ট্রাম রাস্তা পার হয়ে এপারে এল চিনু। কটা বাজে এখন? এতগুলো দোকান, ঘড়ি নেই একটাতেও!
-আসুন বাবু।
-না ঠিক আছে।
-ভেতরে এসে দেখুন না।
দোকানটায় ঘড়ি নেই। শো-কেসের মধ্যের জুতোগুলোর ওপর চোখ বোলাল চিনু।
-ভেতরে আরো ডিজাইনের আছে। আসুন না।
-এটার দাম কত?
-সাড়ে চোদ্দ।
-বিনুনি ছাড়া শুধু স্ট্র্যাপ দেওয়া ওই রকমের চটি আছে?
-আছে।
-ওই রঙের?
-না, শুধু কালো রঙের হবে।
পাশের দোকানের লোকটা ওদের কথা শুনছিল। চিনুকে নড়াচড়া করতে দেখেই ডাকল। হেসে তাকে ছাড়িয়ে হাঁটতে লাগল চিনু। ঘড়ি নেই। যাকগে সময় দেখে কোন লাভ নেই। বরং জুতোর দর করতে করতে সময় কাটান যাবে।
-আসুন বাবু।
-না ঠিক আছে।
-ভেতরে এসে দেখুন।
ভেতরে তাকিয়েই চমকে উঠল চিনু। কাবেরী জুতো কিনছে।
-না, ভেতরে যাব না। এইতো এখানেই কত রকমের রয়েছে।
-আরো অনেক ডিজাইনের আছে। ভাল করে বসে দেখবেন।
-জুতোর ভয়ানক দাম।
-কম দামেরও আছে। দর না পোষায় নেবেন না। তা’ বলে দেখতে দোষ কি!
তিনটে বাক্স কাবেরীর সামনে। হাত নেড়ে কি বোঝাচ্ছে। বোধ হয় পছন্দ হয়নি। কতদিন ওকে দেখি না। পাঁচ-ছ’ মাস! হাত নাড়াটা বদলায় নি। উঠেছে। এবার বেরিয়ে আসবে। দোকানদার কি বলল। দাঁড়াল। ঘাড় ফিরিয়ে কি বলল। মাথা নাড়ল দোকানদার। ও এবার বেরোবে।
-ওমা, চিনুদা!
-আরে, তুমি এখানে কি কচ্ছ, জুতো কিনতে এসেছ?
-হ্যাঁ। বডড দাম। আপনি?
-আমিও। বডড দাম!
-চলুন, না, সস্তায় কোথাও থেকে কেনা যাক।
-চল।
দু’চারটে দোকানের শো-কেস দেখার পরই এদিকের জুতোর দোকান শেষ হয়ে গেল।
-চলুন, ও ফুটে যাই।
-ও ফুটে! আমি ঘুরে এসেছি, ভীষণ দাম।
-আপনি কি কিনবেন?
-আট-দশ টাকার মধ্যে যা হয়।
-আমিও তো তাই কিনব! পুজোর সময় কি এরা দাম বাড়ায়? এইটে কিনেছিলুম ন’ টাকায় আর ঠিক এই জিনিসই চাইল সাড়ে দশ!
চিনু কথা না বলে শুধু তাকিয়ে রইল। কাবেরী এধার ওধার তাকাচ্ছে। ঘষে ঘষে ঘাড়ের ময়লা তুলছে। দু একজন ওদের লক্ষ্য করে গেল। শুধুই পাশ দিয়ে চলে গেল।
-চলুন দাঁড়িয়ে আর কি হবে। আপনি কোন দিকে যাবেন?
-কোন ঠিক নেই। এগারোটার আগে তো বাড়ি ঢুকি না। তুমি কোন দিকে এখন, বাড়ি?
-বারে, বাড়ি কেন, হোস্টেল!
-হোস্টেল!
-হ্যাঁ, দিদি বলেনি?
-না’তো।
-আমি তো নার্সেস ট্রেনিংয়ে আছি।
-পড়াশুনো?
-আই-এ ফেল করেই ছেড়ে দিয়েছি। ঘরে বসে গুরুজনদের দুশ্চিন্তা আর কেন বাড়াই, তাই দুগগা ব’লে লেগে পড়লুম তো এখন।
-কি করে তুমি বুঝলে যে বিয়ের বাজারে তোমার দাম নেই?
