দোতলার একটা ঘর মেয়ে-জামাইয়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ও ঘরটা আভার আইবুড়ো কাকার। কাকা রাতে ঘুমোবে ছাদের ঢাকা দেওয়া চাতালটায়।
বাড়িতে সবাই খুশি। জামাই আজ রাতে থাকবে। ফিসফাস হচ্ছে আভার মায়েতে বাবাতে। ছোট ভাইটা গেছে পাশের বাড়ি থেকে ট্রামের মান্থলিটা চেয়ে আনতে। ও এলেই আভার বাবা নতুন বাজার যাবে। আর একটা ভাই মুদির দোকান থেকে ফিরলে জামাইয়ের লুচি ভাজা শুরু হবে।
রান্নাঘরে চা করছে আভা। রমা চৌকাঠে বসে শুনছে ওর কথা। চোখ দিয়ে দেখছে আভার শরীরটাকে, ভাবভঙ্গির খুঁটিনাটিকে।
-এই কদিনেই ওর অব্যেস পালটে দিয়েছি। এখন আমার হাতের চা ছাড়া একদম খেতে পারে না। তুই করে দে ঠিক ধরে ফেলবে। খাবে না, ফেলে দেবে।
-কেন আমরা কি চা করতে পারি না? দে’না, কেমন ধরতে পারে দেখি!
ছাঁকনিটা শক্ত করে আঁকড়ে কাপটা একটু সরাল আভা রমার নাগালের বাইরে।
-হ্যাঁ, শেষকালে চা ফেলে দিক। তারপর যত ঝাল আমার ওপর ঝাড়ুক। কম রাগী মানুষ! একটু এদিক-ওদিক হলেই একটা কাণ্ড বাধিয়ে দেয়।
আভা হাসল। রমাও হাসল। তাই দেখে হঠাৎ ঘাড় নিচু করে চিনি গুলতে শুরু করল আভা।
-কাণ্ড যে বাধায় তা’ত দেখতেই পাচ্ছি।
-ধ্যেৎ, তোর বড় মুখ আলগা।
-দেশে থেকে যে কলকাতায় এলি? ওখানে বুঝি রাগারাগির সুবিধে হচ্ছিল না!
-আহা, তাই বটে। ও এখন যে দোকানটায় কাজ করে সেটাতো উঠে যাচ্ছে।
-সেকি!
রমার গলার স্বরে বাড়াবাড়ি ধরনের বিস্ময় ছিল। সে জানত, সুবল ঘড়ির দোকানের কারিগর। মাস গেলে প্রায় শ’ দুই টাকা রোজগার করে। দোকান উঠে গেলে ওরা খাবে কি?
-উঠে যাচ্ছে চালাতে পারছে না বলে। ঘড়িতো আর তেমন বিক্রি হয় না। যা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে গরমেণ্ট, চালান আসা বন্ধ হয়ে গেছে। মেরামত করে কোম্পানির আর কত আয় হয়, দোকান ভাড়া, কারিগরের মাইনে দিয়ে কোন লাভই থাকে না। তাই তুলে দিচ্ছে।
-তা হ’লে কি করবি!
-ওই জানে। নিজে দোকান দেবে, নইলে আর কি করবে! ঘড়ি, ষ্টোভ, কলম, সাইকেল-সব মেরামত করতে পারে। একটা ঘর পেয়েছে শেয়ালদার কাছে।
চা হয়ে গেছে। দুহাতে দুটো কাপ নিয়ে উঠে দাঁড়াল আভা। আঁচলটা খসে পড়ল মাটিতে।
-তুলে দেনা রে।
-উহুঁ। ওমনি যা।
-মাথার কাপড় না দিয়ে গেলে মা ভীষণ রাগ করবে।
-করে করবে, বলবি আমি খুলে দিয়েছি।
-মা না থাকলে ঠিক দিতুম, বাড়িতে তো ঘোমটা দিলে ও রাগ করে।
-ভালই তো, বলবি, জামাই ঘোমটা দেওয়া পছন্দ করে না।
-তর্ক করতে পারি না বাপু, দিবি তো দে। আবার কাপদুটো নামিয়ে কাপড় ঠিক করতে হবে। নিচু হলেই ব্যথা করে।
হাসল আভা। এমন হাসি রমা কখনো দেখেনি। সুখী হয়েছে আভা। ভাবনা চিন্তা নেই। কিংবা থাকলেও গ্রাহ্য করে না। বরের সঙ্গে মনের মিল হয়েছে। আলাদা একটা ঘর পেতেছে। সুবল হাতের কাজ জানে, চাকরি গেলেও ভাবনা নেই। নিশ্চিন্তির সঙ্গে মনের মিল খাপ খেয়ে গেছে। শান্তিতে আছে আভা। ওর হাসিটা ঠাণ্ডা। দেখলে মন জুড়োয়।
আভার আঁচলটাকে ঠিকমত জড়িয়ে দিতে দিতে নিচু সুরে রমা বলল:
-বাপের বাড়িতেই খালাস হবি?
