ওরা থাকলেই বা কি এমন বসার মানে হ’ত? একঘেয়ে কথা, একই ভঙ্গিতে শোনা আর তাতে রসান দেওয়া, এ আর কতদিন চলে। এতে কি লাভ হয়? লাভ লোকসান খতিয়ে না চললে এ সময়ে টিঁকে থাকা যায় না।
তার মানে কি আমি টিঁকে নেই! লাভ লোকসান খতিয়ে চলিনি। তার মানে কি আমার কোন সঞ্চয় নেই ভবিষ্যতের জন্য? দু’বেলা বাড়িতে দুমুঠো খাই, তাছাড়া নোংরা গল্প, হাসিঠাট্টা, আর মাঝে মাঝে গম্ভীর সাহিত্য আলোচনা এতেই তো দিন কাবার হয়। এমনি করে অনেকগুলো বছর কাবার হয়ে গেল। তা’তে কি হল! কোনদিন তো মনে হল না আমি কোন এক সময়ে সকলের থেকে বিশিষ্ট। আমার এমন কতকগুলো বোধ বা অনুভূতি আছে যা আর কারুর নেই। আমি নিজেকে ভালবাসলুম না, শ্রদ্ধা করলুম না, আস্থা রাখতে পারলুম না। মুহূর্তের জন্যও কি একবার মনে হয়েছে যে আমি টিঁকে আছি? আড্ডায় ব্যক্তিত্ব রেখে চলতে গেলে আড্ডা জমে না। দিনের পর দিন আড্ডা জমাতে গিয়ে সকলেই ব্যক্তিত্ব খুইয়ে পুঁয়ে পাওয়া হয়ে গেছি। ক্রমশ নিজেকে ক্ষইয়েছি। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছি। আমায় দিয়ে কোন কাজ হওয়া কি সম্ভব?
পৃথিবীতে যদি কিছু অকেজো লোক থাকে তাহলে ক্ষতি কি? আড্ডা দেওয়াটা কি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একান্তই দরকার? মনের কুৎসিত চিন্তাকে বার করে দেবার জন্য কি খিস্তি করতেই হবে?
এর উল্টোটি যদি ঘটে তা হলেই বা ক্ষতি কি? আড্ডা বা খিস্তি না করে যদি কাজের মানুষ হই তা হলে কি যান্ত্রিক হয়ে পড়ব? বন্ধুরা ব্যঙ্গ করবে? এতে লাভ কার? আবার সেই লাভ লোকসানের কথা এসে পড়ছে। অন্যদিকে যদি ভাবি! এতে ক্ষতিটাই বা কি? নিজের কথা ছেড়ে দিলেও সংসারের কথা ভাবতে হবে। কোন দায়িত্ব নেই একথা ঠিক। কিন্তু যুক্তি দিয়ে কি মানবিক সম্পর্কের দায় চুকান যায়, পয়সার অভাবে মা যদি ঝিয়ের কাজ করে, তাহলে কি চোখ ঘুরিয়ে চিন্তা করব, এতে আমার কোন দায় নেই! বাবা যে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে সেটা কি শুধু নিজেকে টিঁকিয়ে রাখার জন্য! যুক্তির পরেও আরো কিছু থাকে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না কথা দিয়ে। অস্বীকারও করা যায় না। কিন্তু স্বীকৃতিই বা দিই কেমন করে। সকলকে সুখী করতে হবে। অসুখী সংসারের মধ্যে একা কেউ সুখী হতে পারে না। সুখ আজকের দিনে টাকা ছাড়া আসে না। কিন্তু নিজে সুখী না হলে কি অপরকে সুখী করা যায়? যায় না। আমি নিজে যদি সুখ না পাই, নিজের ওপর বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা না রাখি তা হলে আমার টিঁকে থাকাটা অর্থহীন হয়ে পড়ে। নিজেকে ভারী করে তুলতে হবে, যাতে এই পৃথিবীর ওপর ওজনটা বেশ ভাল করেই পড়ে।
-হাঁ করে দেখছ কি, জুতো কিনবে ভেবেছ নাকি! চলে এস।
চমকে ঘাড় ফেরাল চিনু। তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে, লজ্জায় এতটুকু হয়ে যাওয়া মুখখানা বিরক্ত ভদ্রলোকের পিছনে হাঁটতে শুরু করল। লজ্জা করল চিনুর নিজেরই। দোকানদার ওদের ডাকবার জন্য তৈরী হচ্ছিল, সেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। চিনুর সঙ্গে চোখ মিলতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল দোকানী।
শিরশির করে উঠল চিনুর শরীর। মহিলাটির লজ্জা অপমানে মেশানো অভিব্যক্তি আর দোকানদারের দরদ একসঙ্গে জড়িয়ে ঘা দিচ্ছে। শরীরের ভেতরটা কাঁপছে। এমন জিনিস দেখা যায় না। যায়, চারদিকেই এমন ঘটে, দেখতে জানলে অনেক দেখা যায়। মানুষ দেখলে বোঝা যায় যে টিঁকে আছি। নইলে শরীরে এই কাঁপন এল কেন!
