কে তাকে ধরে ফেলতে পারে?
ছুটির পর রাস্তায় বেরিয়ে আসার সময় অফিসের লোকেদের মুখগুলো সে লক্ষ করল। কারুর সঙ্গেই তার আলাপ নেই কিন্তু মুখ চেনা। অযথা কথা বলার মতো সম্পর্ক শুধু তার ঘরের তিন-চারজনের সঙ্গেই। কয়েকজনকে মনে হয়েছে তার মতোই, ‘মুখে কোনো ভাব নেই, মুখ বুজে সামনে তাকিয়ে অফিসে ঢোকে আর বেরোয়।’…ছাইগাদার লোক।
রাস্তা পার হবার জন্য মৌলালির মোড়ে দাঁড়িয়ে তার নিরু আর খুদিকেলোকে মনে পড়ল। আজ কি ওকে জেরা করা হয়েছে? তিনটে লোক দেখিয়ে কি জানতে চাওয়া হয়েছে, এরাই তোমাকে-।
নিরু কেন নিজের সর্বনাশ নিজে করবে? ‘মরি মরব তোমাদের কি?’-এই কথাটার মানে, সে জেদ ধরেছে শনাক্ত করবে। বাড়িতে তাকে নিশ্চয় বারণ করেছে! ঠিকই করেছে। হিতুও তো তাই বলল, যুদ্ধ করাটা এখন বোকামি।
আকাশে তাকিয়ে সে মেঘ খুঁজল। সেদিন কালবোশেখি আসার কথা ছিল। আজও কাগজে তাই লিখেছে। কিন্তু কোথায় মেঘ? ভিড় বাসেই ওদের কোর্ট থেকে ফিরতে হবে। নিরু বসার জায়গা না পেলে বাসে কীভাবে দাঁড়াবে?…ওর পিছনে যে লোকটা থাকবে তার স্বভাব কেমন হতে পারে?…কিন্তু সে তো ইচ্ছে করে নিরুর গায়ে গা লাগায়নি। পকেটমার হবার ভয়ে তার বাঁদিকটা চেপে দাঁড়াতে বলেছিল। ভিড়ের জন্য সে কোনো সুযোগ নেয়নি। তার স্বভাবে এসব প্রবৃত্তি নেই।
প্রিয়ব্রত বাসে উঠল এবং কুড়ি মিনিট পর যখন নামল, তার মধ্যে সে বাসের ঠিক মাঝখানে, লেডিস সিট থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থেকেছে। হাতিবাগানে সে দশটা শোনপাপড়ি কিনল। হিতু বেশি মিষ্টি পছন্দ করে না তবে শোনপাপড়িটা খায়।
সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যু পার হয়ে সে দাঁড়িয়ে মিনিটখানেক ভেবে গুপী বসাক লেনে না ঢুকে, তার পাশের রাস্তা ধরল। মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে দূর থেকে দেখল খুদিকেলোর দোকানের দরজা খোলা, আলো জ্বলছে। কাছাকাছি এসে দেখতে পেল পাটি পাতা মেঝেয় উবু হয়ে বসে ও কাঁচি দিয়ে গোলাপি একটা কাপড় কাটছে। অবাঙালি এক স্ত্রীলোক বসে দেখছে।
”আজ তো তোদের কোর্টে কেস ছিল, কী হল?”
খুদিকেলো মুখ তুলে তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকেই মুখ নামিয়ে নিল। প্রিয়ব্রত ওর এই নিস্পৃহ ভাবটা আশা করেনি। মুখ গম্ভীর করে ফেলেছে, পিঠটাও আর একটু কুঁজো হয়ে গেছে, দৃষ্টি কাঁচিতে আটকে রয়েছে। তার উপস্থিতিটা যেন পছন্দ করছে না, উত্তর দেবার ইচ্ছাটাও নেই।
”নিরুকে জেরা করবে বলেছিলি, করেছে?”