-ও বলছিল হাসপাতালে দেবে। সেটাই ভাল।
-হ্যাঁ, তাই ভাল। তবু প্রথম পোয়াতি, মা’র কাছে থাকলে সাহস পাবি।
-দেখি ও কি বলে। তোর খবর কি?
-আমার আর কি খবর।
-জুটল কিছু।
-তা দিয়ে তোর কি, তোর তো জুটেছে।
-তোদের বাড়ি যাব কাল। মাসিমাকে আচ্ছা করে বলে আসব’খন। তুই কিন্তু কালো হয়ে গেছিস।
ওদের কথা বন্ধ হল। আভার মা এসে পড়েছে। মেয়েকে তাড়া দিয়ে আবার ছুটল স্বামীর কাছে। কিসমিস আনতে বলা হয় নি।
রমা বাড়ি চলে যাচ্ছিল। আভা যেতে দিল না।
-এর মধ্যে যাবি। চ’ কথা বলবি না?
-তোর বরটা বড্ড হাঁদা।
-আহা, গায়ে পড়া হলে বুঝি খুব ভাল হ’ত।
-হ’তই তো। তাহলে আইবুড়ি নাম খণ্ডাতে চেষ্টা করতুম।
-করে দেখ না একবার।
.সুবলের শালা-শালী অনেকগুলো। ঘরে চুপ করে একা বসেছিল সে। কেউ পড়ার বই, কেউ চটের আসনের নক্সা এনে জামাইবাবুকে দিয়ে পরখ করিয়ে নিচ্ছিল।
রমাদের দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সুবল। ওকে ভাল করে দেখল রমা। খুব সাধারণ দেখতে। মুখটায় ভোঁতামি সাধারণের তুলনায় একটু বেশি। আঙুলগুলো বেঁটে। হাতের হাড় চওড়া। পায়ের নখে ময়লা জমে। পেয়ালায় চা ঢেলে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ ক’রে খেল।
রমা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল। কি কথা বলবে সে। মানুষটা কি ধরনের না জানলে আলাপটা শুরু করা যায় না। পুরুষদের কথার বিষয় যা হয় তাতে বেশিক্ষণ মেয়েদের পক্ষে কথা চালানও শক্ত। ঘর সংসারের কথায় জোয়ান ছেলেরা তো একটুও রস পাবে না।
-কিরে খুব তো তখন বলেছিলি, এখন নিজেই তো লজ্জাবতী লতা হয়ে গেলি।
-হলুম আর কোথায়। উনি আগে কথা বলুন। পুরুষদেরই আগে কথা বলতে হয়।
-তুমি বলতো কথা।
সুবল নড়ে চড়ে বসল। বার কয়েক হেসে, মুখ লাল করে শেষকালে ঘড় ঘড় করে বললঃ
-এখন তো মেয়েদেরই যুগ। ট্রামে, বাসে, পোস্টাপিসে, সিনেমায়, সব জায়গাতেই লেডিজ ফার্স্ট!
রমা তাকাল আভার মুখের দিকে। টকটকে মুখ।
-কথায় পারার জো নেই। একটু বেফাঁস কিছু বলেছি কি ক্ষেপিয়ে মারবে।
আভাকে এখন বেশ লাগছে রমার। এত কথা বলত না। এখন চোখে মুখে খই ফোটে। কথা বলে যাচ্ছে ও। সুবলের মুখের ভাব পালটে যাচ্ছে। সুবলের পদ্যের খাতা আছে। নিজহাতে মাংস রাঁধে। মাউথ অর্গ্যানে নিখুঁত গানের সুর তুলতে পারে। মেয়েদের একা রাস্তায় বার হওয়া পছন্দ করে না।