-জানা আছে।
খোঁপার কাঁটায় চাপ দিতে দিতে ঘাড়টা কাত করে হাসল কাবেরী। হাসিটা অচেনা মনে হল চিনুর।
-বড় চা খেতে ইচ্ছে করছে।
চায়ের দোকানের খোঁজে এধার-ওধার তাকাল কাবেরী। ভয় ধরল চিনুর। বন্ধুরা যদি কেউ তাদের দুজনকে চা খেতে দেখে, তাহলে নিজেদের মধ্যে খিস্তির ঝড় বয়ে যাবে। বহুদিন নিজেকে এক মিথ্যা অশ্লীল গল্পের নায়ক হতে হবে। এখন যদি কেউ দেখে তবু বলা যাবে-দূর সম্পর্কের এক বোন, হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। অবশ্য এক সঙ্গে বসে চা খেলেও ওই একই সাফাই দেওয়া যায়।
কিন্তু তার থেকেও বড় ভয় চায়ের দামটা কে দেবে! নিশ্চয় আমাকেই দিতে হবে। তাই দেওয়া উচিত। কাছে পয়সা নেই বলা যাবে না। খালি পকেটে কি কেউ জুতো কিনতে আসে!
কি দরকার ছিল মিথ্যা বলার। ইচ্ছা ছিল না তবু মুখে এসে গেছল। ঘাবড়ে গেছলুম কেমন যেন। হঠাৎই দেখা হয়ে গেল, কোন যোগসাজস ছিল না। তবু মনে হল, কাবেরী হয়ত ভাবতে পারে এটা হঠাৎ নয়। তাই কৈফিয়ত একটা মুখে এসে গেল। অমনি অমনি কৈফিয়ত আসে না নিশ্চয়। ওর সম্পর্কে কি আমি অন্যায় চিন্তা করেছি কখনো? ওর শরীরটা ভাল। ওর শরীর নিয়ে চিন্তা করেছি। কুৎসিত চিন্তা। অমন চিন্তা তো পথে-ঘাটে কতবার মনে হয়েছে। আবার মন পরিষ্কার হয়ে গেছে। কাবেরী সম্পর্কে তা হয়নি। শরীর ছাপিয়েও আরো বেশি কিছু গুণ ওর মধ্যে আছে। দেখতে মোটেই সুন্দরী নয়, তবু সব জড়িয়ে ও যেন কেমন। কিন্তু তাই বলে ওকে ভয় করব কেন! আমি কি কিছু অপরাধ করেছি? কাবেরীকে চিন্তা করার অধিকার নেই, ও আমার কেউ নয়, ওর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হবার কোন সুযোগ নেই, হলেও সেটা বৈধ ব’লে চালু-সমাজ-নীতি গণ্য করবে না। সমাজে বাস করি, ছোট থেকেই এই নীতির আওতায় বড় হয়েছি, অথচ গোপনে তাকে অস্বীকার করেছি। আমি অপরাধ করেছি। আমি অপরাধী সমাজের কাছে না কাবেরীর কাছে? সমাজকে দেখতে পাই না, কাবেরীকে পাই। তাই কি ওকে দেখেই মিথ্যা বললাম! কাবেরী কি সমাজ? গোটা না হলেও অংশ তো বটে। একটা মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করা মানেই কি সমাজকে ছুঁয়ে থাকা? কাবেরীকে ভয় ক’রে কি আমি সমাজকেই ভয় করলুম? এমনি করে রোজই তো কত সামাজিক নীতিকে গোপনে অস্বীকার করছি। তার মানে অপরাধ করছি। অপরাধ-বোধের বোঝা মনের মধ্যে ঢিপি হয়ে উঠছে। মনের সুন্দর বৃত্তিগুলো চাপা পড়ছে, ধুঁকছে, মরে যাচ্ছে। এর থেকে উদ্ধার কোথায়। চিন্তাকে আমি ঠেকাবো কি করে। নীতিবোধ যদি না পাল্টায় তাহলে আমার সঙ্গে সমাজের ঠোকাঠুকি চলবেই। কিছুর সঙ্গেই নিজেকে মেলাতে পারব না। তার মানে কি চিরকালই যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।
-কি হ’ল, বলছি না চলুন!
