অনেকগুলো গলার চিৎকারের সঙ্গে একঝাঁক বাজনার শব্দ দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে প্রিয়ব্রতকে থাবড়ে থাবড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে। তার মধ্যে ঢাকের মতো একটা শব্দ চুপিসারে একঘেঁষে বেজে চলেছে। সে ওই ঢপ ঢপ শব্দটাকে খুঁজে পেয়েই, অনুসরণ করতে করতে ঘুমের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে লাগল।…সুড়ঙ্গের মতো পথটা। ঢপ ঢপ…ঢপ ঢপ…সে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঢপ ঢপ, ঢপ ঢপ,…সে অপেক্ষা করছে। কাঠের সঙ্গে ধাক্কা লাগার মতো একটা শব্দ সে শুনতে চায়।
৫
প্রিয়ব্রত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আমিই অতুলচন্দ্র ঘোষ।”
কিছুদিন আগে মাথা কামিয়েছে। গোল খুলি ছেয়ে বসে থাকা মশার মতো চুল। গাল দুটি সামান্য ফুলো এবং কামানো। চোখের নীচে চামড়া আলগা। পাতা দুটো তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো নেমে এসে অর্ধেক চোখ ঢেকে রেখেছে। থুতনিটা লম্বা, গলাটাও লম্বা লাগছে পাঞ্জাবি পরার জন্য। গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবির হাতা ঢলঢলে। কাঁধে ঝুলছে কাপড়ের ঝুলি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
একে সে দেখতে পায়, সিঁড়ি থেকে উঠেই ঘরে ঢোকার দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে। ঢুকবে কিনা, এমন একটা প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য ঘরের প্রত্যেকটা টেবিলের দিকে তাকাল। কয়েকটা চিঠি হাতে অ্যাকাউন্টস ম্যানেজারের খোপ থেকে সেই সময় এক বেয়ারা বেরোতেই তাকে ডেকে কী যেন জিজ্ঞাসা করল। বেয়ারাটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই প্রিয়ব্রতর দিকে তাকিয়ে থেকে, ছোটো ছোটো পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল।
তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নম্র এবং বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ”আপনিই কি অতুলচন্দ্র ঘোষ?”
শোনামাত্র তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল ”আমিই অতুলচন্দ্র ঘোষ।”
দু’ হাতের মুঠো বুকের কাছে তুলে, লোকটি মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, ”নমস্কার।”
”নমস্কার।” প্রিয়ব্রত আড়ষ্টভাবে হাতের দুটো পাতা টেবিল থেকে গলা পর্যন্ত তুলল।
”আমার নাম গৌরাঙ্গ পাল, আমার বাবা ফণীন্দ্রনাথ পাল।”
পলকের জন্য প্রিয়ব্রতর মুখ ফ্যাকাশে দেখাল। কেন? ফণী পালের ছেলে আমার কাছে কেন? আমার সঙ্গে ওর কী দরকার? সব তো চুকেবুকে গেছে!
”শুনলাম উনি মারা গেছেন।”
”ক্যানসারে, ও মাসের দশ তারিখে। আপনাকে খবরটা আর দেওয়া হয়নি। এত ঝঞ্ঝাট ঝামেলা, স্কুলের কাজ…কোচিং সামলানো, অথচ আপনার বাড়ি বেশি দূরেও নয়।”
কথা শেষ করার আগেই গৌরাঙ্গ চেয়ারে বসে পড়েছে। প্রিয়ব্রত আড়ে দেখল ভৌমিক চোখ সরিয়ে নিচ্ছে গৌরাঙ্গর মুখ থেকে।
”বাবা ডিরেকশনটা দিয়ে ছিলেন বটে কিন্তু মৌলালিতে নেমে…এদিকটা আমি আবার একদমই চিনি না। ঘোরাঘুরি একটু করতে হল।…একগ্লাস জল খাওয়াবেন, যা ভ্যাপসা গরম!”
ফণী পালও এসে প্রথমে জল চাইত।
প্রিয়ব্রত গ্লাস নিয়ে নিজেই জল আনতে গেল বারান্দায়। উদ্দেশ্য কী? আমার বাড়ির, অফিসের হদিশ ফণী পাল ছেলেকে দিয়ে গেছে কেন?
