না থাক। তুমি যদি খেতে চাও খেতে পার, আমি খাব না।
বাদাম না কিনে ওরা গোলদীঘিতে ঢুকল। একটা বেঞ্চও খালি নেই। ঘাসের ওপর এমনভাবে লোক বসেছে যে নীচু সুরে ছাড়া কথা বলা যাবে না।
-কোলকাতাটা বিশ্রী হয়ে উঠেছে।
-হ্যাঁ, একটুও বসার জায়গা নেই। চলুন আমাদের ওখানে।
-কোথায়, তোমাদের হোস্টেলে!
-হ্যাঁ, বসার জায়গা আছে।
হাসপাতালের বড় গেট ছাড়িয়ে মিনিট দুই তিন হাঁটার পর কাবেরী বললঃ
-ওই আমাদের হোস্টেল।
চার তলা বাড়ি। তিন তলাতেও বারান্দা আছে। চার তলায় নেই। মনে হয় ওটা নতুন হয়েছে। বাঁদিকের বাড়ির ছাঁচটা অন্য ধরনের। বোধহয় পরে তৈরী করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
-চার তলায় থাকি। ওই জানলাটা আমাদের ঘরের।
হারমোনিয়াম বাজিয়ে কে গান করছে। চিনু শুনল। সুর শুনে বোঝা যাচ্ছিল না। কানে এল ‘মহাবিশ্ব’ আর ‘করুণা’ শব্দ দুটো। আঁচ করল রবীন্দ্রসঙ্গীত।
-ওই বাড়িটা কিসের?
-ডেলিভারি কেস ওখানে হয়। মাঝখানটায় নার্সারি। দোতলায় অপারেশন হয়।
-ওরা কোথায় যাচ্ছে?
সাদা পোশাকে গুটি পাঁচ-ছয় মেয়ে গল্প করতে চলেছে।
-ডিউটিতে যাচ্ছে।
একটা ট্যাক্সি এসে থামল। জমকালো শাড়ি পরা একটি মেয়ে নামল, সঙ্গে পুরুষ।
-ও কে?
-প্রতিভাদি। হালে বিয়ে হয়েছে। রেজিস্ট্রি।
-ওরা কারা।
এক টুকরো মাঠের দিকে তাকিয়ে চিনু বলল। কয়েক জোড়া মেয়েপুরুষ বসে। মাঠটা আবছা। হোস্টেলের দেয়ালে একটা আলো আছে। তবে মাঠের অন্ধকার ভাঙার পক্ষে যথেষ্ট নয়।
-চলুন ওখানে বসি।
-ওরা কারা?
কথা না বলে কাবেরী এগিয়ে গেল। চিনু পিছু নিল। হোস্টেল থেকে হাসপাতালে যাবার পথটা টালি দিয়ে ঢাকা। তার গায়েই এই মাঠটা। মাঠের সামনে রেলিঙ। মাঝখানে দুটো ছোট্ট গাছের ঝোপ। অন্ধকারে গাছ চেনা যায় না। আলো থাকলেও চিনু গাছ চিনত না।
