রাগ ধরছে মাধবীর। শৈলর কান্নাটা কেন গুরুত্ব পাবে না? পাড়ার লোকেরা এটুকুতেই কেন এত মাতামাতি শুরু করেছে। একটা মেয়ে তেড়ে এসে দরজা খুলে দাঁড়াল আর একটা মেয়ে ঘরের মধ্যে বসে কাঁদল। এ দুটোয় তফাত কতটুকু? দুটো ঘটনাই তো তৈরী হয়েছে একই কারণ থেকে। সংসারের কথা দুটো মেয়েই ভাবে। ভাবনার ফলেই একজন কাঁদে, আর একজন রুখে দাঁড়ায়। ওপরে তফাত বটে কিন্তু ভেতরের কারণ এক।
কিন্তু একটা বেশ্যার সঙ্গে কি একটা ঘরের বৌয়ের, আসল জায়গায় কোন তফাত নেই? রাগ ধরছে মাধবীর। যারা মজা দেখছে, তারা কি ধরনের খুশি পাচ্ছে? ঘেন্না করছে। অন্যকে ঘেন্না করলে সুখ পাওয়া যায়। অনেক ধরনের সুখের মধ্যে এও একটা। সংসারে সুখ কোথায়! তাই ঘেন্না করতে হয়। টাকা পয়সা দিয়ে দিনেশ সুখ আনতে পারেনি, তার পাল্টা শোধ নিতে হচ্ছে ওকে ঘেন্না করে। তার মানে কি দিনেশও ঘেন্না করে বেঁচে আছে! আমরা কি পরস্পরকে ঘেন্না করি?
-দেখে পার হোন।
হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল যমুনা। গাড়ি আসছে। ভয় করল মাধবীর। অতবড় বাসটা যে চালাচ্ছে তার হাতটা যদি একটু ঘুরে যেত। ছিটকে ধাক্কা খেতে হত আলোর থামটার সঙ্গে। মাথাটা ফেটে চুল আর ঘিলু মাখামাখি হত। কালো চাকায় রক্ত লেগে পানের ছোপ ধরত। ছিবড়ে ছিবড়ে মাংস রাস্তায় আটকে থাকত।
যমুনার হাতটা চেপে ধরল মাধবী। গাড়ির যেন আর শেষ নেই। ওর মধ্যেই হাত ছেড়ে সাইকেল চালাচ্ছে একটা ছেলে। দেখলে বুক ঢিপ ঢিপ ঢিপ করে। মুখোমুখি গাড়িগুলো কেমন সাঁই সাঁই করে ছুটছে। ধাক্কা লাগছে না। ওরা নিয়ম মাফিক চলছে। তবু তো ধাক্কা লাগে, তখন সেটাকে বলে ঘটনা।
আমরা সব্বাই নিয়ম-মাফিক চলছি। এই চলাটা কোথাও বিগড়োলেই ঘটনা ঘটে। নিয়ম নিশ্চয় বিগড়েছে, নইলে বেশ্যা হবে কেন! চাকরি যাবে কেন!
আমি কি নিয়ম-মাফিক চলছি? আমার মধ্যে কিছু কি বিগড়োয়নি? স্বামীকে ঘেন্না করাটা কি পাপ নয়! আমি পাপ করেছি!
-কতক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকব?
-নইলে কি গাড়ির তলায় যাবেন!
-তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে না।
গাড়ির ভিড়টা পাতলা হয়েছে, মাধবীর হাত ধরে এক ফাঁকে ছুটে রাস্তাটা পার হল যমুনা। হাঁফিয়ে উঠেছে দুজনেই এইটুকু ছুটে আসতে।
-বাব্বা, রাস্তায় বেরোনোও দায়।
যমুনা হাসল। মাধবী পাল্টা না হেসে ফুটপাথের ধার থেকে সরে গেল। মস্ত একটা বাস আসছে।
পুজোর আদ্দেক সারা হয়ে গেছে! রাস্তার ওপর বেঞ্চিতে পুরুষরা বসে। ছোট্ট একটা ভিড় করে অনেকে দাঁড়িয়ে। মেয়েদের বসার জায়গাটা ভিতর দিকে। পুরুষ আর মেয়ের ভিড় সমান।
ওরা বসতেই অনেকে ফিরে তাকাল। মাধবী এখানে এই প্রথম। সব কিছুই নতুন লাগছে। পুজো করছে যে তার নামের একটা সাইন বোর্ড লম্বালম্বি ঝুলছে ঘরের মধ্যে। নামের শেষে অনেক কিছু লেখা। খুঁটিয়ে পড়ল মাধবী। মামলা জেতা, মেয়ের সুপাত্র জুটিয়ে দেওয়া থেকে বশীকরণের মাদুলি পর্যন্ত পাওয়া যায়।
মানুষকে বশ করার জন্য মন্তর খাটাতে হয়! এতে মানুষের কোন জিনিসটা বশ হয়? দিনেশ যদি অমন একটা মাদুলি পরে তাহলে পারবে কি সে আমায় বশ করতে?
