প্রসাদ মাথায় ঠেকিয়ে খুঁটে বাঁধল খেঁদার মা। দুকুচি শশা আর একটা খেজুর পেল মাধবী। বাড়ির জন্য সে-ও রেখে দিল। সকলেই তাই করছে। এই জিনিসটা অদ্ভুত মনে হল তার কাছে। প্রসাদ সকলেই রেখে দিচ্ছে বাড়ির জন্য। একইভাবে সকলে ভাবে, সংসারের কথা ভাবে। একা সে-ই শুধু ভেবে মরে না। দুনিয়ায় সংসার শুধু একা তারই আছে তা নয়। ভাবাটা মানুষের ধর্ম। তবে বেশ-কম আছে। তা’ থাক, তবু এতগুলো মানুষের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই যেন দেখা যাচ্ছে। সান্ত্বনাও পাওয়া যাচ্ছে। নিজেকে সবাই সব কিছুর থেকে বেশি ভালবাসে। এদেরও ভালবাসতে ইচ্ছে করছে।
শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। পাপ জমেছিল মনে। মনটা এখন হাল্কা বোধ হচ্ছে। এদের সঙ্গে আমার মিল আছে। এমন মিল হয়তো আরও মানুষের সঙ্গে আছে। ক’জনকেই বা দেখেছি। একটা বাড়ির দুটো ঘরের মধ্যেই তো জীবন কাটল। বাইরে এলে নিজেকে কত বড়ো মনে হয়।
ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে মাধবীর আবার মনে হল, বাইরে এলে নিজেকে কত বড়ো যে লাগে!
-চিনতে পার গো!
-কেন পারব না। তোমার জামাইয়ের খবর কি, শুধরেছে না আগের মতই আছে?
-ও হারামজাদা আবার শোধরাবে। আজ ছ’বছর বে’ হয়েছে, পরশু এসে বলে বে’র সময় আংটি দেবার কথা ছিল দাওনি, এখন দাও। আমিও তেমন মেয়ে কিনা। মেয়েকে যদি সুখে রাখতিস, আংটি কেন সোনার ঘড়ি পর্যন্ত দিতাম।
-মেয়ে কোথায়-তোমার কাছে?
-তবে না’তো কি! শাউড়ীটা খাণ্ডার মাগি। পাঠালে কি আর জন্মে মেয়ের মুখ দেখতে পাব। কোট-ঘর-পুলিশ, যে করে পারিস নিয়ে যা দেখি। আমি অত সহজে ছাড়বার পাত্তর নই।
এবার রাস্তা পার হতে হবে। মাধবী দাঁড়াল। খেঁদার মা একটু দূরে সরে দাঁড়াল। যমুনা কার সঙ্গে যেন কথা বলতে বলতে আসছে। হাতভরতি চুড়িপরা গিন্নীটি খেঁদার মা’কে দেখে জিগগেস করল:
-কি হলো গো আমার লোকের?
-চেষ্টা তো কচ্ছি মা, পেলে জানাবো।
-আর জানিয়েছ। মেয়েকে বসে বসে খাওয়াচ্ছ, আমার কাছেই দাও না। কি আর এমন কাজ আমার বাড়িতে! তিনটিতো লোক।
-না মা। জামাই শুনলে রাগ করবে।
-করে করবে। ভাত কাপড়তো আর দেয় না। যাই হোক বাপু তাড়াতাড়ি একটা লোক দিও।
গিন্নীটি চলে গেল। যমুনা এসে পড়েছে। খেঁদার মা গম্ভীর। মাধবী বলল:
-কে গা?
-পাড়াতেই থাকে। হালে পয়সা ক’রে গাড়ি কিনেছে।
-তুমি বললে না কেন, তোমার মেয়ে হলে পারতে জামাইয়ের মত ছাড়া কাজ করতে পাঠাতে?