”না।…তারিখ পড়েছে, ও মাসে হবে।”
মুখ না তুলে কাঁচি চালাতে চালাতে খুদিকেলো স্বগতোক্তির মতো কথাটা বলে স্ত্রীলোকটির উদ্দেশ্যে বলল, ”বলামাত্র কি বানিয়ে দেওয়া যায়, হাতে অনেক কাজ, কাল সকালে এসো।”
”বাচ্চচা মেয়ের ফরক, কতক্ষণ আর লাগবে! দাও না বাবু।”
”বাচ্চচারই হোক আর বুড়োরই হোক সময় তো লাগবে। আজ সারাদিন দোকান বন্ধ ছিল, হাতের কাজ বাকি পড়ে আছে…এখন আমার কথা বলার সময় নেই, কাল এসো।”
”আজ তাহলে হল কি?” প্রিয়ব্রত কুণ্ঠিত মৃদু গলায় বলল। বিরক্তিটা মুখ থেকে না সরিয়েই খুদিকেলো তার দিকে তাকাল।
”কি আবার হবে, কিছুই হয়নি।”
প্রিয়ব্রত কুঁকড়ে গেল ওর স্বরের রুক্ষতায়। আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে এই লোকটাই তার হাত ধরে বলেছিল ‘এই সামান্য উপকারটা তোকে করতেই হবে’, এখন সেটা ওকে মনে করিয়ে দিলে কেমন হয়! কিন্তু সে জানে তার মনের মধ্যে কোথায় যেন গণ্ডি কাটা রয়েছে, তার কিনার পর্যন্ত গিয়ে কিছুতেই আর সেটা পার হয়ে যেতে পারে না।
”আজ সকালে তোর খোঁজ করতে বাড়িতে গেছিলাম।”
”জানি। কেন, কীজন্য?…নিরুর খোঁজও করেছিলি। কেন, ওকে তোর কী দরকার?”
খুদিকেলোর মুখে নোংরা ভাঁজ পড়েছে। প্রিয়ব্রত সন্ত্রস্ত চোখে, সেই ভাঁজের নীচে যে ইঙ্গিত লুকোনো রয়েছে, সেটা দেখতে পেল।
”ওর সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছিল খুব ভয় পেয়েছে। আমার একতলায় খালি ঘরে ও লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিল। তখন আমি রাজি হইনি। কিন্তু পরে মনে হল এখন ওর লুকিয়ে পড়াই উচিত তাই…আমার বাড়িতে এসে-।”
”তোর বাড়ি থেকে ফেরার পরই ওর মতিগতি বদলে গেল। মা, বাবার কথা বাদই দিচ্ছি। এমনকি ছোটোবোনগুলো পর্যন্ত ওর পায়ে ধরল। কিন্তু গোঁ ধরেই রইল-” খুদিকেলো গলা নামিয়ে দিল, ”’আমি বাঁচতে চাই না’। শুধু ওই এক কথা…তুই কি মন্তর দিয়েছিলি ওর কানে?”
”আমি!” প্রিয়ব্রতর দুটো পা থরথর কেঁপে উঠল। হাতের বাক্সটা দুমড়ে গেল মুঠোয়। ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে রয়েছে। কথা বলতে গিয়ে স্বর বেরোল না। স্ত্রীলোকটি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল।
”মরতে চাইছে…তুই ওকে অপমান করেছিস।”
”না, না-।”
”তোর আবার বিয়ে করা উচিত ছিল, তাহলে এই অধঃপতন হত না।”
প্রিয়ব্রত ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছে। রাস্তায় আলো। গরমের জন্য লোকজন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তার মনে হচ্ছে সবাই বোধহয় শুনেছে খুদিকেলোর শেষের কথাগুলো, সবাই তার দিকে তাকাচ্ছে। এখন কেন লোডশেডিং হচ্ছে না?
বাড়িতে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সে পায়ের শব্দ করল। দোতলার ঘরের দরজা বন্ধ। তিনতলায় পৌঁছে সে সোনপাপড়ির বাক্সটা তিলুর হাতে দিয়ে বলল, ”দাদার জন্য।”
”আদ্দেক লিচু দাদা খেয়ে গেছে, বাকিগুলো আপনাকে খেয়ে নিতে বলেছে।”
