গানের মত লাগছে আভার কথাগুলো। মুখে হাসি রেখে শুনে শুনে গেল রমা। সুবলের দিকে তাকাচ্ছে আভা। চাউনিতে কি যেন আছে। সুখী হয়েছে ও। আগে ওদের পরিচয় ছিল না। কিন্তু এক বছরেই মনে হয় যেন জন্ম-জন্মান্তরের ভাব। আভার ভয় ছিল স্বামী সম্পর্কে। সব মেয়েরই বিয়ের আগে থাকে। সুবল ওকে সুখী করেছে। সব চেয়ে বড় ভয় থেকে মুক্তি দিয়েছে। না খেয়ে মরতে হবে না। ছা-পোষা ঘরের মেয়ে এটুকুতেই সুখী।
চাকরি গেলেও সুবল ভয় পায় নি। হাতের কাজ জানে। দোকান দেবে। কিন্তু তার মানেই পায়ের ওপর পা তুলে বসে খাওয়া নয়। খাটতে হবে। তখন ফাঁকি দেওয়া মানেই নিজে ফাঁকিতে পড়া। এখন ঘাড়ে দায়িত্ব পড়বে।
সুবল নিশ্চয় খাটতে পারে। এরপর তো ওকে আরো বেশি খাটতে হবে। আভার সঙ্গে যদি বিয়ে না হত, তা হলে কি ও খাটবার, কিংবা দোকান দেবার জোর পেত? পে’ত নিশ্চয়। বিয়ে-না-করা দোকানদার কি নেই! তবু, খাটুনির জোরটা অমনি আসে না। বিয়ে করে যেমন দায়িত্ব এসেছে তেমনি আভা যদি না ওকে খুশি করতে পারত, তা হলে সুবল কমজোরি হয়ে পড়ত। আর যে খাটতে পারে তাকে কোন দিক দিয়েই হারিয়ে দেওয়া সহজ নয়। তবে একথাও মানতে হবে, সুবল যদি খাটিয়ে না হত, তা হলে আভারও এত খুশি করবার জোর থাকত না। দুটো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব দুজনেরই।
-সিনেমায় যাবি?
-না।
-চ’না। কি এমন কাজ আছে শুনি?
-তোরা দুজনেই যা না। আবার মাঝে একজন কেন!
-খুব ন্যাকামো হয়েছে। যা দিকি চটপট সেজেগুঁজে আয়।
আভা একা নয়, সুবলও ওর সঙ্গে অনুরোধ জুড়ে দিল। মামুলি কতকগুলো আপত্তি করে রমা রাজী হয়ে গেল। আভা মাধবীর অনুমতি আদায় করার ভার নিল।
মাধবী তখন সবে বাড়ি ফিরেছে শনিপুজো দেখে। দিনেশ বা চিনু বাড়ি নেই। রমা যা ভাবেনি তাই হল। আভার এক কথায় মাধবী রাজী হয়ে গেল।
রাত নটায় ছবি আরম্ভ। আভার ভাই বোনেদের নিয়ে দু’খানা ট্যাক্সিতে ওরা রওনা হল। মাকে যাবার জন্য পেড়াপীড়ি করেছিল আভা। ওর মা রাজী হয়নি। মেয়েদের সাধ আহ্লাদের ব্যাপারে বয়স্কাদের থাকতে নেই।
ছবি আরম্ভ হতে কিছু দেরি ছিল। সিঁড়ির পাশের একটা জায়গায় বসার ব্যবস্থা। তখনো সন্ধ্যার শো ভাঙেনি। ওরা সোফায় বসে অপেক্ষা করতে লাগল। সুবল চকোলেট কিনে আনল।
ছবিঘরটা ঝকঝকে সাজানো। এমন জায়গায় রমা প্রথম এল। অনেক মেয়ে অপেক্ষা করছে। তাদের সে গোগ্রাসে দেখল। সাজগোজ ছাড়া কেউ সিনেমায় আসে না। তাই কাউকেই খারাপ দেখায় না। দেয়ালে ফটো সাজান রয়েছে। আভা উঠে গিয়ে দেখতে লাগল। রমারও ইচ্ছে করছে দেখতে। কিন্তু কেমন একটা সঙ্কোচ লাগল তার। এতগুলো মেয়ের সামনে দিয়ে উঠে গিয়ে, দাঁড়িয়ে ছবি দেখতে হবে ওরা সকলে নিশ্চয় তাকাবে তার দিকে। সকলের চাউনি বিশেষ করে তাকেই লক্ষ্য করবে, এ কথা ভাবতেই পা জমে যায়। অথচ আভা কত সহজে উঠে গেল। এটা সম্ভব হয়েছে আভার সিনেমা দেখার অভ্যাস আছে তাই, না কোন কিছুকে পরোয়া না করার জোর পেয়েছে বলে? রমা আভার দিকেই তাকিয়ে রইল।
