”তুই খেয়েনে, আমার শরীর ভালো নয়।”
ঘরের আলো জ্বালার আগে সে জানলায় দাঁড়াল। অন্ধকার ছাদ। বোঝা যাচ্ছে না কোনো মানুষ আছে কি না। ‘তুই ওকে অপমান করেছিস’, এই ধারণাটা খুদিকেলোকে দিল কে? নিরু! মেয়েদের একটা বাড়তি অনুভব ক্ষমতা আছে। তার মধ্যে নিরু কিছু আবিষ্কার করেছিল কি? কিছু কি ধরা পড়েছিল ওর কাছে! ও হাত আঁকড়ে ধরে ছিল কীসের ভরসায়? প্রত্যাখ্যান পাবে না ভেবেই কি বলেছিল ‘কেন হবে না?’ একটা মেয়ের বাঁচতে না-চাওয়ার মানে কি সে অপমানিত হয়েছে! কতরকম কারণেই তো মানুষ মরতে চায়। সে নিজেও তো নিজেকে অপমান করেছে জাল অতুলচন্দ্র ঘোষ হয়ে। কিন্তু মরার জন্য তো ব্যস্ত হয়নি কখনো!
আধ ঘণ্টা পর, বালিশে পিঠ দিয়ে পা ছড়িয়ে প্রিয়ব্রত টিভি-র দিকে তাকিয়ে। একটা নাটক হচ্ছে। কিছু শব্দ আর চলমান কিছু অবয়ব ছাড়া তার চেতনায় আর কোনো ছাপ পড়বে না। খাটের পিছনে তিলু দাঁড়িয়ে।
পরশুর মৌলালি থেকে শুরু করে সুড়ঙ্গের মতো অন্ধকার গলিতে ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত নিরুকে সে, পুরনো ফিল্মের রিল হাত দিয়ে টেনে খুলে খুলে দেখার মতো করে, তার গলার স্বর, চাহনির ঔজ্জ্বল্য, হাতের অবস্থান, পদক্ষেপ, কুণ্ঠা, চোখের পাতা নামিয়ে ফেলা, ছলছলানি, তীব্র দৃষ্টি, অনুনয়-প্রতিটিই সে ফ্রেম ধরে ধরে দেখে যাচ্ছে। কখনো বা একটা ফ্রেম দুবার, তিনবারও দেখছে। কিন্তু কোথাও সে খুঁজে পাচ্ছে না ইঙ্গিতটা-নিরু কেন জীবন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ল!
অপমানের কথাটা যে খুদিকেলোরই মন-গড়া তাতে প্রিয়ব্রতর সন্দেহ নেই। অতি চতুর, শয়তানি বুদ্ধিতে ওর মাথাটা ঠাসা। হয়তো এটাই চাউর করবে, প্রিয়, তার বাল্যবন্ধু, বাবার বয়সি একটা লোক, কুপ্রস্তাব দিয়েছে তার মেয়েকে। নিরু তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বাড়িতে বলেনি, এটা সম্পর্কেও সে নিশ্চিত। আট মাসে যতটা কঠিন হয়ে ওঠা উচিত ছিল মেয়েটি তা হতে পারেনি। এখনও অল্প বয়সের আবেগ ওকে দুলিয়ে দেয়…’আমি তখন বললুম, আপনারা যে মেয়েটার সব্বোনাশ করলেন, তার জীবন নষ্ট করে শেষ করে দিলেন-‘; নিরুর পক্ষে মিথ্যে বলা সম্ভব নয়।
‘কাকিমা আমায় রাখতে রাজি হল না’,…’আমি হলে তো বলতাম থেকে যাও।’…’হয় না, হয় না তুমি এখনও ছেলেমানুষ, ঠিক বুঝবে না-।’
এতে বোঝাবুঝির কি আছে? অত্যন্ত সরল, স্পষ্টই তো কথাটা-আমি একটা কাওয়ার্ড, কাপুরুষ। প্রিয়ব্রত চোখ বুজল।
”টিভি বন্ধ করে দোব? এখন খবর হবে।”
”দে। আমি রাতে আর খাব না। আলোটাও নিভিয়ে দিয়ে যা।”
হিতু যখন কলিং বেল বাজাল তখনও সে জেগে। তিলুর নেমে যাওয়া, উঠে আসা, চেয়ার টেনে হিতুর জুতো খুলতে বসা সে শুনতে পাচ্ছে।
”কোথায় সোনপাপড়ি, বার কর, অনেক দিন খাইনি…বাবা না খেয়েই শুয়ে পড়েছে?”