একচুমুকে গ্লাস খালি করে টেবিলে রাখল। ঠোঁটের কষ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল, কাঁধের কাছে ঘষে মুছে নিল। তৃপ্ত চোখে তাকিয়ে হাসল।
”ভেবেছিলুম আপনার বাড়িতেই যাব। তারপর ভাবলুম এখানে এলে অফিসটাও দেখা হয়ে যাবে। অনেক চেষ্টায় আজ সময় করে বেরোতে পেরেছি…ছাত্র চরিয়ে খাই।”
”স্কুল মাস্টার?” প্রিয়ব্রত শুকনো গলায় বলল। মাস্টারমশাইরা নিরীহ হন, ঝামেলায় জড়াতে চান না বলেই তার ধারণা। গৌরাঙ্গর আসার পিছনে কোনো মতলব বোধহয় নেই। ওর সারা মুখে কৌতূহল মাখানো এক ধরনের সারল্য রয়েছে, এটাই সে এতক্ষণ লক্ষ করেনি!
”বেলগাছিয়ায় ভারতী বঙ্গ বিদ্যালয়ে তেরো বছর পড়াচ্ছি, প্রাইমারি সেকশনে। ওখানেই একটা ঘর নিয়ে কোচিংও চালাই। সেই সকালে বেরিয়ে…শরীরে, আর কুলোয় না।”
ওর মুখে ক্লান্তি, অবসাদ ফুটে উঠল। দুটো হাত টেবিলে রেখে ঝুঁকে পড়ল বিশ্রাম নেবার ভঙ্গিতে।
”মা’রও বয়স হয়েছে, শিগ্গিরিই যাবেন মনে হচ্ছে।…জ্বরজারি, অসুখ বাড়ির সকলের তো সবসময় লেগেই আছে। একমাত্র বাবাই শুধু নিজের অসুখের কথা কাউকে বলেননি। চার মাস চেপে ছিলেন। জানতেন, বলে কোনো লাভ নেই। এ রোগের কোনো চিকিৎসা তো নেই, মরতেই হবে।”
প্রিয়ব্রত চোখের কোণ দিয়ে ভৌমিককে দেখল। খোলা একটা ফাইলের দিকে একমনে তাকিয়ে। তার মানে উৎকর্ণ হয়ে শুনছে।
”ফণীদা চাপা স্বভাবের ছিলেন।”
গৌরাঙ্গ কথাটাকে অনুমোদন করল মাথা নাড়িয়ে। ”চাপা চিরকালই ছিলেন। আমার বাচ্চচাবয়স থেকে দেখছি তো, অসম্ভব কষ্ট সহ্য করতে পারতেন।”
এইসব বলার জন্য কি এসেছে? প্রিয়ব্রত অধৈর্য হয়ে পড়েছে। যদি আর কিছু বলার না থাকে তা হলে এবার উঠুক। কীরকম অস্বস্তি লাগছে ওর কথাবার্তায়। মনে হচ্ছে রক্ত হিম করা রহস্য কাহিনি শুরু করার আগে এসবই যেন ভূমিকা। মাথা পাশে ফিরিয়ে প্রিয়ব্রত ড্রয়ারের দিকে তাকাল। সাদা খামটা শান্তভাবে পড়ে রয়েছে পিনের বাক্সর গায়ে ঠেস দিয়ে। যেন তার হাতে এখন অনেক কাজ, এখন সে খুব ব্যস্ত, এইরকম একটা ভাব মুখে ফুটিয়ে সে ড্রয়ার হাতড়াতে লাগল একটা দরকারি কিছু খোঁজার জন্য। লোকটা বোকা নয়। এই ইঙ্গিত থেকে নিশ্চয় ও বুঝতে পারবে, এবার তাকে বিদায় নিতে বলা হচ্ছে। ড্রয়ার থেকে লাল নীল পেনসিল, ইরেজার, ডটপেনের রিফিল এবং খামটা বার করে টেবিলে রাখল। ড্রয়ারটা আরও টেনে একদৃষ্টে তাকিয়ে হতাশায় মাথা নাড়ল। মুখ তুলে একবার সে সামনে তাকাল।