হাতছানি দিয়ে আভা ডাকল। উঠে এল রমা। দু একজন তার দিকে তাকাল শুধু। আভা ছবির মানুষগুলোর নানান গুণপনার ব্যাখ্যা শুরু করল। শুনতে শুনতে রমার নজর এড়াল না অনেক পুরুষমানুষই তাকে আড়ে আড়ে দেখছে।
ঘণ্টা পড়তেই তাড়া দিল সুবল। ওরা ভেতরে গিয়ে বসল, রমার পাশে আভা তার পাশে সুবল। দেয়ালের গায়ে ছবি। জমকালো পর্দা, ফিটফাট পোশাক পরা কর্মচারী, নরম চাপা আলো, চাপা কথার শব্দ, সব জড়িয়ে রমার স্নায়ুতে ঝিম ধরিয়ে দিল।
ছবি শুরু হতে অল্প দেরি আছে। সুবল আর আভা কানে-কানে কি বলে হেসে উঠল। রমা মুখটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখল, ওরা যাতে না অসুবিধা বোধ করে।
-এ্যাই, এদিকে দেখ না।
চাপা গলায় আভা ডাকল। চোখের ইশারায় রমাকে সে সামনের দিকে তাকাতে বলল। দু তিনটে সিট পরেই একটা লোক মুখ ঘুরিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।
কি দেখছে লোকটা! মাথা নিচু করে ফেলল রমা। আভা আবার হাসছে। সুবলও।
-তোকে দেখছে।
-যাঃ, আমাকে নয় তোকে।
-বারে, আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে।
-হলেই বা, তোকে এখন খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।
আভা আবার সুবলের সঙ্গে কানাকানি শুরু করল। মুখ না তুলেই রমার মনে হল, সারা ঘরের লোক এখন তার দিকেই তাকিয়ে আড় চোখে দেখল, আভার আঙুলগুলো আলগোছে ছুঁয়ে আছে সুবল।
ঘাড় নামিয়ে রমা জিজ্ঞাসা করল: আরম্ভ হতে আর কত দেরী রে?
.অমলটা চলে গেল, এর মধ্যেই বাড়ি ফিরে কি হবে। অভ্যাস হয়ে গেছে এমন যে এখন ভাত খেলে রাত এগারটা বারটায় ঠিক ক্ষিদে পেয়ে যাবে। অভ্যাসে অভ্যাস তৈরী হয়।
চিনু ফিরে হাঁটতে শুরু করল। পুজো আসছে এবার বোঝা যাচ্ছে। কলকাতায় এত মানুষ থাকে কি করে! থার্ড ক্লাস ঘোড়ার গাড়িগুলো আজকাল উঠে গেছে। ওই রকম ঘরে ঠাসাঠাসি হয়ে মানুষ থাকে। থাকে নেহাত খাওয়া-শোওয়ার জন্য। সে কাজ হয়ে গেলেই পিলপিল করে বেরিয়ে পড়ে। গায়ে হাওয়া লাগায়। হাত পায়ের খিল ভাঙে। মেয়েদের অবস্থাটা কি হয় তাহলে! মা কিংবা রমাটা এখনো তবু দিনভর খাটে কি করে!
চিনুর মনে হল অনেকক্ষণ ধরে সে হাঁটছে তবু কিছুই এগোয়নি। বিরক্ত হল সে। এতলোক এই কলকাতায় ভিড় করার কি দরকার। হাত পা খেলিয়ে দু’পা হাঁটা যায় না। ট্রাম-বাসে জামার ভাঁজ থাকে না। বাড়িতেও তিষ্ঠোন যায় না। তাহলে মানুষ করবে কি! পার্কে গিয়ে বসবে? একা অন্ধকারে বসার কোন মানে হয় না। ওরা যদি কেউ থাকত এখন!