দরজায় হিতুর ছায়া। প্রিয়ব্রত বলল, ”শরীর ভালো লাগছে না, তাই।”
আলো জ্বেলে হিতু এগিয়ে এল। হাতে বাক্সটা, মুখের মধ্যে সোনপাপড়ি।
”চাইনিজের রি-অ্যাকশন নয় তো? মাত্র কয়েক ঘণ্টার তো বাসি, ফ্রিজে ছিল। গোলমাল হবার কথা নয়, আমার তো হয়নি!”
”না না, চাইনিজের জন্য নয়, এমনিই মনটা ভালো নেই।”
”আমাদের কোর্ট রিপোর্টারকে বলে রেখেছিলাম, আমার পাড়ার মেয়ে ইনভলভড, যদি উনি এই কেসটা অ্যাটেন্ড করেন। সন্ধেবেলায় তিনি জানালেন কেসের হেয়ারিং হয়নি। খুদিকেলোর মেয়ে সকাল থেকে নাকি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই মুলতুবি রইল, সামনের মাসের চার তারিখে আবার হেয়ারিং হবে। বাড়ি ফেরার সময় থানায় গেছিলাম, নতুন ও সি-র সঙ্গে মুখচেনা আছে। শুনলাম খুদিকেলো আজ সকালে থানায় গিয়ে বলেছে, মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছে না। ভোররাতে নাকি বাড়ি থেকে চুপিসারে বেরিয়ে গেছে।”
”সে কি!” প্রিয়ব্রত উঠে বসল।
”পুলিশ অবশ্য ওর কথা বিশ্বাস করেনি। ভয়েতেই যে মিথ্যে গল্প ফেঁদেছে সেটা ওরা বুঝেছে কিন্তু করবে কি? ভদ্রলোক যথেষ্ট শিক্ষিত, কালচার্ড, টিপিক্যাল পুলিশ নয়। দুখ্যু করলেন, খুদিকেলোকে অনেক বুঝিয়েছেনও, পুলিশ আপনাদের দেখবে, প্রোটেক্ট করবে, আপনারা ভয়ে পিছিয়ে গেলে এইসব ক্রিমিনালদের তাহলে শাস্তি হবে কী করে? কিন্তু সেই এক কথা, ভোরবেলায় মেয়ে আমার ঘর ছেড়ে কোথায় যে চলে গেছে, আসলে নিজেরাই কোথাও সরিয়ে দিয়েছে। দু’ হাজার টাকাও হয়তো হাতে পেয়ে গেছে।”
আমি দিয়েছিলাম পাঁচ হাজার আর মাসে মাসে দিয়েছি পাঁচশো, একটা ভয়কে শান্ত করে রাখার জন্য। প্রিয়ব্রত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”তুইও তো বলেছিলি, নিরুকে এখান থেকে সরিয়ে দিক।”
”হ্যাঁ বলেছি। এখনও বলছি। ফেরোসাস ক্রিমিনাল গ্যাংয়ের সঙ্গে লড়তে যাওয়াটা বোকামি। মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে ঠিকই করেছে। পুলিশ ওরকম আশ্বাস সবাইকে দেয়। মরলে মেয়েটা মরবে, পুলিশ তো আর মরবে না!…লিচুটা সত্যিই খুব মিষ্টি ছিল, খেয়েছ?”
”না।”
একটু পরেই হিতুর ঘর থেকে চাপা শব্দ ভেসে এল বিদেশি গান। হিতু প্রায় রাতেই টেপ রেকর্ডার চালায়। কথাগুলোর একবর্ণও সে বুঝতে পারছে না। আসলে সে তার পারিপার্শ্বিককেই মুখস্থ থাকা পদ্যের লাইনের মতো পর পর আর স্মৃতিতে পাচ্ছে না। একটা গোলমাল তার মধ্যে যে ঘটে গেছে, এটা সে অনুভব করছে। ফণী পাল আর নিরু, এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনটা যে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই বুঝে উঠতে গিয়ে কয়েকবার তিনকড়িকে মনে পড়ল।