বিরক্ত হল মাধবী। পুজোরী হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরতি করছে। শরীরটা অল্প কাঁপছে। কোমরের কাছে দুটো ভাঁজ দলমল করছে। কালো হয়ে গেছে কসি গোঁজবার জায়গাটা। সারা গায়ে লোম নেই। চশমা টপকে এধার-ওধার তাকাচ্ছে। যন্ত্রের মত পুজো করছে।
হাতজোড় করে আছে সকলে। বিড়বিড় করে ওরা কি বলছে। মাধবী নতুন মানুষ। সে দেখছে সব কিছুই।
শেতলা, মহাকালী আর শনি পাশাপাশি। নীচে শালগ্রাম আর শিবলিঙ্গ। শ্বেতপাথরের মেঝে। পাথরে অনেক কিছু লেখা। থালাভর্তি প্রসাদ। গরুর মত চোখ করে একটা লোক ঘণ্টা বাজিয়ে যাচ্ছে।
পাশে তাকাতেই অস্বস্তি বোধ করল মাধবী। ওকে সে চেনে। খেঁদার মা। তিনবাড়ি ঝিয়ের কাজ করে। গলায় আঁচল জড়িয়ে হাতজোড় করে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঠাকুরের দিকে। ওর সামনেই মোটাসোটা এক গিন্নী। হাত ভরা চুড়ি। নাকছাবিটাও দেখা যাচ্ছে। অস্বস্তিটা অল্প কেটে গেল। তবু খেঁদার মা’র গা বাঁচিয়ে সরে গেল মাধবী।
নতুন বিধবা বোধ হয়। ভঙ্গি থেকে এখনো সধবা ভাবটা ঘোচেনি। চুলটি বেশ কোঁকড়া। কুমারী বলে এখনো বিয়ে দেওয়া যায়। কাদের বৌ ও!
যমুনার দিকে তাকাল মাধবী। গদগদ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর পাশের বুড়িটা চোখ বুজিয়ে ঝিমোচ্ছে। ঝিমোচ্ছে আর জাবর কাটার মত কি বলছে। বোধ হয় মন্তর। কি মন্তর!
বৌটির শাশুড়ী নিশ্চয়! নরম সরম গড়ন। বারবার বৌয়ের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। বৌটি মাথা নিচু করে কেন? বোধ হয় এখনো ছেলেপুলে হয়নি।
বয়স হয়েছে মেয়ে দুটোর। মুখের আদল এক রকমের। দুই বোন নিশ্চয়। তিরিশের কম কেউই নয়। এখনো বিয়ে হয়নি কেন!
ওই কি সতীন দত্তর ভালবেসে বিয়ে-করা বৌ! পোস্টাপিসে চাকরি করে। সতীন দত্ত অনেকবার জেল খেটেছে স্বদেশী করে। পাড়ায় খাতির আছে, সামনের বার কর্পোরেশনের ভোটে নামবে। ওর বৌ এখানে কেন?
-পা ঢেকে বসুন।
খেঁদার মা কথাটা বলল। শান্তিজল দেওয়া হবে। মাধবী আঁচলে পা মুড়ল। ঘাড় হেঁট করে বসল সকলে। মুখে দু’চার ফোঁটা পড়ল। পড়ছে পুরুত। ছ’দিন অন্তর তাকে এই কাজ করতে হয়। যন্ত্রের মত তার প্রতিটি নড়াচড়া।