-কি দরকার মা ওসব বলে।
-না বললে যে আস্কারা পেয়ে যায়, মুখ বেড়ে ওঠে। দাঁড়াও, দেখে পার হও।
খেঁদার মা’র হাত ধরে মাধবী পিছিয়ে গেল। বাসটা চলে যেতে, এক ছুটে তিনজনে এপারে চলে এল।
গলির মুখে খুচরো দু’চারটে জটলা। জানলা বারান্দায় এখনো কেউ কেউ রয়ে গেছে। গলিটা অন্য যে কোন দিনের মত আবার মিইয়ে পড়েছে।
মাধবী বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। ভাঙেনি ওটা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কি ঘটল কে জানে। এপাশে সেই বউটির জানলা খোলা। থালায় ভাত বাড়ছে। মাধবীর ইচ্ছে করেছিল জিগ্যেস করতে। জানলার ধারে পৌঁছে আবার সরে এল। খেঁদার মা আর যমুনা কথা বলছে। গলা বাড়িয়ে মাধবী বলল:
-ওখানে মোটেই সস্তায় তাঁতের শাড়ি পাওয়া যায় না। তার থেকে বরং ফেরিওয়ালাকে ডেকে দরজায় দরদাম করে কিনলে অনেক সস্তা পাওয়া যাবে।
.শৈলর ছেলেটাকে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব ছিল রমার। সে দায় চুকিয়ে ফিরছিল, ডাকল আভার ছোটবোন।
-দিদি এসেছে, রমাদি।
-কখন রে?
-দুপুরে, জামাইবাবুও এসেছে।
-আমার কথা জিগ্যেস করেছে!
-হুঁ।
একটা বাঁক ঘুরলে আভাদের বাড়ি। একবার ঘুরে এলে কেমন হয়। বিয়ে হয়ে গেছে, এখন তো ও আর হটহট করে পাড়া বেড়াতে পারবে না। গিয়েই দেখা করতে হবে। আজ এক বছর হতে চলল বিয়ে হয়েছে, বোধহয় ছেলেপুলে হবে তাই এসেছে। মধ্যে দু একবার এসেছিল দেখা হয়নি। শ্বশুর শাশুড়ী গ্রামে থাকে। ওরা এখানে ঘরভাড়া নিয়েছে। দু’জায়গায় সংসার-খরচ টানা সোজা ব্যাপার নয়। তবু গ্রাম থেকে আভাকে আনিয়ে সংসার পেতেছে ওর বর। কি নাম যেন, রবীন না সুবল!
সদর দরজায় হুটপাট শুরু করেছে বাচ্ছারা। বাটি হাতে কুলপিওলাকে ঘিরে চেঁচামেচি। আভার বর খাওয়াচ্ছে। আভাও দাঁড়িয়ে।
রমাকে দেখে খলবল করে উঠল আভা:
-কি ভাগ্যি আমার।
-তোর না আমার।
ওদের কথা শুনছিল আভার স্বামী। কথার শেষ নেই কোন। হাবি-জাবি আলাপ। রমা হাসিমুখে কয়েকবার ওর দিকে তাকাল।
সুবল! নামটা এতক্ষণে মনে পড়ল। এমন হয়, অনেক কথা পেটে থাকলেও মুখে আসে না। আচমকা এসে যায়। তখন স্বস্তি লাগে!
-কেমন আছেন?
বেশ সহজ সুরে রমা জিগ্যেস করল। অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে চট করে সহজ হওয়া যায় না! কিন্তু অবস্থা বিশেষে হওয়া যায়।
আমতা আমতা ক’রে কিছু একটা জবাব দেবার চেষ্টা করল সুবল। শেষে বলল, মালাই খাবেন?
উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা না করেই ফরমাশ করল সুবল।
-খুব লাজুক না রে?
-তুই নতুন কিনা তাই।
-নতুন কোথায়! তোর বিয়ের সময় কতক্ষণ ধরে বকবক করেছি না! মালাই বরফ এগিয়ে ধরল সুবল। রমা ইতস্ততঃ করছে।
-নে’না।
-বারে আমি একা খাব নাকি, তুইও নে।
-আমি তো খাবই। আমিই তো ডাকিয়েছি। সিদ্দির খাবি?
রমাকে মালাই আর সিদ্ধির বরফ গোটাকতক খেতে হল। আভার বাবা-মা’ও বাদ গেল না। ছোটরা জামাইবাবুকে ঘিরে হৈ চৈ করছে। সুবলকে দেখে মনে হল এসব তার ভাল লাগছে।