সারি সারি জুতোর দোকান। তারপরে কাপড়ের। প্রত্যেকটি শো-কেসের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে জিনিস দেখতে দেখতে চিনু একসময়ে একঘেয়ে বোধ করল। ফুটপাথের ধার ঘেঁষে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল ট্রাম-বাস; লোকজনের হাঁটা চলা।
এ লোকগুলো সব কাজের। একটা কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়েছে। হয়তো আত্মীয়বাড়ি যাচ্ছে, দুটো সুখদুঃখের কথা, হাসি-মস্করা করে নিজেকে হাল্কা করতে। অফিস থেকে ফিরছে কেউ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে। পুজোর বাজার করতে বেরিয়েছে কেউ। সকলেরই উদ্দেশ্য আছে, অপরকে খুশি করে নিজেকে খুশি করা। তাহলে এতগুলো মানুষ স্বার্থপর! পৃথিবীতে বিশুদ্ধ নিঃস্বার্থপরতা বলে কিছু আছে নাকি! সব মানুষই আগে নিজেকে ভালবাসে। আমি কি নিজেকে ভালবাসি? তাহলে বুঝতে পারছি কই যে আমি টিঁকে আছি!
কাজের মানুষ কাউকে কি দেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোজ চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে! না বোধহয়। আসে, চা খায়, বন্ধু দেখলে দুচারটে কথা বলেই চলে যায়। কাজের মানুষের উদ্দেশ্য আছে। আমি কোন কাজই করি না।
ট্রাম-বাস, লোকজন দেখতেও বিরক্ত বোধ করল চিনু। আবার হাঁটতে শুরু করল। ওর সামনে চলেছে একটি পরিবার। মেয়েটি রমার বয়সী, ঝলমলে শো-কেসের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল। খেয়াল নেই যে কখন সে একলা হয়ে গেছেন কি একটা বলার জন্য ঘাড় ফিরিয়ে, ঠিক চিনুকেই পিছনে দেখে থতমত খেল। অজস্র লোক এই একটা ফুটপাথেই। অর্ধেকটা জুড়ে ফিরিওয়ালারা বসে গেছে। মুখ শুকিয়ে এধার-ওধার তাকাচ্ছে মেয়েটি।
-আপনার সঙ্গের ওরা ওইখানে, ফ্রক দর করছেন।
আঙুল দিয়ে চিনু একটা থাম দেখিয়ে দিল। ওখানে স্তূপাকার ফ্রক নিয়ে চীৎকার করছে দুটি ফেরিওলা। মেয়েটি হাসল একবার, তারপরই পড়ি মরি প্রায় ছুটে গেল।
দোষ নেই মেয়েটার। যা ঝলমলে সাজিয়ে রেখেছে শো-কেসগুলো! জোঁকের মত লেগেছে ছেলে দুটো। ওরা ঠিক তাক করে ধরে। সঙ্গে মেয়ে থাকলে কখনো পুরুষদের কাছে ভিক্ষে চায় না। আশেপাশে হাঁটবে হাত বাড়িয়ে, কখনো পায়ে হাত দেবে। একটা পয়সা দিলেই বিদেয় করা যায়। তবু দিচ্ছে না লোকটা। দিয়েছে। খুব বিরক্ত দেখাচ্ছে। সঙ্গে কে, বৌ? বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। ভিখিরী দুটো তাকাচ্ছে। এবার আমাকেই ধরবে। কাছে পয়সা নেই বললেও বিশ্বাস করবে না। ঘ্যান ঘ্যান করে জ্বালাবে।
